মঙ্গল্বার ২ জুন ২০২০
  • প্রচ্ছদ » sub lead 2 » শরণার্থীদের খুঁজে… ২ প্রচন্ড গুলির শদ্ধে ভারতে পালিয়ে যাই-সৈয়দ জয়নাল আবেদীন


শরণার্থীদের খুঁজে… ২ প্রচন্ড গুলির শদ্ধে ভারতে পালিয়ে যাই-সৈয়দ জয়নাল আবেদীন


আমাদের কুমিল্লা .কম :
02.03.2020

শাহাজাদা এমরান।। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আল্লাহকে বলতাম আল্লাহ আজকের দিনটা আমরা বাঁচব কি না। রাতে শোয়ার সময় বলতাম আজকের রাতটি আমাদের জীবনে শেষ রাত কিনা। এই চিত্র ছিল চড়ানল গ্রামের সবারই। আমাদের গ্রাম সংলগ্ন রেল লাইনের ওপাশে ছিল পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর ব্যাংকার। আর আমাদের গ্রাম থেকে ভারতের বক্সনগর ছিল মাত্র কয়েকশ গজ দূরে। তাই স্বাধীনতা যুদ্ধে এই অঞ্চলে পাকিস্তান বাহিনীর অত্যাচার নির্যাতনের মুল কেন্দ্র বিন্দু ছিল আমাদের চড়ানল গ্রাম। প্রতিদিন অসংখ্য গুলি ও বোমা বিস্ফোরণ করা হতো আমাদের গ্রামে।গ্রামের বেশীর ভাগ মানুষই বক্সনগরে চলে যায়। বাবা শেষ পর্যন্ত দেশে থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু একদিন দুপুরে প্রচন্ড বোমা বিস্ফোরন শুরু হলো গ্রামে। একটি বোমা এসে পড়ল আমাদের বাড়ির উঠানে। তখন আমরা সব ভাই বোন মিলে যখন হাউ মাউ করে কেঁদে উঠলাম তখন বাবা আর কোন উপায় না দেখে চোখের পানি ছেড়ে মা কে বললেন,আর বাড়িতে থাকা যাবে না। দ্রæত রেডি হও।এভাবেই সে দিন জীবনবাজী রেখে আমরা ভারতে শরনার্থী হয়ে আশ্রয় নিয়েছিলাম। কথা গুলো বলছিলেন কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের চড়ানল গ্রামের সৈয়দ আবদুল মজিদের ছেলে সৈয়দ জয়নাল আবেদীন।
পিতামাতার ৫ ছেলে ও ২ মেয়ের মধ্যে জয়নাল আবেদীনের অবস্থান ৩য়। সরেজমিনে গিয়ে কথা বলি এই শরণার্থীর সাথে।
কিভাবে কেন শরণার্থী হয়ে ভারতে আশ্রয় নিলেন জানতে চাইলে প্রথমেই কিছুটা বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন জয়নাল আবেদীন। পুরান কথা জানতে চাইয়া কেন দু:খ দিতে আইছেন পাল্টা প্রশ্ন করে বসল এই প্রতিবেদককে। ক্ষনিকের মধ্যেই নিজকে কিছুটা সামলে বলা শুরু করলেন তিনি। সৈয়দ জয়নাল আবেদীন জানান,খুব সম্ভবত বাংলাদেশের মধ্যে আমাদের গ্রামটিই একমাত্র গ্রাম হবে যেই গ্রামের সবাই স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। আমাদের এই চড়ানল গ্রামটি খুব বড়। গ্রামের পাশেই রেললাইন। রেললাইনের ঠিক ওপারেই ছিল পাকিস্তান বাহিনীর ক্যাম্প। আবার গ্রামের ভিতর পুকুর ঘাট সংলগ্ন এলাকায় ছিল মুক্তিবাহিনীর ব্যাংকার। আর আমাদের গ্রামের গাঁ ঘেষে যে গ্রামটি এটা হলো ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বক্্রনগর। ১৯৭১ সালের মার্চের শেষ দিকে দেশে যুদ্ধ শুরু হয়। তখন আমার বয়স ১২ থেকে ১৩ বছর হবে। মার্চে আমরা কিছু বুঝতে পারিনি। কিন্তু এপ্রিলের প্রথম দিকেই পাকিস্তানী বাহিনী