সোমবার ৩০ gvP© ২০২০
  • প্রচ্ছদ » sub lead 1 » শরাণার্থীদের খোঁজে… ৯ অনিতার মা’র কথা এখনো মনে পড়ে- আবদুল খলিল


শরাণার্থীদের খোঁজে… ৯ অনিতার মা’র কথা এখনো মনে পড়ে- আবদুল খলিল


আমাদের কুমিল্লা .কম :
09.03.2020

শাহাজাদা এমরান।। সাক্ষাত মৃত্যুকে সঙ্গি করে সেদিন দ্বিতীয় কোন উপায় না দেখে ঘর বাড়ি ফেলে আল্লাহর নামে বাবা-মা আমাকে নিয়ে সোজা দৌঁর দিয়েছে ভারতের উদ্দেশ্যে। শুধু জীবনটা বাঁচানো জন্যই এই দৌঁড়।ক্লান্ত পরিশ্রান্ত দেহ নিয়ে যখন ভারতের বক্সনগরে ঢুকলাম তখন আর কোন হুশ ছিল না। একটি বড় খালি মাঠ ছিল। দেখলাম দেশের নানা প্রান্ত থেকে শত শত মানুষ এই মাঠে আসছে কেউবা অন্য দিকে যাচ্ছে। যারাই মাঠ ঢুকছে যার যার মত করে থাকার জন্য জায়গায় দখলে নিচেছ। আমি মাঠে গিয়েই শুয়ে পড়লাম। এক পর্যায়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। খাওয়া নেই,বিছানা নেই,স্বজন নেই এই মাঠে ঘুম থেকে উঠে দেখি প্রায় রাত হয়ে গেছে। এরই মধ্যে এখানকার এক হিন্দু মহিলা ছিল। তাকে অনিতার মা বলে সবাই ডাকে। কি ভাবে জানি কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে আমার মা’র সাথে খাতির হয়ে যায়। অনিতার মা আমাদের তার বাড়িতে আশ্রয় দিলেন। সে দিন অনিতার মা আশ্রয় না দিলে আমাদের দূর্ভোগ আরো বেড়ে যেত। তাই আজো অনিতার মা’র কথা মনে পড়ে। এভাবেই ভারতের এক হিন্দু মহিলার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেন শরণার্থী হিসেবে ভারতে যাওয়া কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের চরানল গ্রামের ছলিম খানের পুত্র মো. আবদুল খলিল ।
মো.আবদুল খলিল জানান,৭১ সালে আমার বয়স ছিল প্রায় ১২/১৩ বছর। বয়স কম হলেও মোটামোটি সবই বুঝতাম। দেশের অবস্থা যে ভাল না,যে কোন সময় যুদ্ধ লেগে যেতে পারে এটা অনেক দিন ধরেই গ্রামে বাজারে আলোচনা হতো। মার্চের শেষ দিকে যখন যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল তখন সাথে সাথে আমরা বুঝতে পারিনি। কিন্তু এপ্রিলের শুরুতেই আমাদের গ্রামে পাকিস্থান হানাদার বাহিনীর মহড়া শুরু হয়। আমাদের রেল স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় তারা ক্যাম্প করে। এই ক্যাম্প থেকেই পালাক্রমে সকাল দুপুর এবং রাতে তিনবেলা গ্রামে পালাক্রমে তারা মহড়া দিত। একেবারে সীমান্তবর্তী গ্রাম বলে পাঞ্জাবীরা শুরুতেই গ্রামটি যে তাদের এন্ট্রি এটি তারা বুঝে যায়। ফলে দিনের পর দিন গ্রামে হানাদার বাহিনীর অত্যাচারের মাত্রা বাড়তে থাকে। একদিন আমাদের চরানল গ্রামে পর পর ১২৮টি বোম ফেলা হয়।এই ঘটনার পর ২ দিনের মধ্যে পুরো গ্রাম খালি হয়ে যায়। বাবা ঐ দিনই হাতের কাছে যা ছিল তা নিয়েই আমাকে আর মা কে নিয়ে ভারতের বক্সনগরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। বাড়ি ছাড়ার সময় মা বাবার সে কি কান্না তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। মা ঘরটি তালা দেওয়ার সময় বারবার ঘরের সামনের দড়জাটি সালাম করছিল আর বলছিল বাঁইচা থাকলে আবার এই ভিটে আসব।
