মঙ্গল্বার ২ জুন ২০২০


শরণার্থীদের খোঁজে… ১০ : অন্ধকার রাতে নৌকায় করে ভারতের উদ্দেশ্যে বাড়ি ছাড়ি-হাবিবুর রহমান


আমাদের কুমিল্লা .কম :
10.03.2020

শাহাজাদা এমরান।। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমাদের গ্রামে যে অবস্থা ছিল কখনো মনে হয়নি আমরা বেঁচে থাকব। কত দিন গেছে মা বাবার সাথে বড় বড় পাট ক্ষেতে গিয়ে লুকিয়ে ছিলাম জীবন বাঁচাতে। হানাদার বাহিনী গ্রাম থেকে চলে গেলে পাট ক্ষেত থেকে উঠে এসে ঘরে আসতাম। এমন করে কত দিন যে ছিলাম তার কোন হিসেব নেই। একদিন বিকালে যখন আমাদের গ্রামের একটি পাড়া হানাদার বাহিনী আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিল তখন বাবা মাকে বলল, না আর দেশে থাকা যাবে না। সে দিন ঘোর অন্ধকার রাত ছিল। চাঁদেও জোনাকিরা ছিল না। বাড়ির পাশে থাকা নৌকা নিয়ে আমাদের ৪ ভাই বোনদের নিয়ে বাবা মা ভারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। তখন ছিল বর্ষাকাল। চর্তুদিকে পানি আর পানি। নৌকা বিলে আসার পর দেখি আমাদের মত গ্রামের আরো ১০/১২ টি একাধিক নৌকা নিয়ে তারাও ভারতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছে। আমাদের নৌকা ভোরে গিয়ে ব্রা²নবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলার মন্দভাগ গিয়ে থামে। মন্দভাগ ঘাটে গিয়ে দেখি,আমাদের গ্রামের প্রায় অর্ধেকের বেশী মানুষই গ্রাম ছেড়ে চলে এসেছে আমাদের মত। মন্দভাগ নৌকা ঘাটে সে কি এক জন আরেক জনকে ধরে কান্না।আজ মনে হয় সেই কান্নার পানি গুলো যদি জমিয়ে রাখা হতো তাহলে একটি নদী হয়ে যেত। একজন আরেকজনকে ধরে অতীতে ভুল ত্রæটির জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছে। বেঁচে থাকলে দেখা হবে আর মারা গেলে যেন ক্ষমা করে দেওয়া হয় এই ছিল সেদিন ভোরে নারী পুরুষদের আহাজারি। মন্দভাগ খেয়াঘাট থেকে যেই না আমরা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কোনাবনের দিকে আগালাম তখন দেখি রাস্তায় হাজার হাজার মানুষের পা হেটে যাওয়ার মিছিল। নারী পুরুষ বৃদ্ধ শিশু হাটছে তো হাটছেই। পথে পথে শিশুদের চিৎকার চেচামেচি ছিল গগনবিধারী দৃশ্যের মত। সন্তান সম্ভাবা অনেক নারীকে দেখলাম হাটতে পারছে না। স্বামী বা বাবাকে ধরে ধরে হাটছে। সে কি যে করুন দৃশ্য ছিল এগুলো। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য রাস্তার পাশে কোন টয়লেটের ব্যবস্থা না থাকার কারণে একটু নিচু জমি দেখলেই নেমে পড়ত মানুষ গুলো। সে দিন কারো মধ্যে লজ্জা শরম ছিল না। শুধু একটাই চিন্তা ছিল বাংলাদেশের সীমানা থেকে সরে যেতে পারলেই জীবন বেঁচে যাবে।
