সোমবার ১ জুন ২০২০
  • প্রচ্ছদ » জেলা উপজেলার খবর » শরণার্থীদের খুঁজে… ১১ : শিবিরে অসুস্থ মানুষ রেখে নেতারা পালিয়ে যায়- মফিজুল ইসলাম # সবাই যদি যুদ্ধ করে তাহলে শরণার্থীদের দেখবে কে ?


শরণার্থীদের খুঁজে… ১১ : শিবিরে অসুস্থ মানুষ রেখে নেতারা পালিয়ে যায়- মফিজুল ইসলাম # সবাই যদি যুদ্ধ করে তাহলে শরণার্থীদের দেখবে কে ?


আমাদের কুমিল্লা .কম :
11.03.2020

শাহাজাদা এমরান।। স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে বুড়িচং উপজেলা ছাত্রলীগের প্রথম যুগ্ম সম্পাদক ও যুদ্ধের সময় ভারতে শরণার্থী শিবিরে অবস্থান করা মো.মফিজুল ইসলাম বলেছেন, আমাদের শরণার্থী শিবিরে যখন শত শত মানুষ নানা রোগ শোকে অসুস্থ হয়ে মারা যাচেছ,চিকিৎসার সংকট,পানির সংকটের সাথে যখন খাবার সংকটও দেখা দিল তখন আমাদের শরণার্থী শিবিরের দায়িত্ব প্রাপ্ত নেতারা শিবির ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে যায়।যাবার সময় বলে যায়, তোমাদের জন্য চিকিৎসক নিয়ে আসতেছি। দেশ স্বাধীন হবার আগ পর্যন্ত সেই নেতাদের আর শিবিরের আশে পাশেও দেখিনি। যদিও কিছু দিন পর ক্যাম্পের দায়িত্ব নিয়ে অন্য নেতারা এসেছিল। তাদের কাছে শুনেছি,এই ক্যাম্পে থাকলে তারা নিজেরাও অসুস্থ হয়ে যেতে পারে এই ভয়ে সেদিন তারা পালিয়েছিল।
মো.মফিজুল ইসলাম । পিতা আবদুল হামিদ মা লুৎফুননেছা। পিতা মাতার ৬ ছেলে ও ২ মেয়ের মধ্যে তার অবস্থান প্রথম। ব্রা²নপাড়া উপজেলার শশিদল ইউনিয়নের সাজঘর গ্রামে তিনি জন্ম গ্রহন করেন। তিনি বুড়িচং উপজেলা ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম সম্পাদক। এই কমিটির সভাপতি ছিলেন বর্তমান স্থানীয় এমপি ও সাবেক আইন মন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু। ১৯৬৮ সালে এই কমিটি গঠিত হয়েছিল। তখন ব্রা²নপাড়া ছিল বুড়িচং থানার অর্ন্তভুক্ত।১৯৭০ সালে এস এস সি পরীক্ষা দেওয়া এই ছাত্র নেতা জানান, আমরা অস্টম শ্রেনীতে থাকার সময় থেকেই পাকিস্তানী শাসকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসছি। ছয় দফার আন্দোলনেও অংশ নিয়েছি । বুড়িচং ব্রা²নপাড়ায় মিছিল মিটিং করেছি। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের পর থেকেই স্বাধীনতার পক্ষে থানায় আমরা জনমত গঠন করি। ২৫ মার্চের কালো রাত্রের পর থেকে যখন দেশে যুদ্ধ শুরু হলো তখন নেতারা যে যার মত করে ভারতে চলে গেল। তখন আমার সাথে সব সিনিয়র নেতাদের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এর পর প্রায় ১৫ দিন বাড়িতে গৃহবন্দির মত ছিলাম।