মঙ্গল্বার ২ জুন ২০২০
  • প্রচ্ছদ » জেলা উপজেলার খবর » অবশেষে ছুটিতে গেলেন হোমনার ইউএনও ! # আমরা আর এই ইউএনওকে চাই না -এমপি মেরী # একজন সাংসদ এতো ছোট বিষয় নিয়ে এভাবে হুমকী দেবেন তা ভাবতেও পারিনি- ইউএনও


অবশেষে ছুটিতে গেলেন হোমনার ইউএনও ! # আমরা আর এই ইউএনওকে চাই না -এমপি মেরী # একজন সাংসদ এতো ছোট বিষয় নিয়ে এভাবে হুমকী দেবেন তা ভাবতেও পারিনি- ইউএনও


আমাদের কুমিল্লা .কম :
06.03.2020

স্টাফ রিপোর্টার।। কুমিল্লার হোমনা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) তাপ্তি চাকমার ২৪ ঘন্টার মধ্যে প্রত্যাহার চেয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন কুমিল্লা-২ (হোমনা ও তিতাস) আসনের সংসদ সদস্য সেলিমা আহমাদ মেরী। অশেষে তাঁর বেঁধে দেওয়া সময়সীমার মধ্যেই ইউএনও তাপ্তি চাকমা এক সপ্তাহের ছুটিতে কর্মস্থল ত্যাগ করেছেন। গত বুধবার সকালে ইউএনও হোমনা থেকে কুমিল্লায় চলে আসেন। ভারপ্রাপ্ত উপজেলা কর্মকর্তা নির্বাহী অফিসার হিসেবে বৃহস্পতিবার থেকে দায়িত্ব পালন করছেন হোমনার সহকারী কমিশনার (ভূমি) তানিয়া ভূইয়া। এমপির হুমকীতে ৭ দিনের ছুটিতে যাওয়া ইউএনও তাপ্তি চাকমা বৃহস্পতিবার সকালে এ প্রতিবেদককে বলেন ‘ আমি নাকি রাজাকার’ , আসলে আমি হয়তো রাজাকারের সংজ্ঞাও ভালভাবে বুঝি না।’

যে কারণে ঘটনার সূত্রপাত
চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে হোমনা ইউএনও’র প্রত্যাহার চেয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছেন সংসদ সদস্য সেলিমা আহমাদ মেরী। মঙ্গলবার দুপুরে কুমিল্লার হোমনা সদরে তার রাজনৈতিক কার্যালয়ে এ সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি অভিযোগ করেছিলেন ‘হকার্স লীগ সভাপতি মো. মমিন গত রবিবার রাতে সদর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মুজিবশতবর্ষের একটি ব্যানার টাঙাতে গেলে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের গাড়ি চালক মো. শাহজালাল কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত হয়েছেন। এ ব্যাপারে মমিন ইউএনও’র কাছে অভিযোগ করলে তার কোনো ব্যবস্থা নেননি। তিনি বলেন, এটা বিএনপি অধ্যুষিত এলাকা। এখানে এখনও রাজাকাররা আছে। আপনারা জানেন, আমার কাজ জনগণের সেবা করা। ইউএনওর কাজ আমার না। যদি আমার রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং সাধারণ জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে, সেখানে আমি আওয়াজ তুলব। আমি যখন ইউএনওকে ফোন করি, ওনি দুটি কথা বলেছেন, যা আমি গ্রহণ করি নাই। প্রথমত তিনি বলেছেন- এটা ড্রাইভারের জায়গা, সেখানে সে (ড্রাইভার) ব্যানার লাগাতে মানা করেছে। আমার কথা হচ্ছে, বাংলাদেশের আকাশ, মাটি, এমন কোনো জায়গা নেই- যেখানে বঙ্গবন্ধুর ছবি লাগানো যাবে না? আর ড্রাইভারের ওই জায়গাটাও তো পৌরসভার জায়গা। দ্বিতীয় কথাটি ইউএনও বলেছেন যে, তাহলে উপজেলা চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলেন। আমি প্রশাসনকে ফোন করেছি। প্রশাসনকে বেতন দেয় সরকার। ইউএনও সরকারের বেতনভুক্ত কর্মচারী। সুতরাং এখানে ইউএনওর একটা বড় দায়িত্ব আছে। এ ব্যাপারে ডিসি সাহেবকেও বলেছি।’ এর আগে ইউএনওর প্রত্যাহার চেয়ে হকার্স লীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ একযোগে বিক্ষোভ প্রদর্শন ও সমাবেশ করেন। এর পরেই তিনি তাৎক্ষণিকভাবে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন।
এ ব্যাপারে হকার্স লীগ সভাপতি মমিন বলেন, আমি বাসস্ট্যান্ডে ব্যানার লাগাতে গেলে উপজেলা চেয়ারম্যানের ড্রাইভার শাহজালাল আমাদের বাধা দেয় এবং মারধর করতে আসে। ব্যানার লাগাতে না পেরে চলে আসি। পরে ইউএনওর কাছে অভিযোগ করি। ইউএনও আমার কথা শুনে শাহজালালকে ডেকে আনেন। শাহজালাল এসে তার বক্তব্য অস্বীকার করে। পরে ইউএনও তাকে সরি বলতে বলেন। আমি এই বিচার না মেনে চলে আসি। ড্রাইভার শাহজালাল বলেন, বাসস্ট্যান্ডে আমাদের একটি ছোট দোকান আছে। সেটির চালায় উঠে ব্যানার লাগানোর সময় তাদের বলেছি, ‘চালাটি ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।’ আমি তাকে বকাঝকা কিংবা মারামারি করিনি।
জেলা প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা বলেন, একেবারে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইউএনওর বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন ও বিক্ষোভ মিছিল করা হয়। মুজিব শতবর্ষের ব্যানারের বিষয়টি একটি অছিলা মাত্র। মূলত সাংসদ সেলিমা আহমাদ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রেহানা বেগমকে সহ্য করতে পারছেন না। কারণ, রেহানা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী আবদুল মজিদের সহধর্মিণী।
সাংসদ সেলিমা আহমাদ বলেন, ‘উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বিএনপির লোককে গাড়িচালক রেখেছেন। ওই গাড়িচালক আমার হকার্স লীগের কর্মীকে মারধর করেছেন। ব্যানার টানাতে দেননি। ইউএনও কোনো সাজা দেননি তাঁকে। তাই আমরা আর এই ইউএনওকে চাই না।’
জেলা প্রশাসক মো. আবুল ফজল মীর বলেন, ‘ইউএনও ছুটিতে আছেন। আমরা তাঁকে প্রত্যাহার করিনি। প্রত্যাহার করতে যাব কেন?’
ইউএনও যা বলেন..
সাংসদের অভিযোগ প্রসঙ্গে বৃহস্পতিবার সকালে মুঠো ফোনে ইউএনও তাপ্তি চাকমা বলেন, হাকর্স লীগ সভাপতি মমিন একটি অভিযোগ করেছিলেন যে, মুজিববর্ষের ব্যানার লাগাতে গিয়ে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের ড্রাইভার শাহজালাল কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত হন। অভিযোগটি পেয়ে তাকে (শাহজালাল) ডেকে আনি। দুই পক্ষের কথা শুনার সময় তারা উচ্চস্বরে কথা বলেন। তখন তাদের নিবৃত্ত করতে উভয়কে সাজা দেওয়ার ভয় দেখাই। সঙ্গে সঙ্গে শাহাজালাল ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে মমিনের কাছে ক্ষমা চেয়ে জড়িয়ে ধরে। এতে উভয়েই সন্তুষ্ট হয়ে আমার অফিস থেকে বের হয়ে যায়। কিন্তু পরে আবার কী হলো, বুঝতে পারছি না। তিনি আরও বলেন, ‘একজন সাংসদ এতো ছোট বিষয় নিয়ে এভাবে আমাকে হুমকী দেবেন, হোমনা ছাড়ার আলটিমেটাম দেবেন তা ভাবতেও পারিনি। আমি নাকি রাজাকার ? রাজাকার কি এর সংজ্ঞাও আমি জানি না। আমি এতো অপছন্দের হয়ে গেলাম।’ তিনি আরও বলেন ‘ আমি একজন বিচারক অন্তত এতটুকু আমি বুঝি কাকে কখন কি অপরাধে সাজা দিতে হয়। সাজা কেন দিলাম না এটাই আমার অপরাধ। ছোট এই বিষয়টি এভাবে বড় করে সামনে আনা হবে তা ভাবতেও কষ্ট হয়। ছুটি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিষযটি বিধি মোতাবেক উদ্বর্তন কর্তৃপক্ষ অবগত আছেন, বর্তমানেও আমি হোমনার ইউএনও আছি, আমি এসিল্যান্ডকে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে ৭ দিনের ছুাটতে আছি, পরবর্তীতে যা নির্দেশনা আসবে তাই করবো।
এদিকে এ বিষয়ে একাধিকবার যোগাযোগ করেও সাংসদ সেলিমা আহমাদ মেরীর মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

কে এই তাপ্তি চাকমা ?
২০১৯ সালের ২৪ জুলাই তাপ্তি চাকমা হোমনায় যোগদান করেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে হোমনায় তাঁর প্রথম কর্মস্থল। তিনি পার্বত্য খাগড়াছড়ি জেলার বাসিন্দা। তিনি খাগড়াছড়ি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও খাগড়াছড়ি সরকারী কলেজ থেকে এইচএসসি ও চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ( নৃ বিজ্ঞান বিভাগে) এমএসএস করে ৩১ তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডার হিসেবে টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সহকারী কমিশনার হিসেবে যোগদান করেন। পরে ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ে বদলী হন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে সিনিয়র সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট হিসেবে কর্মরত ছিলেন।