মঙ্গল্বার ২৬ †g ২০২০


শরণার্থীদের খুঁজে… ১৪ : পাঞ্জাবী ও টুপি পড়ে গোমতী নদী পাড় হই-যাদব কুমার বনিক


আমাদের কুমিল্লা .কম :
14.03.2020

শাহাজাদা এমরান।। শরণার্থী হয়ে ভারত যাওয়ার সময় আমাদের জন্য সবচেয়ে কঠিন ছিল গোমতী নদী পাড় হওয়া। কারণ,গোমতীর খেয়া ঘাটে পাঞ্জাবীদের নজরধারী ছিল কঠোর। আজম খান জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম খান দুলাল ভাই যখন আমাদের গোমতী পাড় নিয়ে যায় তখন সেখানে গিয়ে দেখি আরো অসংখ্য পরিবার রয়েছে যারা গোমতী নদী পাড়ের অপেক্ষায় বিভিন্ন জায়গায় লুকিয়ে রয়েছে। সবাই অপেক্ষায় রয়েছে,কখন পাঞ্জাবীরা এই এলাকা থেকে চলে যাবে আর তারা গোমতী নদী পাড় হবে। হিন্দু মোসলমান অনেক পরিবারই এখানে আমরা একত্রিত হলাম। আশে পাশের বাড়ির লোকেরা তাদের পরিবারের সদস্যদের গায়ের পাঞ্জাবী ও টুপি দিয়ে আমাদের বলেছ তোমরা এগুলো পড়। যদি কোন কারণে পাঞ্জাবীরা দেখে ফেলে যাতে তারা বুঝতে পারে তোমরা মুসলমান। এই এলাকারই মানুষ।পড়ে এভাবেই বাবা মা ভাই বোনদের নিয়ে পাঞ্জাবী ও টুপি পড়ে গোমতীর খেয়া পাড় হয়ে শরণার্থী জীবন নিয়ে ভারতে যাই। কথা গুলো বললেন কুমিল্লা নগরীর প্রখ্যাত জুয়েলার্স ব্যবসায়ী আলহাজ্ব আজম খান সাহেবের ঘনিষ্ট বন্ধু গিরিশ চন্দ্র বনিকের ছেলে যাদব কুমার বনিক।
যাদব কুমার বনিক। পিতা গিরিশ চন্দ্র বনিক ও মাতা রেনু প্রভা বনিক।১৯৬০ সালের ১ জানুয়ারি তিনি কুমিল্লা নগরীর পুরাতন চৌধুরীপাড়া এলাকায় জন্ম গ্রহন করেন। পিতা মাতার ৩ ছেলে আর ১ মেয়ের মধ্যে তিনি সবার বড়।
স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ের ঘটনাবলি বলতে গিয়ে তৎকালীন সময়ে গিরিদারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের (বর্তমানে মনোহরপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়) চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র যাদব কুমার বনিক জানান, আমার বাবার ঘনিষ্ট বন্ধু ছিলেন আজম খান জুয়েলার্সের মালিক আজম খান সাহেব। তারা এক সাথে ব্যবসায় করত। বাবা সোনার জহুরী ছিলেন। সে হিসেবে বাবাকে সবাই পছন্দ করতেন। মার্চের শুরুতে যখন দেশে আন্দোলন সংগ্রাম শুরু হল তখনই অনেকে বাবাকে ভারত যাওয়ার পরামর্শ দিতে লাগলেন। বাবা বলতেন,আমি দেশ ছাড়ব কেন। আমি তো কোন রাজনীতি করি না। এ দেশ এ মাটি আমার। আমি কোনভাবেই দেশ ছাড়ব না। কিন্তু ২৫ মার্চের পর সব কিছু নিয়ন্ত্রনের বাহিরে চলে গেল।বিশেষ করে আমরা যারা হিন্দু ছিলাম আমাদের জন্য আরো কঠিন হয়ে গেল কুমিল্লা থাকার। এক পর্যায়ে পাবনের জাহাঙ্গীর আলম ভাই এর সাথে বাবা আলাপ করলেন। পরে ২ এপ্রিল ভোর রাত সাড়ে ৫ টায় আমরা কয়েকটি পরিবারের ২২ জন সদস্য কে নিয়ে জাহাঙ্গীর ভাইসহ তারা কয়েকজন আমাদের গোলাবাড়ি সীমান্ত পর্যন্ত নিয়ে যান। গোমতী নদী সংলগ্ন গোলাবাড়ি সীমান্তবর্তী এলাকায় আমাদের রেখে জাহাঙ্গীর আলম খান ভাইরা চলে যান। ঐখানে গিয়ে দেখি আরো কয়েকশত শরণার্থী গোমতী পাড় হওয়ার অপেক্ষায় বিচ্ছিন্ন ভাবে ঘোরাফেরা করছে। গোলাবাড়ি এলাকাটি হল আদর্শ সদর উপজেলার জগন্নাথ পুর ইউনিয়নে। এই এলাকার নুরু মেম্বার ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের এক প্রভাবশালী ব্যক্তি। তিনি আমাদের ভারতে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা শরণার্থীদের সবাইকে দুপুরে যতটুকু সম্ভব হয়েছে আপ্যায়ন করেছেন। তিনি গ্রামের বিভিন্ন জনের পাঞ্জাবী,টুপি এনে আমাদের দিয়েছেন যাতে এগুলো পড়ে আমরা বিচ্ছিন্ন ভাবে হাটাহাটি করি। পাঞ্জাবীরা যাতে বুঝতে না পারে আমরা হিন্দু।