নেতাকর্মী কারো সাথে কোন যোগাযোগ নেই। বুড়িচং সদরের সাথেও তেমন যোগাযোগ নেই। দিন রাত যতনা ঘটনার খবর আসত তার থেকে বেশী আসত গুজবের খবর। সীমান্তবর্তী গ্রাম হওয়াতে হানাদার বাহিনীর আনাগোনাও দিন দিন বেড়ে চলছে। এলাকার মানুষ এসে বাবা মা কে বলত,আপনারা ছেলে ছাত্রলীগ করে। পাঞ্জাবীরা জেনে গেছে। তাকে ইন্ডিয়া পাঠিয়ে দিন। শুরু হলো বাবা মা’র কান্না কাটি।এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে আমাদের পাশের বাড়ির কয়েকটি ঘর একদিন রাতে কে বা করা আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিল। এই ভীবিষিকাময় পরিস্থিতির মধ্যে বাবা বললেন,না,গ্রামে আমাদের আর থাকা নিরাপদ নেই। কাল সকালেই আমরা ভারতে চলে যাব।মা রাতেই যতটুকু সাথে নেয়া যায় তা তৈরী করে রাখলেন। মা,বাবা,বড় বোন,আমিও আমার দেড় বছরের ছোট ভাইসহ আমরা পাঁচজন আল্লাহর নাম নিয়ে সকালের সূর্য উঠার আগেই ভারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। আমরা ভেবেছি আমরাই শুধু পালিয়ে ভারত যাচ্ছি। কিন্ত না,মুল রাস্তায় উঠে দেখি হাজার হাজার নারী,পুরুষ,শিশু ও বৃদ্ধ,বৃদ্ধারা হাতে,মাথায়,কোমড়ে বোঝা নিয়ে হাটছে। আমরা সাজঘর থেকে কালেমকান্দি,বাগড়া হয়ে অষ্ট জংগল হয়ে পরদিন ভারতে গিয়ে পৌঁছি। আমরা রাত কাটাই সীমান্ত এলাকা কৈখোলা গ্রামে এক স্বজনের বাড়িতে। পরদিন সকালে এখান থেকে কোনাবন দিয়ে ভারতের গোকুল নগর হয়ে ট্রানজিট ক্যাম্পে যাই। এই ক্যাম্পে কয়েক দিন থাকার পর নানা সমস্যা দেখা দিল। পরে আমরা আবার উত্তর বঙ্গের বিরাশী মাইল শরণার্থী ক্যাম্পে চলে আসি।
আমার যতটুকু মনে পড়ে, আমাদের শরণার্থী ক্যাম্প গুলোর মধ্যে সম্ভবত এই ক্যাম্পটিই ছিল পাহাড়ের উপর।এই বিরাশী মাইল ক্যাম্পে আসার মাত্র ৭ দিনের মধ্যে আমার ছোট ভাই অহিদুল ইসলাম ডায়রিয়ায় মারা যায়। আমার ভাইকে বাঁচানোর জন্য মা,বাবা,বড় বোন আর আমি কত চেষ্টা করেছি,কত জায়গায় গিয়েছি কিন্তু সঠিক চিকিৎসা করাতে পারিনি। শরণার্থী ক্যাম্পের চিকিৎসকদের সময় মত পাইনি,ঔষধ পাইনি। চোখের সামনে প্রিয় সন্তানকে চিকিৎসার অভাবে এভাবে মরতে দেখে মা আমার কত দিন যে বেহুস ছিল তা আজ ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমার মা ভারতের শরণার্থী শিবিরে চিকিৎসার অভাবে সন্তান হারানোর বেদনা ভুলতে পারেন নি। কোন মতে প্রিয় ভাইটির জানাযা দিয়ে পাহাড়ের পাথর কেটে তারপর তার দাফনের ব্যবস্থা করি। সেই দিনের সেই স্মৃতি মনে হলে আজো শরীর কেঁপে উঠে। সেই সময়ে আমাদের কোন নেতাকে শিবিরে এসে সহযোগিতা করতে দেখিনি। আমাদের সৈয়দ আবদুল কাদি,বাচ্চু চেয়ারম্যানসহ কয়েকজন নেতা এসে দেখে চুপ করে চলে গেছে। শুধু মাত্র ডায়রিয়ায় আমাদের ক্যাম্পে প্রায় দেড়শ’র উপর লোক মারা যায় এটা আমার চোখের সামনে। চিকিৎসা সংকটের পাশাপাশি এই ক্যাম্পে আরো দুটি সংকট ছিল একটি হল খাবার সংকট আরেকটি ছিল খাবার পানির সংকট। বস্ত্র সংকটও ছিল।
