সোমবার ৩০ gvP© ২০২০
  • প্রচ্ছদ » sub lead 3 » শরণার্থীদের খুঁজে… ৪ মুখের ভাত রেখেই দৌঁড় দেই-রাহিমা বেগম


শরণার্থীদের খুঁজে… ৪ মুখের ভাত রেখেই দৌঁড় দেই-রাহিমা বেগম


আমাদের কুমিল্লা .কম :
04.03.2020

শাহাজাদা এমরান।। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে ভাত রান্না করে স্বামী,শ্বশুর-শাশুরীকে নিয়ে মাত্র সকালের নাস্তা খেতে বসেছি। হঠাৎ করে গ্রামে আওয়াজ এলো-হানাদার বাহিনী গ্রামে ঢুকেছে।মুখের ভাত প্লেটে রেখে ঘরে যে যেভাবে ছিলাম দিলাম দৌঁড়। সীমান্তবর্তী গ্রাম হওয়াতে ওপারের বক্সনগর এলাকাটি আমাদের আগেই চেনা জানা ছিল। তাই বক্সনগর যেতে আমাদের কোন সমস্যা না হলেও ঘর থেকে রাস্তায় বের হয়ে দেখি মানুষ আর মানুষ। আমাদের চরনল গ্রামসহ আশেপাশের গ্রামের মানুষও যে যেভাবে পাড়ছে বক্সনগরের দিকে ছুটে চলছে। ছোট ছোট বাচ্চাদের কান্নার আওয়াজ আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠল।
সম্ভবত সকাল ৮কি সাড়ে ৮টার দিকে আমরা বক্সনগর গিয়ে পৌঁছলাম । ছেলে মেয়েদের এক জনের কাছে রেখে স্বামীকে নিয়ে জোহরের নামাজের পর আবার গ্রামে ফিরে এলাম। বাড়ি এসে দেখি অনেকের ঘর বাড়ি লুটতরাজ হয়েছে। কারো বাড়িতে আগুন জ্বলছে। আমি যে ভাবে থালা বাসন ভাত তরকারী রেখে গিয়েছিলাম সেভাবেই পড়ে আছে। কুকুর, বিড়াল ভাত তরকারী সারা ঘর ছিটিয়ে রেখেছে। কিছু কাপড় চোপড়, ঘরের চাল ঢাল যা কিছু ছিল এ গুলো নিয়ে বিকালে আবার বক্সনগর চলে যাই। যুদ্ধের পর বাড়ি এসে দেখি আমাদের ঘরের চালটি পর্যন্ত নেই।সব কিছু লুট হয়ে গেছে। কথা গুলো বলেই কাপড়ের আচল দিয়ে চোখের পানি মুছতে শুরু করলেন রাহিমা বেগম। এতক্ষন কষ্ট করে চোখের পানি সংবরণ করতে পারলেও এখন যেন আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারছেন না। এক পর্যায়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। বললেন,এত দিন পর কেন পুরানো কথা জানতে আসছেন। গন্ডগোল বছরের সেই ৯ মাস যে কি কষ্ট করেছি তা এক মাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানেন না। সেই ভয়াভহ কষ্টের কথা মনে হলো আজো ঘুমাতে পারি না।
কথাগুলো বলেছিলেন কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের চরানল গ্রামের মৃত আলী আহমেদের স্ত্রী রাহিমা বেগমের। ১৯৭১ সালে দেশে যখন স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হয় তখন তার বড় ছেলে শাহনেওয়াজের বয়স ছিল ৮ বছর আর মেয়ে কুহিনুর বেগমের বয়স ছিল ৮ থেকে ৯মাস। বাবার বাড়ি পার্শ্ববর্তী উপজেলা ব্রা²নপাড়ার শশিদলে। বাবা মৃত মফিজ আলী ছিলেন পেশায় কৃষক।
১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের শুরুতে পাকিস্থানী হানাদার বাহিনী যখন চরানল গ্রামের পাশে ক্যাম্প তৈরী করল তখনি যুদ্ধের আগুনের উত্তাপ গায়ে লাগতে শুরু করে আমাদের। তখন আমার শ্বশুরের এই চরানল গ্রামের অনেক কম বয়সের মেয়েদের নিরাপদ জায়গায় পাঠিয়ে দেওয়া শুরু করল। আমি দুই বাচ্চার মা। আমাকে নিয়ে স্বামী শ্বশুরের চিন্তার শেষ নেই। একদিন শ্বশুর বাড়ি থেকে বাপের বাড়ি শশিদলে নিরাপদ হবে ভেবে আমাকে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। কিন্তু