সোমবার ৩০ gvP© ২০২০


শরাণার্থীদের খুঁজে… ১৩ প্রিয় বাবাকে আজো খুঁজে বেড়াই-রতন সাহা


আমাদের কুমিল্লা .কম :
13.03.2020

শাহাজাদা এমরান।। আমার বাবা শহীদ মনমোহন সাহাকে পাঞ্জাবীরা ২৯ এপ্রিল আমাদের কুমিল্লা শহরের নানুয়া দিঘীর বাসা থেকে বিকাল ৪টায় ধরে নিয়ে যায়।এর পর বাবা আমার আর ফিরে আসেননি। ১৯৭১ সালের ২৯ এপ্রিল থেকে আজ ২০২০ সাল । কেটে গেল ৪৯ বছর। আজো প্রিয় বাবাকে খুঁজে বেড়াই। শুধু এতটুকু জানতে পেরেছি,পাকিস্তান হানাদার বাহিনী বাবাকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে সোজা ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টে চলে যায়। বাবা এর আগেই আমাদের সবাইকে ভারতে পাঠিয়ে দেন। বাবার ধারণা ছিল,আমি,আমার ভাই বোনেরা যেহেতু উঠতি বয়সের,তাই আমাদের পাঞ্জাবীরা টার্গেট করতে পারে। বাবাকে কিছু করবে না। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস,বাবা আমাদের শরণার্থী হিসেবে ভারতে পাঠিয়ে নিরাপদ রেখে নিজেই চলে গেলেন সারা জীবনের জন্য।
রতন সাহা।পিতা শহীদ মনমোহন সাহা এবং মাতা সুশিলা সুন্দরী সাহা। পিতা মাতার ৮ ছেলে ও ২ মেয়ের মধ্যে রতন সাহা পঞ্চম। তিনি ১৯৫৫ সালের ১ জানুয়ারি কুমিল্লা নগরীর নানুয়া দিঘীর পাড়ে জন্ম গ্রহন করেন।পিতা মনমোহন সাহার রাজগঞ্জে কুমিল্লা নিউ ফার্মেসী নামে একটি ঔষধের দোকান ছিল তখন।
রতন সাহা জানান,৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষনের পরই মুলত দেশের চেহারা বদলে যেতে থাকে। দেশে যে একটি যুদ্ধ আসতেছে একটি তখনকার পরিবেশেই বুঝা যেত। প্রতিদিনই কুমিল্লা শহরে মিছিল মিটিং চলত। সারা শহরেই থমথম অবস্থা বিরাজ করত। ২৬ মার্চ সকালে শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে অনেকের লাশ পড়ে থাকার খবর আসতে থাকে। বিভিন্ন বাসায় আক্রমনের খবর আসতে থাকে। এই খবরে আমরা আতংকিত হয়ে গেলাম। এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেল কার্ফু। তখনকার কুমিল্লা শহরের অবস্থা যে কি ভীতিকর ছিল তখন যারা কুমিল্লা শহরে ছিল একমাত্র তারাই বলতে পারবে। সারা শহর থেকে শত শত মানুষ যে যেভাবে পাড়ছে চলে যাচ্ছে। ২৬ মার্চ থেকে ২৭ মার্চ এর মধ্যে প্রায় রাজনীতিক নেতৃত্ব শূন্য হয়ে গেল কুমিল্লায়। কারো সাথে কোন যোগাযোগ নেই। এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধ তীব্র হতে লাগল। বাবা অবস্থা বেগতিক দেখে মাসহ আমাদের ভাইবোনদেরকে ভারতে পাঠিয়ে দিলেন। আমি যাই ৮ এপ্রিল। বাবার ধারণা ছিল,আমরা থাকলে পাঞ্জাবীরা আমাদের ক্ষতি করবে। যেহেতু বাবা একজন ক্ষুদ্র ঔষধ বিক্রেতা সাধারণ মানুষ, তাই পাঞ্জাবীরা তাকে কিছু করবে না। কিন্তু বাবার সরল মনের সেই সরল বিশ্বাস বাস্তবে কোন কাজে লাগল না।আমাদের শরণার্থী হিসেবে ভারতে পাঠিয়ে বাবা নিশ্চিত হলেন তার স্ত্রী,পুত্র ও কণ্যারা বেঁচে গেল। কিন্তু বাবা কি জানতেন, আমাদের জীবন বাঁচিয়ে তিনি নিজের জীবনকেই মৃত্যুর কাছে সপে দিলেন। ২৯ এপ্রিল বিকাল ঠিক ৪টার সময় নানুয়া দিঘীর পাড় আমাদের বাসার সামনে একটি আর্মির গাড়ি এসে থামে। শুনেছি,গাড়ি থেকে নেমেই হানাদারররা বাসায় ঢুকে আমার বাবাকে ধরে নিয়ে গাড়িতে উঠিয়ে সোজা ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়। এই যে নিয়ে গেল আজো আর বাবাকে ফিরে পাইনি। যে দিন বাবাকে পাঞ্জাবীরা ধরে নিয়ে যায় সেদিনই আমাদের নিউ ফার্মেসী নামের ঔষধের দোকানটি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। আমরা ভারতে বসেই টাইম টু টাইম সব খবর পেতাম। বাবারে ধরে নিয়ে যাওয়ার খবর শুনে আমার মা আমাদের সকল ভাই বোনদের এক সাথে ধরে যে ভাবে চিৎকার করছিলেন তা আজো চোখের সামনে ভেসে উঠে।