চড়ানল রেললাইন সংলগ্ন এলাকায় ক্যাম্প করে। তখনো এই গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাংকার গড়ে উঠেনি। কিছু দিন পড়ে হয়েছে। পাকিস্তানী বাহিনী ক্যাম্প করেই প্রতিদিনই গ্রামের বিভিন্ন পয়েন্টে পালাক্রমে বোমা বিস্পোরন আর গুলি ছুঁড়ত। ভয়ে আমরা ঘর থেকে বের হতাম না। যখন চৌধুরী পুকুর ঘাট সংলগ্ন এলাকায় আমাদের মুক্তিবাহিনীর ব্যাংকার গড়ে উঠল তখন এর মাত্রা অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে যায়। ইতিমধ্যে তাদের ছোঁড়া বোমা বিস্ফোরনে কয়েকজন মারা যায় আর আহত হয় অসংখ্য মানুষ। এই অবস্থায় গ্রাম ছাড়তে শুরু হরে শত শত গ্রামবাসী। বাড়ি ছেঁড়ে যাওয়ার সে কি কান্না তা না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না। যাওয়ার সময় শুধু কিছু কাপড় চোপড়,সামান্য চাল ডাল আর কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস ছাড়া সব কিছুই রেখে যেতে হয়েছে। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে পাকিস্তানী বাহিনীর অত্যাচার নির্যাতনও। সুযোগ পেলেই তারা গ্রামে ঢুকে হাঁস মুরগী গরু ছাগল ধরে নিয়ে যেত। আর নানা নির্যাতনতো ছিলই। এমন অবস্থায় আমরা ভাই বোনেরা সব সময় কান্নাকাটি করতাম। ওপারে চলে যাওয়ার জন্য। বাবা নিজের ভিটে মাটি ছেড়ে প্রথমে যেতে রাজি হয়নি। একদিন যখন আমাদের ঘরের উঠানে এসে একটি বোমা পড়ে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল ঠিক তখন আমরা মার গলা ধরে উচ্চস্বরে কান্না করতে থাকি। বাবা বাড়ি এসে এ দৃশ্য দেখে ঐ দিন ঐ সময়েই বললেন, না, আর না। সবাই রেডি হও। আমাদের পড়নে যা ছিল তাই নিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করলাম। সাথে চাউলের বস্তা,কাথা বালিশ,কিছু হাড়ি পাতিলসহ প্রয়োজনীয় কিছু নিলাম। রাস্তায় এসে দেখি হাজার হাজার নারী পুরুষ, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা,শিশুর লাইন। আহ্ ।সে কি করুণ এক দৃশ্য। শিশুদের কান্না কাটি,বৃদ্ধ মানুষ গুলো হাটতে পারছিল না। মহিলারা বাধ্য হয়ে রাস্তা থেকে নেমে জমির উপর খোলা আকাশের নিচে প্রকৃতির কাজ সারছিল। তখন কেউ কারো দিকে তাকানোর সুযোগ ছিল না। কখন বোমা এসে পড়ে এই ছিল সবার মধ্যে আতংক। সামনে পাকিস্তানী আর্মিরা পড়ে কি না ইত্যাদি টেনশন নিয়ে সবাই সামনে এগিয়ে যাচ্ছিল। আমাদের গ্রাম থেকে ব´নগর খুব বেশী দূরে না। যার কারণে আমাদের খুব বেশী যাওয়ার সময় কষ্ট করতে হয়নি। কিন্তু যারা অনেক দূর থেকে আসছিল কত কষ্ট করছিল তা মনে হলে এখনো চোখের পানি রাখতে পারি না।
