সোমবার ৩০ gvP© ২০২০
  • প্রচ্ছদ » sub lead 1 » শরাণার্থীদের দ্বারে দ্বারে… ১ দেশে ফিরে দেখি বাড়ি ঘর দোকান কিছুই নেই-ধ্রæব প্রসাদ সেন


শরাণার্থীদের দ্বারে দ্বারে… ১ দেশে ফিরে দেখি বাড়ি ঘর দোকান কিছুই নেই-ধ্রæব প্রসাদ সেন


আমাদের কুমিল্লা .কম :
01.03.2020

শাহাজাদা এমরান।। বাবার বন্ধু সরকারী কর্মকর্তা চান্দিনার কাশিমপুরের নলিনী চন্দ্র দেব নাথ কাকা হঠাৎ করে ২৭ মার্চ রাতে আমাদের কুমিল্লা নগরীর নজরুল এভিনিউস্থ বাসায় আসেন। এসেই বাবাকে বললেন যেহেতু তুমি কুমিল্লার একজন বড় পাইকারী ঔষধ বিক্রেতা তাই তুমি সরকারের হিট লিষ্টে আছ। যে কোন সময় অঘটন ঘটে যেতে পারে। পারলে এখনি না পারলে কাল সকালের মধ্যেই কুমিল্লা শহর ছেড়ে চলে যাও। এ কথা বলেই নলিনী কাকা চলে যান। ৬ ছেলে ও ২ মেয়ে নিয়ে কোথায় যাবে চিন্তায় পড়ে গেল বাবা। তখন মা বললেন,দেবিদ্বার আমাদের বাড়িতেই উঠব। কিছুদিন পর স্বাভাবিক হলে চলে আসব। মা’র ধারণা ছিল,দেশের এই গন্ডগোল তো আর বেশী দিন থাকবে না। সুতরাং এত চিন্তা করে লাভ কি। পর দিন ২৮ মার্চ দুপুর আড়াইটায় আমরা ভাইবোন ও বাবা-মা ১০জন আর ঘরে ছিল আরো ৩ জন স্বজন এই ১৩ জন আমরা মামার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। যাবার সময় শুধু প্রয়োজনীয় কাপড় চোপড় নিয়ে যাই অল্প দিন পড়ে ফিরে আসব বলে। কিন্তু পড়ে মামার বাড়ি থেকে ভারতের ত্রিপুরা শরণার্থী শিবিরে কাটে আমাদের মানবেতর জীবন। দেশ স্বাধীনের পর কুমিল্লা এসে দেখি,শাষনগাছা ও নজরুল এভিনিউতে আমাদের দুটি পাইকারী ঔষধের দোকানসহ বাড়ি ঘর সব কিছুই শেষ। আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে সব কিছু লুটে নিয়েছে। ৭১ এ সব হারিয়ে আমাদের অর্থনীতির যে কোমড় ভাঙ্গা হয়েছে আমরা আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারিনি। তাই এখন আমরা ৫ ভাই এই ছোট জীর্ণ শীর্ণ বাড়িতে এখনো এক সাথে থাকছি। কথাটি বলেই চোখের পানি ছেড়ে দিলেন, স্বাধীনতা পূর্ব কুমিল্লা শহরের সবচেয়ে বড় ঔষধের পাইকারী বিক্রেতা মনমোহন সেনের পঞ্চম সন্তান ধ্রুব প্রসাদ সেন টেলু। সাথে ছিলেন, বড় ভাই দেব প্রসাদ সেন,ছোট ভাই শিব প্রসাদ সেন টেনু ও শুভাশিষ সেন শংকর। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ও এদেশের তাদের দোশর রাজাকার কর্তৃক নির্যাতন নিপিড়নের ভয়ে যারা দেশ সেরে শরণার্থী হয়ে পাশের দেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন তাদের সে সময়ের অবস্থা গুলো তাদের জবানীতে তুলে এনে পাঠকদের সে সময়কে উপলদ্ধি করার সুযোগ করে দেওয়ার জন্যই দৈনিক আমাদের কুমিল্লার পক্ষ থেকে আমরা ঘুরছি শরাণার্থীদের দ্বারে দ্বারে।
ধ্রæব প্রসাদ সেন। পিতা মনমোহন সেন। মা লাভন্য প্রভা সেন। পিতা মাতার ৬ ছেলে ও ২ মেয়ের মধ্যে ধ্রæব প্রসাদ সেন পঞ্চম।অপর ভাই বোন গুলোর মধ্যে ছিল,হরি প্রসাদ সেন,শিখা সেন,দেব প্রসাদ সেন,স্বপ্না সেন,শিব প্রসাদ সেন টেনু,শুভাশিস সেন শংকর ও দেবাশিস সেন মনি। ১৯৭১ সালে তারা সবাই শরনার্থী হিসেবে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে অবস্থান করেন।