পড়ে পাঞ্জাবীদের একটি টহল দল যখন চলে গেল আরেকটি টহল দল আসার আগে নুরু মেম্বার এক সাথে চারটি নৌকা দিয়ে কয়েকবার আপ ডাউনের মাধ্যমে আমাদের ওপারে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। প্রথমে আমরা মহিলা ও শিশুদের পাড় করি পরে আমরা পাড় হই। গোমতী নদী পাড় হয়ে আমরা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সোনামুড়ার ঠাকুরমুড়ায় যাই বিকাল ৪টায়। সেখানে পৌঁছেই দেখি জলপাই কালারের পোষাক পরিহিত বিএসএফ সদস্যদের বন্ধুক হাতে। প্রথমে তাদের আগ্রাসী মনোভাব দেখে আমরা ভয় পেয়ে যাই। পরে তারা আমাদের গন্তব্যস্থানে পৌঁছে দিতে সার্বিক সহযোগিতা করেছিল। আমরা ঠাকুরমুড়ায় মাসি অঞ্জনী বনিকদের বাড়িতে আশ্রয় নেই। পরদিন ৩ এপ্রিল সকালে আমার মামা বিবি বনিক এসে অঞ্জনি মাসির বাড়ি থেকে আমাদের নিয়ে যান আগড়তলা শহরের বনমালিপুরে মামাদের বাড়িতে।কয়েক দিন মামার বাড়ি থেকে আমরা নিমবাক ক্যাম্পে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেই। নিমবাক ক্যাম্পের তখন দায়িত্বে ছিলেন ব্রাক্ষèনবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলার গঙ্গা সাগড় এলাকার এক হিন্দু ভদ্র লোক। এই মুহুর্তে তার নাম বলতে পারছি না।
শরণার্থী শিবির সম্পর্কে জানতে চাইলে যাদব কুমার বনিক বলেন,আমাদের নিমবাক ক্যাম্পে প্রায় ৩৫ হাজার শরণার্থী ছিল। যেহেতু শরণার্থী ক্যাম্প আর মামার বাড়ি প্রায় কাছাকাছি ছিল তাই খাওয়া দাওয়া নিয়ে আমাদের পরিবারের খুব একটা কষ্ট হয়নি সত্য কিন্তু শিবিরের অন্য হাজার হাজার মানুষের কষ্ট ছিল সীমাহীন। বিশেষ করে শিশুদের যে গুড়া দুধ দিয়েছিল সেই গুড়া দুধ খেয়েই শত শত শিশু ডায়রিয়ায় মারা গিয়েছিল। ম্যালেরিয়ায়ও মারা গিয়েছিল অনেক মানুষ। সু চিকিৎসার অভাবে কাছ থেকে কত মানুষের যে মৃত্যু দেখেছি তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। গাড়িতে করে পাউডারের দুধ এনে শিবিরে দিত।এগুলো মান সম্পন্ন কি না তা দেখার কেউ ছিল না। বিশুদ্ধ পানির ছিল তীব্র অভাব। অসহায় বাবা মা যেই পানি সামনে পেয়েছে তা দিয়ে গুলেই শিশুকে খাওয়াচ্ছে। আর ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে দিনের পর দিন মৃত্যুর মিছিল বাড়ছে।
আমাদের নিমবাক ক্যাম্পের পাশেই ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প।এই প্রশিক্ষন ক্যাম্পের ভারতীয় সেনা সদস্যদের একটি ভাল কাজ আমার আজীবন মনে থাকবে। এই কাজটি হলো আমাদের শরণার্থী ক্যাম্প আর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প এর সাথে একটি হ্রদ ছিল। সেখানেই আমরা গোছল করতাম। আমাদের শিবিরের মহিলারা যখন গোছল করতে আসত তখন ভারতীয় সেনারা সারিবদ্ধ ভাবে পাহারা দিত যাতে কোন পুরুষ এখানে এসে মহিলাদের বিব্রত করতে না পারে। আমাদের নিমবাক ক্যাম্পে এসে প্রায়ই খোঁজ খবর নিতেন,কুমিল্লার কৃতি সন্তান, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের রূপকার ও বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম ও শহীদ সাইফুল ইসলাম ।
কবে দেশে আসলেন জানতে চাইলেন তিনি বলেন,১৯৭২ সালের ২ বা ৩ জানুয়ারি বিবির বাজার সীমান্ত দিয়ে আমরা কুমিল্লা আসি। বাড়ি গিয়ে দেখি আমাদের ঘর বাড়ি কিছুই নেই। সব লুট হয়ে গেছে। তখন প্রশাসন আমাদের ঈশ্¦রপাঠশালায় থাকার ব্যবস্থা করে দেয়। পরে বাবা ঘর বাড়ি ঠিক করলে আমরা আমাদের বাড়িতে উঠি।
যাদব কুমার বনিক বলেন,শুধু আমরা না , ১৯৭১ সালে নিজের ঘর বাড়ি ফেলে যারা জীবন বাঁচাতে শরণার্থী হয়ে ভারত গিয়েছিল সরকারের উচিত সবাইকে মুক্তিযুদ্ধের সহায়তাকারী হিসেবে স্বীকৃতি করা। আমাদের বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী সরকার সেই মহত কাজটি করবে বলে আশা করি।