বক্সনগর গিয়ে প্রথম দুই দিন বিছানা বিছিয়ে খোলা আকাশের নিচে ছিলাম। পরে পাহাড় থেকে গাছ কেটে বাশ কেটে এনে বাবাসহ আমার বড় ভাইয়েরা ছোট একটি ছনের ঘর উঠায়। আমিও পাহাড়ে গিয়ে বাবার সাথে গাছ কাটায় সহযোগিতা করেছি। আর এর ঢাল গুলো নিচে নিয়ে আসতাম। আমাদের গ্রাম থেকে যাওয়া অধিকাংশ মানুষই আমরা বক্সনগরের ঐ খালি মাঠে ছনের ঘর উঠিয়ে থেকেছি। পরে রেশনের কার্ড করে রেশন উঠিয়ে খেয়েছি। এই ৯ মাস পাহাড়ে যে কত কষ্ট করেছি একমাত্র যারা শরণার্থী ছিলেন তারাই বুঝবে। বিশুদ্ধ পানি আর ঔষধের অভাব ছিল প্রচন্ড।মশার কামড় ছিল নিত্য সঙ্গি।
শরণার্থী জীবনের একটি দু:খজনক ঘটনার কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেললেন জয়নাল আবেদীন। তিনি জানান,জুন মাসের শেষের দিকে আমি আর আমাদের পাশ্ববর্তী গ্রাম পাঁচোরার একটি ছেলে আমাদের শিবিরের পাশেই একটি খালি জায়গায় লুডু খেলতে ছিলাম। এমন সময় আমাদের চড়ানল গ্রাম থেকে হানাদার বাহিনীর ছুঁড়ে দেওয়া একটি গুলি এসে তার গায়ে লাগে । এই মুহুর্তে তার নামটি মনে করতে পারছি না।সাথে সাথেই সে মারা যায়। আর সামান্য একটুর জন্য গুলিটি আমার গায়ে লাগে নি। পাঁচোরার এই যুবকের মৃত্যু ব´নগরের পুরো শিবিরে কান্নার রোল পড়ে গিয়েছিল। একই সাথে সবাই আংতকিত হয়ে গিয়েছিল। কারণ, আমাদের গ্রামের সবাই তখন সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বক্স নগরে চলে এসেছিল। হানাদার বাহিনী তখন পুরো গ্রামে রাজত্ব করছিল। তারা আমাদের চড়ানল গ্রাম থেকে প্রায়ই বোমা বিস্মোরণ ঘটাত এবং গুলি ছুড়ত ব´নগর গ্রামে। এরপর ব´ নগরে আমাদের গ্রামের হাজী আলী মিয়ার দুই ছেলে এবং সাঈদ মিয়া চৌধুরীও হানাদার বাহিনীর বোমা বিস্মোরণে মারা যায়।
কবে দেশে আসছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন,ডিসেম্বর মাসের শেষ দিকে আমরা দেশে আসতে শুরু করি। দেশে এসে দেখি, শুধু টিনের চালটি ছাড়া আমাদের ঘরে আর কিছুই নেই। বাবা আবার সেই শূন্য থেকে শুরু করে।সদ্য স্বাধীন দেশ। চারদিকে অভাব। কাজ কর্ম নাই। এক বেলা খেলে তো দুই বেলা খেতে পারতাম না। তখন আমরা সারা গ্রাম ঘুরে ঘুরে বন্ধুকের গুলির খোসা,ডেমেজ হয়ে যাওয়া বোমা গুলি টোকাইয়া টোকাইয়া সের মেপে বিক্রি করতাম। সেই বিক্রির টাকা দিয়ে অনেক দিন আমাদের সংসার চলতো। পরিবারের সবাই আমরা এগুলো টোকাইতাম। তখন আমাদের গ্রামের সবাই বন্ধুকের গুলির খোসা,ডেমেজ হয়ে যাওয়া বোমা টোকাইতাম। বাবা এগুলো বিক্রি করে সংসার চালাতো।
সৈয়দ জয়নাল আবেদীন বিক্ষুদ্ধ কন্ঠে বলেন,স্বাধীন হওয়ার পর আজ পর্যন্ত কোন সরকারই আমাদের প্রতি সুবিচার করেনি। আমরা যারা শরনার্থী হয়ে সীমান্তের ওপারে গিয়েছিলাম,এই মুক্তিযুদ্ধে আমাদেরও রয়েছে অনেক অবদান। আমরা প্রায়ই ওপার থেকে গ্রামে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের পানি,বিভিন্ন খাবারসহ নানা কিছু মাথায় করে নিয়ে ব্যাংকারে দিয়ে আসতাম। রাস্তাঘাট চিনিয়ে দিতাম। অথচ শরণার্থী হিসেবে আমরা কোন স্বীকৃতি পাই নি। কত কষ্ট করেছি। বর্তমান সরকারের কাছে আবেদন, দয়া করে শরাণার্থী হিসেবে আমাদের স্বীকৃতি দিন। আমাদের কল্যাণে কিছু ব্যবস্থা করুন।