ধ্রæব প্রসাদ সেন যখন এই প্রতিবেদকের কাছে তাদের শরণার্থী জীবনের বেদনাক্ত জীবনের কথা বলছিলেন তখন সাথে ছিলেন তার অপর তিন ভাই। তারাও মাঝে মাঝে তাদের কষ্টের দিন গুলো শেয়ার করছিলেন। মনে হলো তাদের এক একটি ঘটনা যেন করুণ ইতিহাসের অসমাপ্ত উপাখ্যান।
ধ্রæব প্রসাদ সেন বলতে শুরু করলেন এভাবে,আমার বাবার ঔষধের এলসি ছিল। শাসনগাছায় ইকোনোমিকস সিন্ডিকেট নামে পাইকারী দোকান ছিল। নজরুল এভিনিউস্থ আমাদের বর্তমান বাসাটিও ঔষেধের দোকান ছিল। একজন ব্যবসায়ী হিসেবে বাবার বেশ নাম ডাক ছিল। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বৃহস্পতিবার রাতে বাবা এলসি করে বাসায় আসেন সবে মাত্র। এমন সময় শহরে গুলাগুলির আওয়াজ শুরু হল। সারা রাত থেমে থেমে গুলি চলল।আমি তখন সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র হলেও বয়স বেশী ছিল। সব কিছু বুঝতাম। ছাত্রলীগের মিছিল মিটিংও করতাম। ২৬ মার্চ শুক্রবার দুপুরে জানতে পারলাম,রাজগঞ্জের বাবার বন্ধু কেডিরায় এন্ড কোংয়ের মালিক কেডি রায়,সাহা মেডিকেলের মালিক নিতাই চন্দ্র সাহা,এম সি রায় এন্ড কোংয়ের মালিক এম সি রায় চৌধুরী,ষ্ট্যান্ডার্ড মেডিকেল হলের মালিক গোপাল ভট্রাচার্য এবং জাতীয় পতাকার রূপকার শিব নারায়ন দাসের পিতা সতীশ চন্দ্র রায়কে সেনানিবাসে ধরে নিয়ে গেছে।এ ঘটনায় আমাদের পরিবারে আতংক সৃুষ্টি হয়। শহরে কার্ফু থাকায় সব খবর ভাল ভাবে পেতাম না। ২৭ মার্চ শনিবার অশোকতলার এড.আশুতুস সিংকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তান আর্মি।তখন সারা কুমিল্লা শহর এক ভীতিকর শহর ছিল।এই অবস্থায় এই দিন রাতেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনলয়ে কর্মরত চান্দিনার নলিনী কাকা বাসায় এসে বাবাকে জানান, আপনি হিট লিষ্টে আছেন। যে কোন সময় আপনাকে ধরে নিয়ে যাবে। দ্রæত কুমিল্লা ত্যাগ করেন। পরদিন ২৮ মার্চ রোববার দুপুরে মামার বাড়ি দেবিদ্বার উপজেলার গুনাইঘর চলে যাই। যেহেতু সামনে সেনানিবাস তাই আমরা বুড়িচং ব্রাক্ষনপাড়া হয়ে অনেক ঘুরে দেবিদ্বার যাই।গোমতী নদীর উপর নির্মিত বানাশুয়া রেলব্রিজটি পাড় হতে পারছিলাম না। খেয়া নৌকা ছিল মাত্র একটি। আর মানুষ ছিল অসংখ্য। কারণ, তখন যে যেভাবে পাড়ছে শহর থেকে বের হয়ে আসছে। তখন আমরা নদীতে নেমে কোমড় পানি ভেঙ্গে পাড় হই। আমাদের সবচেয়ে ছোট ভাই মনির বয়স ছিল ৪ বছর। ল²ীপুর কলেজের অধ্যাপক দেবব্রত দত্তের পরিবারসহ আমরা এক সাথে ৩১ জন শহর থেকে রওয়ানা হই। রাস্তায় নেমে দেখি শত শত মানুষ শহর ছাড়ছে। রাস্তায় রাস্তায় মানুষ আমাদের সাহায্য করেছে। যে যেভাবে পাড়ছে সাহায্য করেছে। বিশেষ করে আমরা যখন দেবিদ্বার থেকে শরণার্থী হয়ে কসবা হয়ে ভারতে যাই সেই দিন উপলদ্ধি করেছি,আসলে