অক্টোবরের শেষ দিকে এসে আমাকে এই ক্যাম্পের ইনচার্যের দায়িত্ব দেওয়া হয়।মুক্তিযুদ্ধে যেতে চেয়েছি। তখন ক্যাম্পের নেতারা বলেছে, সবাই যুদ্ধে গেলে ক্যাম্পের শরণার্থীদের দেখবে কে। এই ক্যাম্পে দেখাও যুদ্ধের একটি অংশ। যদিও বয়সে ছোট ছিলাম তারপরেও ছাত্রলীগের রাজনীতি করার কারণে কিছুটা সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা ছিল। সেই অভিজ্ঞতাই ক্যাম্পের ইনচার্য হওয়ার পর কাজে লাগিয়েছি। আমাদের বিরাশী মাইল ক্যাম্পের পাশের গ্রামটি ছিল কুমারজা গ্রাম।এই গ্রামটি মুসলিম অধ্যুষিত ছিল।
বিরাশীমাইল ক্যাম্পে থাকা অবস্থাই শুনেছি আমরা ভারত যাওয়ার ১৫/২০ দিন পর পাঞ্জাবীরা আমাদের বাড়ি দখল করে হানাদার বাহিনীর ক্যাম্প করেছিল। দেশ স্বাধীন হবার কয়েক দিন আগে তারা এই ক্যাম্প ছেড়ে চলে যায়। যাওয়ার সময় আমাদের বাড়ি ঘরে আগুন দিয়ে যায়। আগুনের লেলিহান শিখা আমাদের পুরো বাড়িটি জ্বলে আমাদের সর্বশান্ত করে যায়।
১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হয়। এই খবর আমরা ক্যাম্পে সাথে সাথে পেয়ে যাই। পাকিস্তান হানাদার বাহিনী প্রধান নিয়াজী আত্মসমর্পন করেছে এই খবর পাওয়ার সাথে সাথে ক্যাম্পে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। চারদিক থেকে বাংলাদেশের মানুষ যে যেখানে ছিল সেখান থেকেই আনন্দ উৎসব শুরু করে। আমাদের ডিসেম্বর মাসের একেবারে শেষ দিকে বাড়ি আসি। এসে দেখি বাড়ি ঘর কিছুই নেই। আমাদের আগে যারা ভারত থেকে দেশে এসেছে ইতিমধ্যে তারা নিজেদের বাড়ি ঘর মোটামোটি তৈরী করে ফেলছে। আমরা প্রতিবেশীর ঘরে দুই দিন ছিলাম। পরে আমাদের ঘর তৈরী হলে আমরা নিজ ঘরে ফিরে যাই।
আপনি ষাট দশকের একজন তুখোর ছাত্র নেতা হওয়ার পরেও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে না পারার জন্য কোন দু:খবোধ আছেন কিনা জানতে চাইলে মফিজুল ইসলাম বলেন,না কয়েকটি কারণে আমার দু:খবোধ নাই। কারণ হিসেবে তিনি বলেন,যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আমাদের ছাত্রলীগের নেতারা যে যেভাবে পাড়ছে ভারতে চলে গেছে।যোগাযোগ করার মত কাউকে পাইনি। যখন ভারত গেলাম শরণার্থী হিসেবে তখন আমি চেয়েছি, প্রশিক্ষন নিতে।কিন্তু তখন আবার নেতারা বলল,এই ক্যাম্পে আমাদের নেতৃত্ব সংকট রয়েছে। তুমি এখানে ইনচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন কর। সবাই যদি যুদ্ধ করে তাহলে শরণার্থীদের দেখবে কে।সুতরাং আমি তো পরোক্ষ ভাবে স্বাধীনতার জন্য কাজ করেছি। এখন আমি সরকারের কাছে দাবী করব,সরকার যেন আমাদের শরণার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের সহায়তাকারী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।