শুক্রবার ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২০


২০১৯সাল জুড়ে কুমিল্লার সড়কে মানুষের আর্তনাদ


আমাদের কুমিল্লা .কম :
19.01.2020

মাহফুজ নান্টু: আলোচনা-সমালোচনা প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি নিয়ে শেষ হলো ২০১৯ সালটি। সারা দেশের মতো ২০১৯ সালে ছেলে ধরা গুজব, সড়ক দুর্ঘটনা, ডেঙ্গু, কুমিল্লা থেকে ক্যাসিনো স¤্রাট- ইসমাইল হোসেন স¤্রাট আটক, পিয়াজের মূল্যবৃদ্ধি-লবণের গুজব, চামড়ার দরপতন, স্ত্রীর মামলায় কারাগারে কুমিল্লা কোতয়ালী মডেল থানার পরিদর্শক সালাউদ্দিন, কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত। এছাড়া সারা বছর ধরে গোমতী নদীর কোল ঘেঁষে মাটি খনন ও বালু উত্তোলন।
কুমিল্লাতেও ছেলে ধরা গুজবে বেশ ক’জন নারী পুরুষকে গণ ধোলাই দেয়া হয়। বিশেষ করে ১২ জুলাই আদর্শ সদর উপজেলার আমড়াতলীতে ভিক্ষা করতে আসা চার নারী পুরুষকে ছেলে ধরা মনে করে বেদম পিটুনি দেয় স্থানীয়রা। বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনা এনজিওর কিস্তি পরিশোধের মত একটি সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সড়কে মানুষের কান্না আর আর্তনাদ লেগে ছিলো। ২৫ জানুয়ারি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে ট্রাকভর্তি উল্টে ১৩ ঘুমন্ত শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। শ্রমিকদের সবার বাড়ি নীলফামারী জেলার জলঢাকা উপজেলায়। কয়লাভর্তি ট্রাক থেকে কয়লা নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিল শ্রমিকরা। ট্রাকটি উল্টে পাশের ইটভাটার ঘুমন্ত শ্রমিকদের উপর পড়ে। এতে ঘটনাস্থলে ১২ শ্রমিক নিহত ও ৩ জন আহত হয়।
১৭অগাস্ট এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এতে স্তম্ভিত হয়ে পড়ে গোটা কুমিল্লা। বাসের সঙ্গে সিএনজি চালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে একই পরিবারের ৬জন, হোটেল বয় এবং সিএনজি চালকসহ আটজন নিহত হয়েছে। দুর্ঘটনায় বেঁচে থাকে পরিবারের একটি ছেলে। কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের লালমাই উপজেলার বাগমারা বাজার সংলগ্ন জামতলী এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। ঈদের ছুটি শেষে তারা কুমিল্লায় ফিরছিলো।এছাড়াও আরো অনেক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা প্রত্যক্ষ করে কুমিল্লাবাসী। এতসবের মধ্যে আসলো কোরবানীর ঈদ। তবে এ বছর ঈদের আনন্দ বিষাদে পরিণত হয় চামড়া ব্যবসায়ীদের। দাম না পেয়ে কোরবানীর পশুর চামড়া গোমতী নদীতে ভাসিয়ে দেয় ব্যবসায়ীরা।
কুমিল্লায় ২০১৯ সালের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান কুমিল্লা মহানগরীতে এক চরম আতংকের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। কিশোর গ্যাংয়ের হাতে নিহত হয় স্কুল ছাত্র আদরসহ অন্তত আরো দুইজন শিক্ষার্থী।
