রবিবার ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০২০


গোমতীতে মাটি কাটায় বিপন্ন পরিবেশ


আমাদের কুমিল্লা .কম :
23.12.2019

শাহীন আলম,দেবিদ্বার ।। কুমিল্লার দেবিদ্বারে অবাধে মাটি কেটে ক্ষত-বিক্ষত করা হচ্ছে গোমতী নদী। শীত আসার পর পরই দু’পাশের বাঁধ কেটে ওঠানামা করছে শত শত ট্রাক্টর। রাতদিন মাটিবাহী ট্রাক্টর চলাচলে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে নদীর দুপাড়ের বাসিন্দারা। ধুলায় বিপন্ন হচ্ছে পরিবেশ। নদীর ভেতরের মাটি কাটার কারণে হুমকির মুখে পড়েছে প্রতিরক্ষা বাঁধ, সড়ক ও সেতু।
উচ্চ আদালতের রায়ে গোমতীসহ অন্যান্য নদ-নদী, খাল-বিল দখলদার ও দূষণকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামের ছবিসহ তালিকা প্রস্তুত করে উপজেলা ও পৌরসভার নোটিশ বোর্ড অথবা উম্মুক্ত স্থানে টাঙ্গানোর জন্য নির্দেশ দেওয়া হলেও এখনও ওই রায় কার্যকর হয়নি দেবিদ্বার উপজেলায়। এতে করে আড়ালেই থেকে যাচ্ছে শক্তিশালী মাটি কাটা সিন্ডেকেট।
কুমিল্লার দেবিদ্বারে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, কোন ভাবেই থামানো যাচ্ছেনা ভূমি খেকোদের। ট্রাক্টরে মাটি কেটে বিভিন্ন ইটের ভাটা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়িতে নেওয়া হচ্ছে। মাটি আনা-নেওয়ার কারণে গোমতীর বাঁধ ও সেতু ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। অনেক জায়গায় বাঁধের পাকা সড়কের পিচ উঠে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত। উপজেলার খলিলপুর, চরবাকর, লক্ষীপুর, বড় আলমপুর, কালিকাপুরসহ ১০-১৫টি ঘাট থেকে তিন শতাধিক ট্রাক্টর মাটি কেটে নিচ্ছে। সড়ক কেটে নদীর বাঁধের ভেতর দিয়ে এসব ট্রাক্টর ওঠানামা করছে। বৈদ্যুতিক খুঁটি ও গাছের গোড়া থেকেও মাটি কাটা হচ্ছে। মাটি কেটে নেওয়ায় কালিকাপুর, লক্ষীপুর, খলিলপুর ও দেবিদ্বারের গোমতীর ওপর চারটি সেতুই হুমকির মুখে পড়েছে। মাটিবোঝাই ট্রাক্টর সেতুর ওপর দিয়ে চলাচল করলে প্রচÐ বেগে কাঁপুনি দেয় পুরো সেতু। এতে ধীরে ধীরে সেতুর পিলার থেকে মাটি সরে গিয়ে যে কোনো সময় দেখা দিতে পারে বড় কোনো দুর্ঘটনা।
অভিযোগ রয়েছে, আল আমিন, বিল্লাল হোসেন, আবদুল কাদের, রমিজ উদ্দিন, বাবুল, জামিল হোসেন, আবদুর রব, মাসুম, জয়নাল, আর্মি হোসেনসহ বেশ কয়েকজন শক্তিশালী সিন্ডিকেট অবাধে গোমতীর মাটি কেটে বিভিন্ন ইটভাটায় বিক্রি করে আসছে। এ ব্যাপারে অভিযুক্ত মো. আবদুর রব বলেন, সবাই যে যার মতো করে মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে। ৭-৮টি ট্রাক্টরের মাধ্যমে মাটি আনা হচ্ছে।
চরবাকর গ্রামের আবদুর রব নামে এক ব্যক্তি ৮-১০ টি ট্রাক্টরের মাধ্যমে গোমতী নদী ও তার চরের উর্বর মাটি প্রতি শতাংশ ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা দরে কিনে ১০/১৫ ফুট গভীর করে মাটি কেটে নিচ্ছেন তিনি। এ মাটি তিনি স্থানীয় বিভিন্ন ইটভাটায় অধিক লাভে দিচ্ছেন। অভিযুক্ত আবদুর রব বলেন, ‘জমির মালিকেরা মাটি বেঁচে। আমরা কিনি। নদীর পাড়ে গতবার মাটি কাটছিল। এইবার তার পাশের জমির মাটি ভাঙছে। আমাদের কাছে জমির মালিকেরা মাটি বেচতাছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কুমিল্লা জেলার সভাপতি প্রফেসর ডা. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, মাটি খেকোদের দৌরাত্মা দিন দিন বেড়েই চলছে। তারা থামছে না, থামবেও না। গোমতীকে হত্যা করে তারা শান্ত হবে। মাটি উত্তোলনের ফলে তারা পরিবেশে বিপর্যয় ডেকে আনছে। ধুলা-বালিতে পরিবেশ বিপন্ন করছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড কুমিল্লার পরিকল্পনা ও রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল লতিফ বলেন, গ্রামীণ সড়ক দিয়ে ৫ থেকে ১০ টন ওজনের ট্রাক্টর চলাচল করতে পারে। মাটিবোঝাই ট্রাক্টরগুলো আরও বেশি ওজনের হয়ে থাকে। গ্রামীণ পাকা সড়ক দিয়ে এসব ভারী ট্রাক্টর চলাচল বন্ধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এ ব্যাপারে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, গোমতী নদী রক্ষায় কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের সাথে একাধিকবার সভা হয়েছে। যারা গোমতী নদী দখল করে বালু উত্তোলন করছে তাদের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় প্রশাসনকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নদী রক্ষা কমিশন জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে এসব উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করবে। ইতোমধ্যে তারা কিছু কাজ শুরু করে দিয়েছেন। বর্তমানে গোমতীতে পানি শূন্যতা দেখা দিয়েছে, ভারত থেকে আমরা যে পরিমাণ পানি পেতাম তা এখন পুরাপুরি বন্ধ করে দিয়েছে ভারত। এভাবে পুরোপুরি বন্ধ করলে তো আর হবে না। আমাদের যতটুকু পানি লাগে ভারত থেকে ততটুকু পানি আনতে হবে। এ ব্যাপারে একাধিক সভায় গোমতী নদী রক্ষা ও পানি বন্টন নিয়ে ভারতের সাথে আলোচনা চলছে। নদীতে ¯্রােত ও পানি বৃদ্ধি হলে মাটি উত্তোলন বন্ধ হবে। এছাড়াও মাটি কাটা প্রভাবশালী সিন্ডিকেট যত শক্তিশালীই হোক না কেন তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের উপজেলা আহবায়ক রাকিব হাসান বলেন, আমি গত কয়েকদিন আগে রাতে পুলিশ নিয়ে অভিযান চালিয়েছি। কিন্তু কাউকে পাওয়া যায়নি। আবারও অভিযান পরিচালনা করা হবে। যারা গোমতীর মাটি কাটছে তাদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তালিকা অনুযায়ী দ্রæত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ব্যাপারে কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মো. আবুল ফজল মীর বলেন, গোমতী নদী রক্ষা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে জেলা প্রশাসন। যেখানেই মাটি কাটা হচ্ছে সেখানেই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। যারা এ কাজে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেকগুলো ট্রাক্টর জব্দ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেবিদ্বারেও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে।