সোমবার ১ জুন ২০২০
  • প্রচ্ছদ » sub lead 3 » শরণার্থীদের খোঁজে… ৮ বাবার দাহ না করেই শরণার্থী শিবিরে চলে যাই-কেশব কর্মকার


শরণার্থীদের খোঁজে… ৮ বাবার দাহ না করেই শরণার্থী শিবিরে চলে যাই-কেশব কর্মকার


আমাদের কুমিল্লা .কম :
08.03.2020

শাহাজাদা এমরান।। আমি তখন ব্রা²নবাড়িয়া জেলার সরাইল থানায় হিসাব রক্ষক হিসেবে চাকুরী করি।এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে এক দিন সকালে অফিস থেকে ছুটি নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছি । কিছু দুর আসার পর এলাকার একজন লোকের সাথে দেখা হয়। তিনি জানালেন,আজ সকালে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী তোমার বাবাকে ঘর থেকে ডেকে নিয়ে বাড়ির পাশেই দুই হাত পেঁছনের দিকে বেধে গুলি করে হত্যা করেছে ।আমাদের বাড়ির উঠান রক্তে লাল। সমস্ত বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি যেন বাড়ি না যাই। এ কথা যখন শুনছি তখনি চর্তুদিক থেকে গুলাগুলির আওয়াজ ভেসে আসছে। এটা হানাদার বাহিনীর না মুক্তি বাহিনীর তা বুঝার কোন উপায় নেই। দূর্ভাগ্য সন্তান আমি। বাবার জন্য কাঁদতেও সময় পাইনি। সোজা দৌঁড় দিয়ে পালাতে লাগলাম ভারতের দিকে। কারণ,বাবাকে দাহ করতে গেলে পাঞ্জাবীরা আমাকেও মেরে ফেলবে ।তাই বাবাকে দাহ না করে ভগবানের উপর ছেড়ে দিয়ে আগড়তলা চলে যাই। সেখানে ত্রিপুরা দক্ষিন জেলার খিলপাড়া ক্যাম্পে গিয়ে উঠি।
খিলপাড়া ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকায় আমার ছোট বোনের স্বামীর বাড়ি। তার স্বামীর নাম বাসুদেব মজুমদার।ছোট বোনের কাছে এক মাস থেকে মে মাসে আবার শরণার্থী শিবিরে চলে যাই।
কথা গুলো বলেছিলেন ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বুড়িচংয়ের প্রথম শহীদ সুরেশচন্দ্র কর্মকার ওরফে সুরেশ কবিরাজের ছেলে কেশব চন্দ্র কর্মকার। তার মাতার নাম সুশিলা রানী কর্মকার। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। ১৯৪৭ সালের ১ জুন তিনি বুড়িচং থানা সংলগ্ন এলাকার নিজ বাড়িতে জন্ম গ্রহন করেন। তার বাবা শহীদ সুরেশ চন্দ্র কবিরাজের আয়ুবের্দিক ঔষেধের দোকান ছিল বুড়িচংয়ে। এলাকায় বিপুল সম্পদের মালিক এই কবিরাজকে সবাই সম্মানও করতেন ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে।
শরণার্থী জীবনের কথা জানতে চাইলে ১৯৭১ সালে সরকারী চাকুরী করা কেশব চন্দ্র কর্মকার বলেন,ভাইরে কেউ সখে ভিটে মাটি ফেলে পরদেশে যায় না। আমরাও ইচ্ছে করে যাই নাই। আমি তখন সরাইল থানা পরিষদের হিসাবরক্ষক হিসেবে চাকুরী করতাম। থানা পরিষদে বাঙ্গালী অফিসাররা যার যার মত করে চলে যাচ্ছে। প্রতি দিনই পাঞ্জাবীরা অফিসে এসে আমাদের মুক্তি বাহিনী সম্পর্কে নানা কথা জানতে চায়। জানি না বললে বন্ধুক দেখিয়ে মেরে ফেলার হুমকী দিতেন। এই অবস্থায় চিন্তা করলাম, না, অফিসে থাকা আর নিরাপদ না। তাই এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। কিন্তু পথিমধ্যে শুনি পাঞ্জাবীরা বাবাকে নির্মম ভাবে হত্যা করে। তাই বাড়ি না এসে চলে যাই ভারতে।
