সোমবার ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২০
  • প্রচ্ছদ » sub lead 3 » ‘কাপড় খুইল্লা দেইখ্খা ৮জনেরে একের পর এক গুলি কইরা মারছে’


‘কাপড় খুইল্লা দেইখ্খা ৮জনেরে একের পর এক গুলি কইরা মারছে’


আমাদের কুমিল্লা .কম :
19.12.2019

মাসুমুর রহমান মাসুদ,চান্দিনা: মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বিজয়ের ৪৮ বছর অতিক্রান্ত হলেও সংরক্ষণ করা হয়নি কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার কাশিমপুর গ্রামের গণকবরটি। স্থানটিতে নেই কোন স্মৃতি চিহ্ন। খাস ভ‚মিতে থাকা ওই গণকবরটিতে স্থানীয়দের গৃহস্থলীর কাজে ব্যবহার হচ্ছে।
গণকবরটি চান্দিনা উপজেলার মাধাইয়া ইউনিয়নের কাশিমপুর পেইরাপাড় এলাকায় পুকুরের পাড়ে মাধাইয়া-কাশিমপুর সড়কের পাশে সরকারি খাস ভ‚মিতে পড়ে আছে। গণকবরটির দুই পাশে রয়েছে স্থানীয়দের বসতি।
সরেজমিনে কাশিমপুর গণকবরের খোঁজে ওই এলাকায় গেলে কথা হয় সেই দিন পাকবাহিনীর হাতে নির্মম ভাবে হত্যার শিকার হওয়ায় শহীদ পরিবারের সদস্য ও এলাকাবাসীর সাথে।
বিজয়ের ৪৮ বছরেও ৮ শহীদের গণকবরটি সরকার সংরক্ষণ না করায় ক্ষোভ প্রকাশ এলাকাবাসী বলেন- মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনী এ গ্রামে যে বর্বরতা চালিয়েছে, নৃশংস ভাবে এলাকার ৮জন নিরীহ মানুষকে যেভাবে হত্যা করেছে। তাদেরকে যেস্থানটিতে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল সেই স্থানটি সংরক্ষণ করা হউক সেইটুকু চাই। যাতে এ গ্রামের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গণকবরের স্মৃতিচিহ্নটি দেখে এ গ্রামের ৮ শহীদের কথা স্মরণ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মনে লালন করে শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে ।

সেই দিনের কথা স্মৃতিচারণ করে শহীদ অমূল্য দাসের ছেলে স্বপন দাস (৬৫)। তিনি জানান, স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় কাশিমপুর গ্রামটি ছিল হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা। সেই দিন ছিল আষাঢ় মাসের শনিবার গভীর রাত। আমরা সবাই ঘুমিয়ে ছিলাম। আমাদের বাড়ি ঘেরাও করে আমার বাবা অমূল্য দাস ও আমাকে ধরে নিয়ে যায় পাশের বাড়িতে। আমি ছোট বিধায় আমাকে রাখা হয়েছিল মহিলাদের সাথে এক ঘরে আর আমার বাবাকে বেঁধে রাখা হয়েছিল বাইরে। পরবর্তীতে এক এক করে গুলি করে হত্যা করে ৮জনকে।
তারা হলেন- জগবন্ধু মাষ্টার (৬০) ও তার ছেলে সুধীর সরকার (৪০), চিত্ত রঞ্জন সরকার (৪৫), অমূল্য চন্দ্র দাস (৫০), চেতন চন্দ্র সরকার (৩৫), যুগেন্দ্র চন্দ্র সরকার (৪০), শিশু চন্দ্র সরকার (৩৮) ও শান্তি রঞ্জন শীল (৩৫)।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী রমিজ উদ্দিন (৭০) জানান, ‘হেই দিন আছিল আষাঢ় মাস। শনিবাইরা দিন আমরার গরে মেমান আইছিল। গরে সবাইর ঘুমানের জায়গা আছিল না। নাওয়ে (নৌকায়) দুই বস্তা চাউল আছিল। আমি আর আমার বড় ভাই (বাচ্চু মিয়া) মিল্লা দুইজনে নাওয়ে হুইছিলাম। রইব্বার (রবিবার) ভোর রাইতে চিল্লা-চিল্লির আওয়াজ হুইন্না আমরারও চালি ফাইরা (দৌঁড়ে) নাওয়ের থেইক্কা বাইরাইয়া আইলাম। আইয়া দেহি ওই জোরপুহুইরার (জোর পুকুরিয়া গ্রামের) রাজাকার রকমান (আব্দুর রহমান মৃধা) মেলেটারি লইয়া হিন্দু বাড়ির সবাইরে ধইরা নিতাছে। তখন আমরারে দেইখ্খাও ধইরা লাইছে। হিন্দু পাড়ার ৯জন আর আমরা ৬জনের ধইরা হিন্দু দাস বাইত নিয়া বাইন্দা বুট জোতা দিয়া পাড়ায়। অনুমান এক ঘন্টা যাবৎ হ¹লেরে মাইর-ধইর কইরা কলমা জিগাইয়া ও পড়নের কাপড় খুইল্লা দেইখ্খা দেইখ্খা ৯ জন হিন্দুর মধ্যে ৮জনেরে একের পর এক গুলি কইরা মারছে। বলাই দত্তেরে মুসলমান মনে কইরা আর মারছিল না’।

গণকবর সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, ‘রইব্বার সহালে আমরার গেরামের (গ্রামের) দুধ মিয়া, চাঁন মিয়া, মোহাম্মদ আলীসহ আমরা ৫-৬জনে মিল্লা দুইডা গাতা কইরা (গর্ত খুড়ে) হেই আটজনেরে চারজন-চারজন কইরা দুইডা গতায় মাটি দেই। হের পরে দেশ স্বাধীন হইল, মানু বাড়লো এক এক কইরা ৪০-৪২ বছর (৪৩ বছর) কাইটা গেলো কেউ আর তারার খবর লইল না।’

চান্দিনা উপজেলা নির্বাহী অফিসার ¯েœহাশীষ দাশ গণকবর স্থানটি পরিদর্শন করেন। তিনি মাধাইয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানকে স্থানটি সংরক্ষণ করে শহীদদের নামের তালিকা সম্বলিত একটি ফলক স্থাপনের নির্দেশ দেন।