বাংলাদেশের মানুষ আমরা কত ভাল। বিশেষ করে মুসলমানেরা রাস্তায় জগ গøাস নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। বিস্কুট,মুড়ি,চিড়া,গুড় এমন কি পানি ভাত পর্যন্ত ভারতে যাওয়া মানুষদের খাওয়ানোর চেষ্টা করেছে। রাস্তায় বিশ্রাম নেওয়ার জন্য ঘরের বিছানাটা পর্যন্ত গাছের নিচে বিছিয়ে রেখেছে। পরে আমরা রাতে মামার বাড়ি দেবিদ্বারের গুনাইঘর যাই। মামার বাড়িতে আমরা প্রায় দুই মাস থাকি। এপ্রিলের শেষ কিংবা মে মাসের প্রথম দিকে, গুনাইঘর গ্রামের কয়েকটি বাড়ি হানাদার বাহিনী আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। এতে বাবা কিছুটা ভীত শন্ত্রস্থ হয়ে পড়ে আমাদের নিয়ে। পড়ে আমরা মে মাসের শেষ দিকে মামার পরিবারসহ ৪০ জন এক সাথে ভারতের উদ্দেশ্যে পায়ে হাঁটা শুরু করি। কিভাবে কোন কোন রাস্তা দিয়ে গিয়েছি সেই নাম ঠিক মত মনে নেই। তবে এতটুকু মনে আছে,কসবা দিয়ে আমরা বক্্রনগর হয়ে ত্রিপুরা ঢুকেছিলাম। যখন আমরা গ্রামের আকাঁ বাকাঁ পথ পেরিয়ে মুল রাস্তায় উঠলাম তখন দেখলাম হাজার হাজার নারী পুরুষ,বৃদ্ধ ও শিশুদের লাইন। ঠিক যেমন রোহিঙ্গারা ২০১৭ সালে বাংলাদেশে যে ভাবে প্রবেশ করেছিল ।আমি হাঁটতে হাঁটতে এক পর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। তখন রাস্তার পাশের বাড়ির মহিলারা দৌঁড়ে এসে আমাকে মাথায় পানি ঢেলে সুস্থ করে। কত বয়স্ক মানুষকে দেখেছি রাস্তায় প্রচন্ড গরমের মধ্যে শুয়ে পড়েছে। একটু ঝোপ জঙ্গল দেখলেই আমাদের মা বোনেরা প্রকৃতির কাজটা সেরে নিচেছ। কেউ কারো দিকে কু দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে না। সে কি এক অপরূপ মানবিক দিক। সে দিন লক্ষ করেছি,মুসলমানেরা আমাদের হিন্দুদের কিভাবে সাহায্য করেছে। তারা সহযোগিতা করার সময় জানতে চায়নি আমরা হিন্দু,মোসলমান না বৌদ্দ খ্রীষ্টান। সীমান্তবর্তী মানুষদের সাহায্য ছাড়া আমি দৃড় ভাবে বলতে পারি একজন বাঙ্গালীর ও সম্ভব ছিল না সেদিন বর্ডার পার হওয়া। বর্ডার পার হয়ে আমরা সারা দিনের ক্লান্তি দূর করার জন্য একটি হোটেলে উঠি। এখান থেকে সোনামুড়া হয়ে বাবার এক জেঠাত ভাই বিপিন চন্দ্র সেন এর মেলাগড় বাড়ি যাই। আমাদের এই আত্মীয়ের বাড়িতে আমরা প্রায় দুই মাস থাকি। পরে বাবা মা দেখল এত গুলো মানুষ নিয়ে এক বাড়িতে এত দিন থাকা ঠিক না। পড়ে আমরা মেলাগড় সাবেরঝুম শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেই। মেলাগড় সাবেরঝুম শরণার্থী শিবিরটি ৪টি বøকে ভাগ ছিল। আত্মীয়ের বাড়িতে থাকার সময় অনুভব করতে পারিনি মানবেতর জীবন যাপন বলতে কি বুঝায়। এই শরণার্থী শিবিরে এসে বুঝলাম আসলে আমরা দেশ থেকে পালিয়ে এসছি। কষ্ট আমাদের করতেই হবে। বাঁশ এবং ছন দিয়ে আমাদের জন্য থাকার ব্যবস্থা করেছে। বিছানার অভাবে ছালা দিয়ে বিছিয়ে ঘুমিয়েছি। রাত হলেই পোকা মাকরের আক্রমন বেড়ে যেত। মনে হতো পাকিস্তানী ও রাজাকারদের দোষর হিসেবে তারা