বক্সনগর গিয়ে প্রায় এক মাস অনিতার মা’র বাড়িতে ছিলাম। অনিতার মা’র সব কাজ করে দিত আমার মা। আর আমাদের জন্য ঘরের একটি রুম দিয়েছিল থাকার জন্য। এখানে ২/৩ মাস থাকার পর বাবা-মা লক্ষ করলেন যে, আমাদের আশ্রয় দিয়ে অনিতার মা’র কষ্ট হচেছ তাই আমরা নিজেরাই ঐ মাঠের এক কর্ণারে একটি ছোট ছাপরা ঘর তুলে সেখানে চলে যাই।
এই শিবির সম্পর্কে জানতে চাইলে শরণার্থী আবদুল খলিল জানান,আসলে কাগজে কলমে এটি কোন শরণার্থী শিবির ছিল না। এটি একটি বিশাল বড় খালি মাঠ ছিল আর আশে পাশের কয়েকটি অনাবাদী জমি ছিল এখানে। এই স্থানের বিপরীত পাশের গ্রামটিই ছিল আমাদের রাজাপুর ইউনিয়নের চরানল গ্রাম। তাই এই স্থানটি আমাদের গ্রামের কম বেশী সবারই চেনা জানা। তাই আমাদের গ্রামের মানুষ গুলো স্বীকৃত শরণার্থী শিবিরে না উঠে এখানেই ঘর তৈরী করে থেকেছিল। যাতে এখান থেকে সময়ে সময়ে ঘর বাড়িরও খোঁজ খবর নেওয়া যায়। আমরা শরণার্থী শিবিরে না থাকলেও আমাদের সবার নামেই রেশম কার্ড ছিল। আমরা সপ্তাহে ২ দিন বা কোন কোন সময় ১ দিন অনেক দুরে পা হেটে ক্যাম্প থেকে রেশম নিয়ে আসতাম।
এই মাঠে থেকেই বাবাসহ আমাদের গ্রামের সব পুরুষরাই ২ / ১ দিন পর পর বাড়ি যেতেন। আমাদের জমির বিভিন্ন শাক সবজি নিয়ে আসতেন। আবার অনেকে এই ক্যাম্পে থেকেই মুক্তি বাহিনীকে গ্রামে গিয়ে সাহায্য করতেন। মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা অনেকেই ছিল অন্য এলাকার। তাই বাবাসহ আমাদের ক্যাম্পের বড় পুরুষরা সুযোগ বুঝে গ্রামে গিয়ে তাদের সাহায্য করতেন আবার চলে আসতেন।
অক্টোবর মাসের শেষ দিকে হবে। বাবা একদিন রাতে শিবিরে এসে জোরে চিৎকার দিয়ে আমার মাকে বললেন, আমার সব শেষ। জানতে চাইলে বাবা কেঁদে কেঁদে বললেন, আমাদের বাড়ি ঘর সব জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। সে দিন বাবার কান্নার আওয়াজ আজো আমি শুনতে পাই।

এক দিন দুপুরে আমরা খেয়ে দেয়ে সবাই যার যার মত করে ঘুমিয়ে পড়েছি। এমন সময় আমাদের ঘরের ঠিক পেছনের দিকে এসে গাছের সামনে একটি আর্টিলারী বোম পড়ে।সাথে সাথে গাছটি উড়ে যায় এবং মাটি গুলোও সড়ে গিয়ে গর্ত হয়ে যায়। আমরা যারা মাঠের কর্ণারের দিকে ঘর তুলেছিলাম মাঠের অন্য প্রান্তের লোকেরা মনে করছে আমরা সবাই মারা গেছি। সারা মাঠসহ পাশের কয়েকটি খালি জমিতে কয়েকশ পরিবার ছোট ছোট ঘর তুলে এখানে বসবাস করে আসছিল। যাদের বেশীর ভাগই আমাদের বুড়িচং ব্রা²নপাড়া এলাকার মানুষ। সারা মাঠ জুড়ে শুরু হয়েছে কান্নার আওয়াজ। মুহুর্তের মধ্যে ভারতের সেনা বাহিনী বিএসএফ চলে আসে। তারা আমাদের শান্ত করে বলে ভয় নেই। তোমাদের গ্রামের সীমান্ত থেকে বোম ফেলেছিল পাকিস্তানী সৈনিকরা। আমরা মুক্তিবাহিনীকে বলে দিচ্ছি এই দিকটা নজর দেওয়ার জন্য। তোমরা মাঠ ছেড়ে কোথায়ও যেও না। পড়ে আবার আমাদের আরেক সমস্যা হবে। এভাবে ভারতীয় সেনারা অনেক বুঝিয়ে আমাদের আবার মাঠে ফিরিয়ে আনে।