আমাদের শশিদল গ্রামটিও ছিল সীমান্তবর্তী এলাকা। তাই এটিও ছিল হানাদার বাহিনীর টার্গেটের মধ্যে। গ্রামে গিয়ে শুনি আমাদের বাড়ির পাশের বাড়ির কয়েকজন বিবাহযোগ্য মেয়েকে হানাদার বাহিনী ধরে তাদের ক্যাম্পে নিয়ে গিয়েছিল। এ কথা শুনে তো আমি অজ্ঞান। আমাকে পেয়ে বাবা মা যেখানে খুশি হবে সেখানে তাদের মধ্যে আতংক আরো বেড়ে গেল। আমাদের বাড়িটি নিরাপদ মনে না করে বাবা আমাকে পাঠিয়ে দিলেন তার এক ফুফাত ভাইয়ের বাড়িতে। সেখানে ৪/৫দিন থাকার পর খবর পেয়ে আমার স্বামী আমাকে শ্বশুর বাড়ি নিয়ে আসেন। এরপর পরদিনই ঘর বাড়ি ছেড়ে ভারতের বক্সনগর চলে যাই শরণার্থী হয়ে।
শরণার্থী জীবনের অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে বয়সের ভারে নূহ্য রাহিমা বেগম কাপড় টেনে আঁচল দিয়ে চোখ মুছেন আর বলেন, বাবারে সেই সব কষ্টের দিন বলে এখন কি হবে?সরকার কি আমাদের সাহায্য করবে,আপনি কি আমাদের কিছু দিবেন। তাহলে সেই কষ্টের কথা গুলো কেন মনে করে দিলেন। এ কথা বলে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন রাহিমা বেগম। এরপরই যেন তিনি সম্বিত ফিরে পেলেন। বলে গেলেন, ভারতের বক্সনগর গিয়ে প্রথম কয়েক দিন এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাসায় ছিলাম।স্বামী ছেলে মেয়ে শ্বশুর শাশুরি নিয়ে এক জনের বাসায় আর কত দিন থাকা যায়। তাই কিছুদিন পর গ্রামের পাশেই এক বড় মাঠ ছিল। আমাদের গ্রামের অধিকাংশ মানুষকেই এই মাঠে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। এখানে তাবু করে থেকেছি। এটি কাগজে কলমে শরণার্থী শিবির না হলেও পুরো মাঠেই ছিল শরণার্থীরা। আমাদের চাল আটা আমার স্বামী দূরের একটি শরণার্থী শিবির থেকে কাগজ দেখিয়ে নিয়ে আসতো। এই মাঠের অন্য পরিবার গুলোও তাই করত। এই শিবিরে আমাদের সবচেয়ে কষ্ট ছিল খাবার পানি আর জ্বালানী সংকটের। পাহাড় থেকে অনেক কষ্ট করে ডাল পালা এনে রান্না করতাম। আর ২৪ ঘন্টাই ভয়ে থাকতাম কখন জানি আমাদের গ্রাম থেকে হানাদার বাহিনীর ছুড়ে দেওয়া বন্ধুকের গুলি ও বোমা এসে পড়ে আমাদের মাঠে।আমরা আসার কিছু দিন পরের ঘটনা। চরানল গ্রামের এক লোক, আমাদের তাবুর কয়েকটা তাবুর পরেই ছিল তার তাবু। দুপুরে খেয়ে দেয়ে তারা লুডু খেলতে ছিল। এমন সময় আমাদের গ্রাম থেকে ছুঁড়ে আসা একটি গুলি গিয়ে পড়ে তাদের তাবুতে পরে ঘটনাস্থলেই সেই লোকটি মারা যায়।তার রক্তে পুরো তাবু রক্তাত্ত হয়ে গিয়েছিল। ঐ দিন আমাদের ঐ মাঠে প্রায় একশ’র মত তাবু করে থাকা পরিবার ছিল যারা নিজের মা বাবা মারা গেলে যে ভাবে কান্না করত সে ভাবে কান্না করেছে। এভাবেই অনেক দু:খশোকের মধ্যে দিয়ে আমাদের দিন কেটেছে সেখানে।
মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন শরনার্থী হিসেবে বর্তমান সরকারের কাছেআপনার চাওয়া পাওয়ার আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ৭৫ থেকে ৮০ বছর হবে আমার এখনো বয়স্ক ভাতা পাইনি। আর কত বছর হরে ভয়স্ক ভাতা পাব জানতে চান তিনি। রাহিমা বেগমের দাবী সরকার যেন হয় আমাদের শরণার্থী হিসেবে ঘোষনা দিক নতুবা আমাকে যেন বয়স্ক ভাতা দেওয়া হয়। যাতে জীবনের এই পর্যায়ে এসে একটু ভাল ভাবে বেঁচে থাকতে পারি।