বুধবার ১ GwcÖj ২০২০
  • প্রচ্ছদ » sub lead 3 » শরাণার্থীদের খোঁজে… ৫ খুব কাছ থেকে মৃত্যু দেখেছি-ডা.মজিবুর রহমান


শরাণার্থীদের খোঁজে… ৫ খুব কাছ থেকে মৃত্যু দেখেছি-ডা.মজিবুর রহমান


আমাদের কুমিল্লা .কম :
05.03.2020

শাহাজাদা এমরান।। বাবা ছিলেন স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতা। তাই পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর টার্গেট ছিল আমাদের বাড়ি। স্থানীয় এমপি হাজী আলী আকবরের ঘনিষ্ট সহচর ছিলেন বাবা। এমপি চাচার নির্দেশ মতো বাবা ডা.ইয়াকুব আলী আমাদের নালঘর এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সংগঠিত করতে থাকেন। এ খবর পেয়ে যায় হানাদার বাহিনী। প্রায় আমাদের বাড়িতে হানা দিবে বলে প্রচার হতো এলাকায়। তাই রাতের আধারে বাবা- মা ,আমাকে ও ছোট বোনকে সাথে নিয়ে শরণার্থী হয়ে পাড়ি জমান ভারতে। সেদিন মৃত্যুকে হাতে নিয়ে আমরা ভারতের পথে রওয়ানা হয়েছিলাম। মনে হতো এই বুঝি হানাদার বাহিনী আমাদের ধরে ফেলল। মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে সেদিন দেখেছিলাম।
ডা.মো. মজিবুর রহমান। পিতা ডা.মো. ইয়াকুব আলী আর মাতা হাজেরা বেগম। ১৯৬৩ সালের ১অক্টোবর কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নের নালঘর গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। পিতা মাতার এক ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে তার অবস্থান ছিল প্রথম।
দেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে বাবা মা ও ছোট বোনের সাথে সেদিন শরাণার্থী হয়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কোদালিয়া গিয়েছিলেন সেদিনের পঞ্চম শ্রেনীর ছাত্র আজকের সফল চিকিৎসক ডা. মো. মজিবুর রহমান। শরণার্থী জীবনের কথা বলতে গিয়ে জানান,আমার বাবা তখন স্থানীয় আওয়ামীলীগের একজন সক্রিয় নেতা। স্থানীয় এমপি আলী আকবর চাচার ঘনিষ্ট সহচর ছিলেন। ১৯৭১ সালের মার্চের শুরু থেকেই দেশে একটা যুদ্ধের আবহ সৃষ্টি হয়। বাবাকে দেখতাম সারা দিন আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে সময় কাটাতেন। এমপি সাহেব একেক সময় একেক খবর বাবার কাছে পাঠাতেন। বাবা স্থানীয় আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের নিয়ে সেই কর্মসূচী বাস্তবায়ন করতেন।৭ মার্চের ভাষনের পর থেকেই দেশের মধ্যে এক যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করা শুরু করল। এরপর ২৫ মার্চ ঢাকায় নারকীয় তান্ডবের পর ২৬ মার্চ থেকে শুরু হলো যুদ্ধ । আমি তখন ছোট হলেও সব বুঝতাম।এপ্রিলের শুরু থেকেই দেশে তুমুল যুদ্ধ। বাবাকে দেখতাম রাত দিন স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করতে। এলাকার যুব সমাজকে সংগঠিত করতে। এমপি সাহেবের আদেশ নিষেধ মত প্রতিনিয়ত কাজ করতেন বাবা। এ খবর চয়ে যায় হানাদার বাহিনীর কাছে। তাই পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর টার্গেটে পরিণত হন বাবা। এলাকায় প্রতিদিনই খবর আসত হানাদার বাহিনী আমাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়ে বাবাকে ধরে নিয়ে মেরে ফেলবে। মাসহ আমরা আতংকিত হয়ে পড়লাম। এলাকার লোকজনও বাবাকে নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। তাই জুন মাসের ৫ তারিখ রাতে আমি মা বাবা ও ছোট বোনকে নিয়ে আমরা ভারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। রাত তখন ১২টা বাজে।