কেশবচন্দ্র কর্মকার বলেন, ভারতে গিয়ে প্রথম এক মাস ছোট বোনের বাসায় থাকলেও পরে শরণার্থী ক্যাম্পে চলে যাই। ক্যাম্পে থাকা অবস্থায়ই সেখানকার একটি ঔষধ কোম্পানীতে চাকুরী করা শুরু করি। চাকুরীর টাকাও আমি শরণার্থী শিবিরে ব্যয় করেছি। পাশেই ছোট বোনের বাসা ছিল। আমার খাবার বিষয়ে তেমন কোন সমস্যা না হলেও দেখেছি শিবিরের হাজার হাজার মানুষের কত দূর্ভে্গা ছিল। বিশেষ করে খাবার পানি আনতে তারা যে কি কষ্ট করেছে তা একমাত্র ভগবান ছাড়া আর কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। আমাশা,ডায়রিয়া,খাজলি পোঁচরা ছিল শিবিরের একটি কমন রোগ। প্রতিদিন কেউ না কেউ ডায়রিয়ায় রোগে মারা যাচ্ছেই। এমনও দেখা গেছে এক দিনই ৮/১০ জন লোক মারা গেছে। আমি ঐখানে গিয়ে চাকুরী করার সুবাধে দেখছি, ঐখানকার লোক গুলো বাংলাদেশ থেকে যাওয়া শরণার্থীদের প্রতি ছিল খুবই আন্তরিক। তারা যতটুকু পেরেছে ততটুকু বাঙ্গালী শরণার্থীদের সাহায্য করেছে। তাদের সাহায্য ছাড়া শরণার্থীদের সেখানে থাকা প্রায় অসম্ভব ছিল।
তবে প্রায় আমাদের ক্যাম্প থেকে আমাদের বাংলাদেশ সীমান্তের গোলাগুলির আওয়াজ শুনতাম। তখন আমরা আতংকিত হয়ে উঠতাম। শরণার্থী শিবিরে দেখা যেত ছুটাছুটি। তখন নেতারা এসে এগুলো নিয়ন্ত্রন করত।
দেশ স্বাধীনের কয়েকদিন পরই আমি দেশে চলে আসি। দেশে আসার সময়ও নানা দূর্ভোগ ছিল উল্লেখ করে কেশবচন্দ্র কর্মকার বলেন, পাঞ্জাবীরা যে রাস্তায় রাস্তায় মাইন পুঁতে রেখেছিল। স্বাধীনের পর শরণার্থীরা যখন দেশে ফিরে আসে তখন সেই মাইনের বিস্ফোরণেও অনেক বাঙ্গালী মারা যায়। দেখা গেল একটি পরিবার ৫ জন সদস্য দেশে ফিরছে। এ সময় আগের জন বা একেবারে পেছনের জন্য মাইন বিস্ফোরণে মারা গেল। তখন বাকী ৪ জনের কান্না আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠত।
দেশে এসে কি দেখলেন জানতে চাইলে শহীদ সুরেশ কবিরাজের ছেলে কেশব চন্দ্র কর্মকার বলেন,বাড়ি এসে দেখি,বাবার শরীরের রক্ত উঠানের বিভিন্ন জায়গায় লেগে আছে। ঘরের ভিটে নানা গাছ গাছালি জন্মে ভরে আছে। আর ছাইয়ের স্তুপ হয়ে আছে সারা জায়গায়।এই অবস্থায় বাড়িতে না থেকে চলে গেলাম সরাইল অফিসে। অফিসে এসে দুই দিন থেকে ছুটি নিয়ে বাড়ি আসি। পরে ছোট করে ঘর উঠাই।
শেষ কথা জানতে চাইলে কেশব চন্দ্র কর্মকার বলেন, সরকারের কাছে আমার কোন দাবী নেই। দাবী শুধু একটাই, আমার বাবা যে বুড়িচংয়ের প্রথম শহীদ এই স্বীকৃতিটুকু আজ পর্যন্ত পেলাম না। ১৯৭৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর তৎকালীন বুড়িচং থানার ওসি লিখিত ভাবে আমাদের জানিয়েছেন , আপনার বাবাকে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী নির্মম ভাবে হত্যা করেছে। আমরা শোকাহত। অথচ স্বাধীনতার ৪৯ বছর পার হলেও আজ পর্যন্ত আমরা শহীদ পরিবারের সম্মান পেলাম না। এই স্বীকৃতিটুকুই আমরা সরকারের কাছে চাই।