শরণার্থী হাবিবুর রহমান জানান,বিকাল নাগাদ আমরা কোনাবনে গিয়ে পৌঁছি। ভারত সীমান্তে যাওয়ার পরেই দেখছি আমাদের দেশের মানুষ গুলো যে যার মত করে যে দিকে পারছে যেতে। কোনাবনে গিয়ে আমরা এক মুসলিম বাড়িতে আশ্রয় পাই। কিভাবে আশ্রয় পেয়েছিলাম এই মুহুর্তে মনে করতে পারছি না। এই মুসলিম বাড়িতে দুই দিন থাকার পর আমরা পার্শ্বর্তী একটি পাহারের নিচে দুই রুমের একটি ঘর উঠালাম।এই পাহাড়ে আরো অনেক শরণার্থী আছেন।এটি কোন শরণার্থী শিবির না। মুক্তিযুদ্ধের সময় পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরার বাংলাদেশ সীমান্তের সমস্ত এলাকা জুড়েই ছিল শরণার্থী।ভারতে তখন স্বীকৃত শরণার্থী শিবির যত লোকজন ছিল ঠিক তার চেয়ে বেশী লোক ছিল বিভিন্ন পাহারে,পর্বতে,মাঠে,ঘাটে,বনে জঙ্গলে। যে যেভাবে পাড়ছে সীমান্ত পাড় হয়ে ভারতে ঢুকছে। যেখানেই সুযোগ পেয়েছে আশ্রয় নিয়েছে।
হাবিবুর রহমান বলেন,আমরা যে পাহারের নিচে ছিলাম এই পাহারের উপরও ছিল অনেক শরণার্থী। এখানে সবচেয়ে কষ্টকর বিষয়টি ছিল, পাহারটি অনেক উঁচু।পানি আনতে হতো পাহার থেকে নিচে নেমে ঝর্ণা হতে। আমরা গোসল করতাম সপ্তাহে একদিন। পানির কষ্ট যে কি পরিমান ছিল তখন তা যারা শরণার্থী ছিল একমাত্র তারাই বলতে পারবে। পাহারের নিচে থাকার কারণে পানি তুলতে কিছুটা সুবিধা থাকলেও খাবার পানির সংকট ছিল তীব্র।আমরা পাহার সংলগ্ন যে মাঠে ছিলাম সেখানে আরো ২০/২৫টি পরিবার ছিল। আমাদের এই এলাকাটি ছিল বাংলাদেশ সীমান্তে। আমাদের বাংলাদেশ বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে প্রতিদিন ভোরে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী এখানে বোমা,আর্টিলারী ফেলত,গুলি করত।আমরা সব সময় চরম আতংকে থাকতাম। যখন গুলি বা বোমা ফেলা হত তখন মা আমাদের চার ভাই বোনকে এক সাথে জড়াইয়া ধরে কান্না করতেন আল্লাহকে ডেকে বলতেন হে আল্লাহ জীবন বাঁচাতে দেশ ছেড়ে বিদেশ আসলাম এখানে এসেও দেখি গোলাগুলি।তুমি আমার স্বামী সন্তানদের রক্ষা কর। প্রতিটি ভোর রাতকে আমরা মনে করতাম আমাদের জীবনের শেষ রাত। আমাদের বাড়িতে গৃহস্থ ছিল। বাবা ৮/১০ দিন পর পর বাড়িতে গিয়ে ধান চাল নিয়ে আসত।
যুদ্ধের সময় একটি ঘটনা বলতে গিয়ে হাবিবুর রহমান বলেন, তখন আমরা ভারতে শরণার্থী হয়ে ছিলাম। যে দিন সালদা নদীতে যুদ্ধ হয় সেদিন পাকিস্থানী হানাদার বাহিনী আমাদে বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দেয়। এরপর থেকে দেশ স্বাধীনের আগ পর্যন্ত বাবা আর কোন দিন বাংলাদেশে আসেনি। এই দিন গুলো আমাদের খুব কষ্টের গেছে। কারণ, আমরা যেখানে থাকতাম সেখান থেকে রেশম ক্যাম্প ছিল অনেক দূরে। পাহাড়ী পথ বেয়ে এই রেশম আনতে আমার আর বাবার অনেক কষ্ট হতো। অনেক অনেক কষ্টে কেটেছে আমাদের সেই দিন গুলো। তবে ভারতীয় হিন্দু পরিবার গুলোও সেই সময় আমাদের খুব সাহায্য সহযোগিতা করেছিল।
দেশ স্বাধীনের তিন দিন পর আমরা বাড়ি আসি। বাড়ি আসার পথে পথে ছিল জীবন মৃত্যুর হাতছানী। পাকিস্তানীরা সারা রাস্তায় রাস্তায় মাইন পেঁতেছিল। জীবনকে হাতে রেখে অবশেষে বিকালের দিকে বাড়িতে এসে পোঁছে দেখি বাড়ি ঘর কিছুই নেই। আমাদের আগে যারা এসেছিল তারা তাদের ঘর বাড়ি তৈরী করার কাজ শুরু করে দিয়েছে। আমরা ২ দিন অন্যের ঘরে ছিলাম। পড়ে বাশ মুলি দিয়ে ঘর তৈরী করে আমরা আমাদের ভিটার নিজ ঘরে উঠি।