ভারতে এসেছে। শরণার্থী শিবিরের সবচেয়ে বড় কষ্ট ছিল, বিশুদ্ধ পানির অভাব, জ্বালানীর অভাব এবং চিকিৎসার অভাব। অনেক উচু পাহার থেকে গাছ বা ঢালা কেটে জ্বালানী নিয়ে আসতে হতো, মাথায় করে উচু নিচু জায়গায় থেকে পানি আনতে হতো। ছোট ভাইটি ছাড়া আমরা অপর ৫ ভাই এই সীমাহীন কষ্টটি করেছি। পাহার থেকে জ্বালানী আর পানি আনতে সেদিন কি যে কষ্ট করেছিলাম তা ভাবলে এখনো শিউরে উঠতে হয়। তবে বনের দায়িত্বরত ভারতীয়দের ভুমিকার প্রশংসা করে ধ্রæব প্রসাদ সেন বলেন, বনের দায়িত্বরতরা বলত, তোমরা কখনো চাড়া গাছ গুলো কাটবে না। বড় গাছের ঢাল গুলো কেটে জ্বালানী কর। তারা ঢাল কাটা থেকে শুরু করে পানি আনার কাজেও আমাদের সাহায্য করত। মেলাঘড় এলাকার সেই ভারতীয় মানুষদের সহযোগিতামুলক মনোভাব না থাকলে আমরা হয়তো বাঁচতামও না। পানির যে ব্যবস্থা ছিল তা খুবই অপ্রতুল। ফলে পাহারী ঝর্ণা বেয়ে পড়া পানি গুলো আনার ব্যাপারে আগ্রহী হতাম। এই পানি গুলো খেয়েই শরণার্থী শিবিরে হাজার হাজার বাঙ্গীলী কলেরা ও ডায়রিয়াসহ নানা পানি বাহিত রোগে আক্রান্ত হতো। চোখের সামনে দেখিছি কত শরণার্থী বাঙ্গালী চিকিৎসার অভাবে মারা গেছে। হাজারো স্বজন হারানো মানুষের কান্নায় প্রতিদিনই ভারী হয়ে উঠত আমাদের শিবির। শিবিরে গিয়ে বাবাও কিছুটা অসুস্থ হয়ে গেল। মা আমাদের ৬ ভাই ও ২ বোনকে আগলে রেখেছেন। কত কষ্ট করেছেন সেই বিষয়ে বললে হাজারো দিন শেষ হয়ে যাবে তবুও শেষ হবে না।
কবে দেশে এলেন এবং দেশে এসে কি দেখলেন জানতে চাইলে দেব প্রসাদ সেন বলেন, ক্যাম্পে থাকা অবস্থাতেই শুনি কুমিল্লা শহরে আমাদের দুটি ঔষধের দোকান লুট হয়ে গেছে। বাড়ি ঘরে আগুন দিয়েছে। দেশ স্বাধীন হয়েছে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। আর আমরা দেশে এসেছি জানুয়ারি মাসে । কুমিল্লা এসে দেখি বাবার সাজানো গোছানো সেই ব্যবসা আর বাড়ি ঘর কিছুই নেই। সব শেষ। পারিবারিক ভাবে এই যে আমরা পেছনে পড়লাম স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরেও আমরা আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারলাম না।অভাবের মধ্যেই এক পর্যায়ে বাবা ও বড় ভাই মারা যায়। ছোট ভাই বিদেশ আছে। আমরা ৪ ভাই পরিবার নিয়ে ছোট এই জীর্ণ শীর্ণ আস্তর খসে পড়া এক তলা ৫ রুমের এই বাড়িতে আছি।
মনমোহন সেনের চার ছেলে দেব প্রসাদ সেন,ধ্রæব প্রসাদ সেন,শিব প্রসাদ সেন ও শুভাশিস প্রসাদ সেন শংকর এই প্রতিবেদককে দু:খ করে বললেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আজ পর্যন্ত আমাদের সরকার গুলো তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যই সব কিছু করল। অথচ এই যুদ্ধের জন্য দেশের জন্যই তো আমরা বাড়ি ব্যবসা সব কিছু হারালাম। কিন্তু আমাদের শরণার্থীদের জন্য কোন সরকারই কিছু করল না। না পাইলাম অর্থ, না পাইলাম সম্মান।তারা চার ভাই শরণার্থীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবী জানান।