আমরা চৌদ্দগ্রামের কাঠালিয়া সীমান্ত দিয়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সোনামুড়া যাই। সেখানে সোনামুড়া পশ্চিম জেলার পদুয়ারপাড় এলাকার আমাদের এক নিকট আত্মীয়ের বাসায় গিয়ে যখন উঠি তখন ৬ জুন সকাল। এই আত্মীয়ের বাড়িতেই আমরা সাত মাস থাকি। এই বাড়িটি হচেছ তৎকালীন কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার কোমাল্লা হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবদুল মান্নানের ছোট ভাইয়ের বাড়ি। আমাদের সাথে শরাণার্থী হয়ে গিয়েছিলেন আমার নানা আদর্শ সদর উপজেলার মনোহরপুর এলাকার আবদুল গনি সাহেব। আমাদের আত্মীয়ের বাড়ির পাশেই একটি শরণার্থী শিবির ছিল। বাবা দীর্ঘ সাত মাস পদুয়ারপাড় এলাকার একটি স্থানীয় বাজারে চেম্বার করা শুরু করলেন এবং পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে যাওয়া শরণার্থীদের বিনা পয়সায় চিকিৎসা দিয়েছেন। ভারতের পদুয়া পাড় এলাকাটি হচেছ আমাদের সদর উপজেলার একেবারে সীমান্তবর্তী শোভানগর এলাকার সীমান্তে। পদুয়াপাড় এলাকায় আমাদের সাথে প্রায় দেখা হতো মুক্তিযোদ্ধা সদর উপজেলার মান্দারিয়া গ্রামের আবু মুছা মজুমদার,জয়নাল আবেদীনসহ অনেকের সাথে।
শরণার্থী হিসেবে ভারতে থাকার সময়ের অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে ডা. মজিবুর রহমান বলেন, একদিন সকালে দেখলাম পদুয়ার পাড় এলাকার বিপরীত পাশ হলো আমাদের বাংলাদেশের সীমান্ত। আমাদের সীমান্তে কৃষকরা কাজ করছে। এমন সময় পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর একটি গুলি এসে পড়ল কৃষি জমিতে।সাথে সাথে জমিতে লুটিয়ে পড়েছে কৃষক।চোখের সামনে এই প্রথম দেখলাম একজন বাঙ্গালীর করুণ মৃত্যু। আমি সীমান্তের একেবারে কাছাকাছিই ছিলাম। গুলিটি আর একটু এগিয়ে আসলে আমার গায়ে এসে পড়ত। আমি দৌঁড়ে চিৎকার দিয়ে বাসায় চলে যাই।
কবে দেশে আসলেন জানতে চাইলে ডা.মজিবুর রহমান বলেন,ডিসেম্বর মাসের ১২ তারিখ সকালের দিকে আমরা সপরিবারে বাড়ি আসি। বাড়ি এসে দেখি,আমাদের বাড়ি ঘর সব জ্বালিয়ে দিয়েছে। শুধু ঘরের ভিটটুকু ছাড়া আর কিছুই নেই। স্থানীয় নালঘর বাজারে আমার বাবার ফার্মেসী ছিল। হানাদার বাহিনী বাবাকে না পেয়ে যে দিন আমাদের বাড়ি ঘর পুড়িয়ে ছিল একই দিন বাজারের দোকানটিও পুড়িয়ে ফেলছিল। বাবা আবার শূন্য থেকে তার জীবন শুরু করেন।
ডা.মজিবুর রহমান বলেন,মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থী হয়ে ভারত যাওয়ার আগ পর্যন্ত চৌদ্দগ্রামের প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখতে হলে আমার বাবা ডা. ইয়াকুব আলীর নাম লিখতেই হবে। কারণ,নালঘর এলাকা সংগঠিত করার পিছনে বাবার ভুমিকা ছিল উল্লেখ করার মত। মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করার কারণেই হানাদার বাহিনী বাবাকে না পেয়ে আমাদের বাড়ি ঘর, দোকানপাট জ্বালিয়ে দিয়েছিল। তাই সরকারের কাছে আমার অনুরোধ থাকবে,কোন রাজনৈতিক বিবেচনা না করে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করতে জনমত গঠন করতে এলাকা ভিত্তিক যার যে ভুমিকা ছিল ,তাদের স্বীকৃতি দিন। তাহলে জাতি তার মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে পারবে।