ভারতীয় সেনারা আমাদের মাঠে ফিরিয়ে আনলেও পর দিন সকালে বাবা আমাদের নিয়ে বক্সনগর থানা থেকে ৩০০ গজ দূরে একটি পাহারে নিয়ে যান। সেখানেও অনেক মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। এখানে এসে আমরা দূর্গানগর থেকে রেশম আনতাম। এখানে আমাদের খুব কষ্ট হচিছল বিশেষ করে খাবার পানির সংকট ছিল তীব্র। পাহারের নিচে গিয়ে ঝর্ণা থেকে পানি সংগ্রহ করে আবার পাহারে উঠতাম। এক একটা মশা ছিল এক একটা হাতির মত।এখানেও ডায়রিয়ায় অনেকে মানুষ মারা গেছে। পানির জন্য অনেককে গোছলও করানো যায়নি। জায়গার জন্য কবরও দেয়া যায়নি। অনেক মরা মানুষ দেখেছি যাদের পুরানো কাপড় দিয়ে কোন মতে পেঁচিয়ে পাহারের নিচে গিয়ে ফেলে দিয়ে এসেছে। আর তার স্বজনদের বুক ফাটা কান্নায় মনে হয়েছে পাহাড় পর্যন্ত কেঁদেছে।
কবে দেশে আসলেন জানতে চাইলে মো.আবদুল খলিল বলেন, আমরা ডিসেম্বর মাসের শুরুতেই বুঝতে পারছি যে আমরা স্বাধীন হয়ে যাচিছ। কারণ, শরণার্থী শিবিরসহ পুরো ভারতেই আলোচনা হতো পাকিস্তানীরা যে কোন সময় আত্মসমর্পণ করবে। ডিসেম্বর মাসের ১২ তারিখে বাবার কাছে খবর এলো আমাদের গ্রামে আর পাকিস্তানী আর্মি নেই। এই খবর পেয়ে এর পরদিনই বাবা আমাদের রেখে বাড়িতে আসেন। বাবা দুই দিন বাড়িতে থেকে কোন রকম একটা ভাঙ্গাচুড়া ঘর তুলে তরপর সম্ভবত ১৫ ডিসেম্বর রাতে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসেন।
পরদিন সকালে সারা পাড়া মহল্লা হেটে হেটে দেখলাম কিছুই চেনা যাচ্ছে না। আমাদের চরানল গ্রামের এমন একটি বাড়ি ছিল না যেই বাড়ির কোন না কোন ঘর পুড়ানো হয়নি। তিনি বলেন, সারা গ্রামে ছড়ানো ছিটানো শত শত বোমের খোসা আমরা দেখেছি। গুলির স্পিন্টার পেয়েছি।এগুলো কুড়িয়ে কুড়িয়ে দোকানে দিয়ে আমরা টাকা রোজগার করতাম। কারণ,তখন বাবারও কোন আয় রোজগার ছিল না। গ্রামের সবারই গড়ে একই অবস্থা ছিল। ভারতে থাকতে কষ্ট হলেও খাবার কষ্ট খুব একটা ছিল না। কিন্তু দেশে আসার পর খাবার কষ্টও আমাদের পেয়ে বসল। খুব কষ্ট করে খেয়ে না খেয়ে আমাদের জীবন চলছিল অনেক দিন।
আমরা সরকারের কাছে দাবী জানাই,দেশের স্বাধীনতার আন্দোলনের জন্য পাকিস্থানী বাহিনী আমাদের বাড়ি ঘরও জালিয়ে দিয়েছিল। আমার বাবাও মুক্তিযোদ্ধাদের রাস্তাঘাট চিনিয়ে , ক্যাম্পে চালের বস্তা নিয়ে শাক সবজি নিয়ে গিয়ে সাহায্য করেছিল। আমরাও বাড়ি ছেড়ে পরদেশে ছিলাম। সুতরাং শরণার্থী হিসেবে আমরা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি চাই।