সোমবার ৩০ gvP© ২০২০


শরণার্থীদের খুঁজে… ১২ : শহীদ পরিবারের স্বীকৃতিটুকুও আজো পেলাম না-বাবুল সাহা


আমাদের কুমিল্লা .কম :
12.03.2020

শাহাজাদা এমরান।। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর নির্মম নির্যাতনে বাবা শহীদ হন আর মা সহ আমরা শরণার্থী হয়ে ভারতে মানবেতর জীবন যাপন করেছি।কিন্তু স্বাধীনতার এত গুলো বছর গত হলেও পেলাম না শহীদ পরিবারের স্বীকৃতি আর পেলাম না শরণার্থীর স্বীকৃতি।তিনি বলেন,তৎকালীন সময়ে কুমিল্লা শহরে যে কয়েকজন নামকরা মোক্তার ছিলেন আমার বাবা ছিলেন তাদের মধ্যে একজন। সেই বাবাকে নির্মম নির্যাতন করে অর্ধমৃত অবস্থায় ক্যান্টনমেন্ট থেকে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে রেখে যায় পাকিস্থানী সেনারা। এর ২ দিন পর বাবা কুমিল্লা কারাগারেই মারা যায়। আমি এমনই এক হতভাগ্য সন্তান যে বাবার মরদেহটা পর্যন্ত দাহ করতে পারিনি।আজো জানি না হানাদার বাহিনী আমার বাবার মরদেহটুকু কোথায় ফেলেছে। কথা গুলো বলেছেন শহীদ অনিল মোহন সাহা মোক্তারের ছেলে অর্চনা প্রসাদ সাহা যিনি কুমিল্লা শহরে বাবুল সাহা নামে পরিচিত।
শহীদ অনিল মোহন সাহা মোক্তার ও আশালতা সাহার এক ছেলে ও সাত মেয়ের মধ্যে বাবুল সাহা চতুর্থ।কুমিল্লা নগরীর নানুয়া দিঘীর পশ্চিম পাড়ে ১৯৫৪ সালের ১৯ ফেব্রæয়ারি বাবুল সাহার জন্ম। কুমিল্লা সরকারী কলেজে পড়ার সময়ই তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন ।
স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুর সময়টা তার অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে বাবুল সাহা জানান,আমরা তখন ছাত্রলীগের কর্মী ছিলাম। আমাদের নেতা ছিল মাইনুল হুদা,নাজমুল হাসান পাখি ও এড.রোস্তমসহ অন্যরা।মার্চের শুরু থেকেই সারা দেশের ন্যায় কুমিল্লাও ছিল উত্তাল।ভিক্টোরিয়া কলেজ,কুমিল্লা কলেজসহ শহরের প্রতিটি মোড়ে মোড়ে তখন স্বাধীনতার পক্ষে মিছিল মিটিং চলছে।আমরা ছাত্রলীগের কর্মীরা প্রতিটি মিছিল মিটিংয়ে অংশ নিতাম।
২৬ মার্চ সকালে বন্ধুদের সাথে কুমিল্লা নগরীর বজ্রপুর ইউছুফ হাই স্কুল মাঠে ফুটবল খেলছি। এমন সময় একটি রিক্সা চালক এসে বলল,এই তোমরা বাসায় যাও। পুলিশ লাইনে গুলাগুলি হচ্ছে।প্রথমে তার কথায় বিশ্বাস না করতে পারলেও যখন নিজ কানে গুলাগুলির আওয়াজ শুনি তখন আমরা ভয় পেয়ে গেলাম। খেলা ছেড়ে আমরা যে যার মত করে বাসায় চলে যাই।সারা শহরে শুরু হল কার্ফু।আমরা কার্ফু শিথিল হলে বের হতাম।
কবে শরণার্থী হয়ে ভারত গেলেন জানতে চাইলে বাবুল সাহা বলেন,যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই আমাদের বাসার গেইট খ্বু শক্ত করে লাগানো থাকত।১৯৭১ সালের ৭ এপ্রিল ঠিক সন্ধ্যায় ময়নামতি সেনানিবাস থেকে ৫/৬জন আর্মি সরাসরি আমাদের বাসার সামনে এসে গেইট ভাঙ্গতে শুরু করে। তখন মা মনে করছে যেহেতু আমি ছাত্রলীগ করি সেজন্য পাঞ্জাবীরা আমাকে খুঁজতে এসেছে। তাই আমাকে মা পেছনের দড়জা দিয়ে পার্শ্ববর্তী বাসায় পাঠিয়ে দেয়। পাকিস্তান আর্মি গেইট ভেঙ্গে বাসায় প্রবেশ করেই সামনে বাবাকে দেখে জানতে চায় আপনিই মোক্তার অনিল মোহন সাহা কি না। বাবা হ্যাঁ
বলতেই সাথে সাথে তারা বাবাকে গাড়িতে তুলে ময়নামতি সেনানিবাসে নিয়ে যায়। এ সময় আমার মা ও বোনেরা চিৎকার শুরু করে জানতে চায় কি অপরাধে উনাকে নিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু হানাদাররা কোন উত্তর না দিয়ে সোজা গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। এই যে বাবাকে নিয়ে গেল আর ফিরে আসেননি বাবা। পরে শুনেছি,বাবাকে সেনানিবাসে নির্মম নির্যাতন করে যখন তার অবস্থা মরণাপন্ন তখন তাকে ১৭/১৮ এপ্রিল কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেয়। কুমিল্লা কারাগারে আসার পর বাবা একটি ডাব খেতে চেয়েছিল। এর পর ২০ এপ্রিল হানাদার বাহিনীর নির্যাতনের মুখে শহীদ হয়ে যান বাবা। আমরা আজো জানি না বাবাকে কোথায় দাহ করা হয়েছে বা মরদেহটি কোথায় রেখেছে।
