শুক্রবার ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২০


বিদ্যুতের শহরে অন্ধকারে এক গ্রাম


আমাদের কুমিল্লা .কম :
04.01.2020

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সরকারি-বেসরকারি ১১টি ইউনিট থেকে গড়ে প্রতিদিন প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হচ্ছে জাতীয় গ্রিডে। এর ফলে দেশের বৃহত্তম বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে আশুগঞ্জ উপজেলাকে বলা হয়ে থাকে বিদ্যুতের শহর। কিন্তু বিদ্যুতের এই শহরে আজও অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে আছে একটি গ্রাম। বিদ্যুতের শহরে থেকেও বিদ্যুৎ না পাওয়ায় সেই গ্রামের বাসিন্দাদের দুর্ভোগের যেন অন্ত নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় একশ বছর আগে আশুগঞ্জ উপজেলার মেঘনা নদীর বুকে জেগে ওঠে একটি চর। আশুগঞ্জ সদর ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত সেই চরের নামকরণ করা হয় চরসোনারামপুর। এরপর বিভিন্ন স্থান থেকে আসা মানুষজন বসতি গড়েন চরসোনারামপুরে। ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চরের এই গ্রামে মানুষ বসবাস করে আসছে। বর্তমানে হিন্দু-মুসলমান ধর্মালম্বী মিলিয়ে প্রায় ছয় হাজার মানুষ বসবাস করছেন এই চরটিতে। এর মধ্যে ভোটার রয়েছে প্রায় দেড় হাজার। চরের বেশির ভাগ মানুষ পেশায় জেলে। মেঘনা নদীতে মাছ ধরে সেই মাছ আশুগঞ্জ বাজারে নিয়ে বিক্রি করেই চলে তাদের জীবন-জীবিকা। স¤প্রতি চরের বাসিন্দাদের অনেকেই আশুগঞ্জ বাজারে বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িয়েছেন।
চরসোনারামপুর গ্রামের শিশুরাও এখন শিক্ষার আলোয় আলোকিত হচ্ছে। তাদের জন্য চরেই রয়েছে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। তবে শিক্ষার আলো জ্বললেও যুগের পর যুগ ধরে চরের ঘরগুলো অন্ধকারে আচ্ছন্ন। এ নিয়েই এখানকার বাসিন্দাদের সব দুঃখ। আর ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে বছর বছর চরের ভাঙন তো রয়েছেই। অবশ্য কয়েক বছর হলো চরে সৌর বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে সৌর বিদ্যুৎ নিয়েও কম ভোগান্তি নেই তাদের। অনেকে আবার গরম থেকে বাঁচতে বাড়ির সামনে লাগিয়েছেন গাছপালা।
চরসোনারামপুর গ্রামের বাসিন্দা রায়মন চন্দ্র দাস জানান, প্রায় ৪০ বছর আগে তিনি চরসোনারামপুর গ্রামে এসে বসতি গড়েছেন। মেঘনা নদীতে নৌকা চালিয়েই তার ছয় সদস্যের পরিবার চলে। চরে আসার পর থেকে একটাই দুঃখ তাদের বিদ্যুৎ না থাকা। বারবার আশা দিলেও আজ পর্যন্ত কোনো জনপ্রতিনিধিই তাদের এই দুঃখ ঘোচাতে পারেননি।
চরসোনারামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী জয়া রাণী বর্মণ জানায়, দিনের বেলা খুব একটা সমস্যা না হলেও সন্ধ্যায় পড়তে বসলে কষ্ট করতে হয় তার। চার্জ না থাকার কারণে অধিকাংশ সময়ে সৌর বিদ্যুতের আলো না পেয়ে কুপি অথবা মোমবাতি জ্বালিয়ে পড়তে হয় তাকে। এজন্য দ্রুত চরে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়ার দাবি তার।
শোভা রাণী নামে এক বৃদ্ধা বলেন, গরমের দিনে ঘরের ভেতরে থাকতে পারি না। তখন দিনের বেশির ভাগ সময় ঘরের বাইরে বসে থাকি। বাতাসের জন্য সারা বাড়িতে গাছপালা লাগিয়েছি। বিদ্যুৎ না থাকায় মাছ-মাংস রাখার জন্য ফ্রিজ আনতে পারি না। আমরা চাই আমাদের গ্রামে সরকার যেন বিদ্যুৎ দেয়ার ব্যবস্থা করে।
সুধীর বর্মণ নামে চরের আরেক বৃদ্ধ বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় গরমের দিনে সবচেয়ে বেশি অসুবিধা হয়। সন্ধ্যার পর ছেলে-মেয়েদের কুপি-মোমবাতি জ্বালিয়ে পড়ালেখা করতে হয়। শীতকালে ঠিকমতো সূর্যের আলো না পাওয়ায় চার্জ কম হওয়ার কারণে সৌর বিদ্যুৎ বেশিক্ষণ চলে না। ঝড়-বৃষ্টিতে অনেক সময় দুই-তিনদিন চার্জও হয় না। তখন অন্ধকারেই থাকতে হয় আমাদের। দেশের কত নদী পার করে কত জায়গায় বিদ্যুৎ দেয়া হয়েছে অথচ আমরা বিদ্যুতের শহরে থেকে নদীর কারণে বিদ্যুৎ পাই না।
আশুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নাজিমুল হায়দার বলেন, চরে সরকারি-বেসরকারিভাবে সোলার দেয়া হয়েছে। তবে মূল বিদ্যুৎ সংযোগ এখনও দেয়া হয়নি। আমি যতটুকু জানি বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে সেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহের কার্যক্রম চলমান আছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আশুগঞ্জ বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল হক বলেন, কোন পদ্ধতিতে চরসোনারামপুরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে- সেটি একটি ফ্যাক্টর ছিল। তবে ইতোমধ্যে চরসোনারামপুরসহ দেশের তিনটি চর এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য বিদুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ে আমাদের বিতরণ বিভাগ থেকে প্রজেক্ট আকারে একটি প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। ওই প্রজেক্ট অনুমোদন পেলেই বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রক্রিয়া শুরু হবে।