আপনি কখন শরণার্থী হয়ে ভারত গেলেন জানতে চাইলে রতন সাহা বলেন,৮ এপ্রিল দুপুরে দিকে বাবুলসাহাসহ আমরা তিন বন্ধু পালিয়ে ভারতে যাই। এর আগের দিন রাতে বাবুল সাহার বাবাকে পাঞ্জাবীরা সেনানিবাসে ধরে নিয়ে যায়। বাবুল সাহার বাবা অনিল মোহন সাহা মোক্তার চাচাকেও তারা নির্যাতন করে মেরে ফেলে। কার্ফু কিছুটা শিথিল হলে আমি,বাবুল সাহা ও আমাদের আরেকজন বন্ধু ছিল তার নামও আমার মত রতন ছিল। এই তিনজন আমরা ভারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। নানুয়া দিঘীর পাড় হতে রাজগঞ্জ দিয়ে চানপুর হয়ে গোমতী নদীটি পাড় হওয়ার সময় আমাদের জীবন যায় যায়।এই সময়ের মধ্যে কতবার যে ভগবানকে ডেকেছি ভগবানই তার হিসেব দিতে পারবে। প্রতিটি মুহুর্ত মনে হয়েছে এই বুঝি পাঞ্জাবীরা পেছন থেকে গুলি করছে,এই বুঝি কোন বোমা বা শেল এসে গায়ে পড়ছে। সন্ধ্যার দিকে আমরা সোনামুড়া যাই। এর পর আমরা পৃথক হয়ে যাই। মনোহরগঞ্জ উপজেলার নাথের পেটুয়ার যতিন্দ্র সাহার সোনামুড়া দোকান ছিল। সেই দোকানে আমি রাত কাটাই। পরদিন সকালে আগড়তলা চলে যাই আমাদের আত্মীয়ের বাড়িতে। এখানে কিছু দিন থেকে চলে যাই কলকাতা আমাদের নিকট আত্মীয়ের বাড়িতে যেখানে আগে থেকেই আমার মা ও ভাই বোনের অবস্থান করেছিল। কলকাতা আমরা যেই আত্মীয়ের বাড়িতে ছিলাম তার নাম ছিল কৃঞ্চ সাহা। এই কৃঞ্চ সাহার কুমিল্লার বাড়ি ছিল রাজগঞ্জ রূপকথা সিনেমা হলের সামনে। আমি দেশে আসার আগ পর্যন্ত এখানেই ছিলাম। আমার কাজ ছিল প্রতিদিন কৃঞ্চ সাহার সন্তানদের স্কুলে আনা নেওয়া করা। আমার এই আত্মীয়ের বাসার পাশেই ছিল একটি শরণার্থী শিবির। দিনের বেলা শরণার্থী শিবিরে থাকতাম। বিভিন্ন কাজে সহায়তা করতাম মুক্তিযদ্ধের সংগঠকদের। এলাকায় কিছু টিউশনীও করতাম। যেহেতু আমাদের আত্মীয় ছিল সেজন্য আমাদের থাকা এবং খাওয়ার কোন সমস্যা ছিল না। কিন্তু যারা শরণার্থী শিবিরে ছিল তাদের সীমাহীন কষ্ট গুলো খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। অসংখ্য শিশুর মৃত্যুও প্রত্যক্ষ করেছি। শিবির গুলো সবচেয়ে বেশী আক্রান্ত ছিল ডায়রিয়া,আমাশা ও ম্যালেরিয়ায়। যারা শরণার্থী শিবিরে ছিল তারাই একমাত্র বলতে পারবে শরণার্থীদের বেদনার গল্পগুলো।
কবে দেশে এলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, কুমিল্লা মুক্ত দিবসের দিন অর্থাৎ ৮ ডিসেম্বর দুপুরেই আমরা দেশে চলে আসি। এসে দেখি,আমাদের বাসার সমস্ত মালামাল লুট করে নিয়ে গেছে। শুধু বাসাটা ছাড়া আর কিছুই নেই। রাজগঞ্জের ঔধদের দোকানেরও একই অবস্থা। বাবা বিহীন স্বাধীন দেশে আবার শূন্য থেকে শুরু করি।এখন আমরা নিজেরাই বৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছি। সরকারের কাছে আমার একটাই চাওয়া,এই দেশের জন্য বাবাকে হারিয়েছি,বাসা বাড়ি লুট হয়েছে, দোকানঘর লুট হয়েছে কখনো কারো কাছে কিছু চাইনি। স্বাধীনতার ৪৯ বছর পর আপনিই একমাত্র সাংবাদিক যিনি আমাদের কথা গুলো বলার সুযোগ করে দিলেন। গত ৪৯ বছরের মধ্যে এ বিষয়ে আজ পর্যন্ত আমাদের কাছে কেউ আসেনি,খোঁজও নেয়নি কেউ। সরকারের কাছে আমার একটিই মিনতি,বাবা যে দেশের জন্য শহীদ হলেন আমরা যে শহীদ পরিবার এতটুকু স্বীকৃতি যেন সরকার আমাদের দেন।