শরণার্থী জীবন সম্পর্কে জানতে চাইলে বাবুল সাহা বলেন, বাবাকে ধরে নিয়ে গেল ৭ এপ্রিল । আর আমি আর আমার বন্ধু মনসুর আমিন,নিউ ফার্মেসীর মালিক মনমোহন সাহার ছেলে বন্ধু রতন আর আমাদের বাসার ভাড়াটিয়ার ছেলে বন্ধু রতন আমরা এই তিন বন্ধুৃ মিলে ৮ এপ্রিল বিকালে যখন কার্ফু কিছুটা সিথিল হলো তখন ভারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। যাওয়ার সময় মাকেও বলে যেতে পারিনি। শুধু খবর দিয়ে বলেছি,মা,আমরা গেলাম। তুমি সুযোগ বুঝে বোনদের নিয়ে এসো। কুমিল্লা শহর যখন পাড় হচ্ছিলাম তখন মনে হচ্ছিল যে কোন মুহুর্তে পাঞ্জাবীদের বন্ধুকের গুলি আমাদের শরীরকে ক্ষত বিক্ষত করে দিতে পারে। ভগবানকে ডাকতে ডাকতে শহর পাড় হচ্ছিলাম। চাঁনপুর হয়ে যখন নন্দিবাজার পৌঁছলাম তখন কিছুটা সাহস পেলাম। যাক,কিছুটা ভয় কাটলো। তারপর ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বক্সনগরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। রাস্তার পরিবেশ ছিল রোহিঙ্গারা যখন মিয়ানমার থেকে আমাদের কক্সবাজারে আসছিল যেমন দেখা গিয়েছিল ঠিক তেমন বা তারচেয়েও বেশী করুণ অবস্থা ছিল। শত শত মানুষের অভিমুখ ছিল শুধু ভারতের দিকে। আমরা তিন বন্ধু এক সাথে সন্ধ্যায় গিয়ে বক্সনগরে পৌঁছলাম। পড়ে বক্সনগর থেকে আমরা তিন জন তিন দিকে চলে যাই যার যার সুবিধামত। তবে একটি কথা বলা হয়নি আর তা হলো, আমাদের দেশের সীমান্তের একেবারে শেষে আর ভারত সীমান্তের শুরুতে একটি প্রাইমারী স্কুল ছিল । সেই স্কুলে স্থানীয়রা আমাদের চিড়া ও গুর দিয়ে আপ্যায়িত করেছিল। আমি বক্সনগর গিয়েই সোনামুড়া শরণার্থী ক্যাম্পে চলে যাই। কারণ,এই ক্যাম্পের স্থানীয় দায়িত্বশীল ছিল আমার মামা যতিন্দ্র কুমার সাহা। রাতে মামার সাথে শরণার্থী শিবিরে কাটিয়ে সকালে চলে যাই উদয়পুর শরণার্থী ক্যাম্প সংলগ্ন আমার চাচাতো ভাই মুহিত লাল সাহার বাড়িতে। মুহিত দাদা সেখানকার গণপূর্ত অফিসে চাকুরী করতেন। আমি যাওয়ার ২/৩ দিন পরই মা আমার বোনদের নিয়ে এই চাচাতো ভাইয়ের বাসায় উঠেন।আমরা এখানে একেবারে কুমিল্লা মুক্তদিবস পর্যন্ত ছিলাম। আমি কখনো উদয়পুর ক্যাম্পে,কখনো ভাইয়ের বাসায় ছিলাম। সেখানে কয়েকটি বাসায় টিউশনিও করেছি। আমাদের আত্মীয় থাকাতে কষ্টের পরিমান কিছুটা কম হলেও অন্য শরণার্থীদের যে অবস্থা দেখেছি তা মনে হলে আজো চোখের পানি চলে আসে। উদয়পুর ক্যাম্পে প্রায় আমাদের আনসার আহমেদ,অধ্যক্ষ আফজল খানসহ বড় বড় নেতারা আসতেন।
কবে দেশে আসলেন জানতে চাইলে বাবুল সাহা জানালেন,আমরা ৭ ডিসেম্বরই নিশ্চিত ছিলাম ৮ তারিখে কুমিল্লা মুক্ত হবে। তাই আমাদের প্রস্তুতিও ছিল তেমন। তাই ৮ ডিসেম্বর দুপুরে আমি আর রতন চলে আসি প্রিয় কুমিল্লায়। মাসহ বোনেরা আসেন আরো কয়েকদিন পরে। এসে দেখি আমাদের বাসায় কোন লুটতরাজ না হলেও বাসার সামনে কে বা কারা দেয়াল দিয়ে রেখেছিল।
অর্চনা প্রসাদ সাহা ওরফে বাবুল সাহার শেষ মিনতি,দাদা,৭১ এর বাবাকে হারিয়েছি পাকিস্তানী জান্তাদের হাতে। আমি,মা বোনরা প্রায় ৮ মাস শরণার্থী হয়ে ভারতে ছিলাম। কত কষ্ট কত ব্যাথা বেদনা সহ্য করেছি। নানা ভাবে অসহায় শরণার্থীদেরও সেখানে সাহায্য করার চেষ্টা করেছি। সব কিছুই সহ্য করতে হয়েছে দেশের জন্য। আজ আমার প্রিয় দেশ ৪৯ বছর বয়সে পড়েছে। সরকারের কাছে শুধু একটুই চাওয়া আমার বাবা যে শহীদ হয়েছে সেই স্বীকৃতিটুকু শুধু চাই।