২০১৯ সালের জুলাই থেকে আগস্ট পর্যন্ত কুমিল্লা মহানগরীর প্রতিটি হাসপাতালে প্রতিদিনই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তেই থাকে। পুরো বছর জুড়ে কুমিল্লার হোমনা মুরাদনগর বুড়িচং এ অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। বিশেষ করে কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার ষোলনল ও পীরযাত্রাপুর ইউনিয়নের ২১ টি গ্রামের প্রায় ২০ কিলোমিটার তিন সহ¯্রাধিক অবৈধ গ্যাস সংযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে ভ্রাম্যমান আদালত ও বাখরাবাদ কর্তৃপক্ষ। এসময় প্রায় তিন কিলোমিটার অবৈধ গ্যাস লাইন উত্তোলন করা হয়। এর সাথে বাখরাবাদ গ্যাসের অনেক কর্মকর্তা জড়িত ছিলো বলে অভিযোগ রয়েছে।
বছরের শেষ দিকে এসে পাসপোর্ট অফিসের দুভোর্গ এবং দফায় দফায় আইনশৃংখলা বাহিনীর অভিযান পরিচালিত হয়। ৩০ অগাস্ট কুমিল্লায় তিন শতাধিক পাসপোর্টসহ ৮ দালালকে আটকের পর জেল জরিমানা প্রদান করা হয়। পরে কুমিল্লা পাসপোর্ট অফিসের উপ-পরিচালক রাজ আহমেদকে বদলি করা হয়।
দেশে ক্যাসিনো-জুয়া এবং শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়। এ অভিযানের অন্যতম আলোচিত ব্যক্তি ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী স¤্রাটকে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে আটক করা হয়।
বছরের শেষে এসে বড় আলোচিত সমালেচিত ঘটনা ঘটে। ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর কুমিল্লা কোতয়ালী মডেল থানার পরিদর্শক(তদন্ত) সালাহ্ উদ্দিনের বিরুদ্ধে তার প্রথম স্ত্রী যৌতুকের মামলা দায়ের করে। পরে স্ত্রীর দায়ের করা মামলায় জেলে যান সালাহ্ উদ্দিন।
সচেতন নাগরিক কমিটি কুমিল্লার সভাপতি বদরুল হুদা জেনু বলেন, গত বছরগুলোতে আমরা লক্ষ্য করেছি মানবিক মূল্যবোধের জায়গাটা থেকে অনেক দূরে চলে গেছি। সংস্কৃতি চর্চা না থাকলে যা হয়,তাই হচ্ছে কুমিল্লায়। আর এটাও সত্যি গতকয়েক বছরে শিক্ষা সংস্কৃতির জনপদ এই কুমিল্লা সংস্কৃতি অঙ্গন থেকে বহুদূরে চলে গেছে। যার ফলাফল সামাজিক অস্থিরতা বাড়ছে। এই সামাজিক অস্থিরতা এখন বেশী লক্ষ্য করা যাচ্ছে শিক্ষাঙ্গনে। আমাদের উচিৎ পারিবারিক অনুশাসন বৃদ্ধি করা। রাজনৈতিক কমিটমেন্ট রক্ষা করাও জরুরি হয়ে গেছে।
আরেকটা বিষয় হচ্ছে,তাহলো গোমতী নদী রক্ষা এবং নদীকে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার উপযোগী করা।
পরিবেশকে সুন্দর করে রাখতে পারলে প্রকৃতি আমাদেরকে দু’হাত ভরে দিবে, অন্যথায় প্রকৃতির ক্ষতি করলে প্রকৃতি তখন ধনী গরিব রাজা বাদশা উজির নাজির কাউকে ছাড় দিবে না, প্রকৃতি তখন যে বিপর্যয় ডেকে আনবে তা কাটিয়ে উঠা আমাদের কারো পক্ষে সম্ভব হবে না।
হাইওয়ে পুলিশ কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম বলেন, নতুন বছরে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে হাইওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের প্রতি আমাদেও নজরদারী বেশী থাকবে। কারণ সড়ক দুর্ঘটনা রোধে হাইওয়ে পুলিশ সর্বদা অঙ্গিকারাবদ্ধ,এর পাশাপাশি যদি চালক, যাত্রী, পথচারী পাশাপাশি সর্বস্তরের সাধারণ মানুষকে সড়ক আইন মেনে চলার কাজটিতে উদ্বুদ্ধ করা যায় তাহলে সড়ক দুর্ঘটনা কমে আসবে।