মঙ্গল্বার ২ জুন ২০২০


শরণার্থীদের খুঁজে… ১৬ : মাইগো একটা দানা অইলেও মুখে দিয়ে যা – দিলিপ কুমার পাল


আমাদের কুমিল্লা .কম :
16.03.2020

শাহাজাদা এমরান।। শরণার্থী জীবনের কথা বলতে গিয়ে আবেগ সংবরণ করতে না পেরে কেঁদে ফেলেন কুমিল্লার প্রবীণ আইনজীবী দিলিপ কুমার পাল । যিনি ভুতু দা নামে শহর কুমিল্লায় ব্যাপক পরিচিত। তিনি বলেছেন,কুমিল্লা শহর যখন আমাদের বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়ে গেল, তখন আমরা চলে গেলাম মামার বাড়ি মুরাদনগরে। সেখানেও যখন এক পর্যায়ে আমাদের জীবন অনিরাপদ হয়ে উঠল, তখন বাধ্য হয়ে ভারতে শরণার্থী জীবন বেছে নিলাম। যাওয়ার সময় কসবা সীমান্তের শেষ ভাগে যখন এলাম তখন দেখলাম,একজন ভিক্ষুক মহিলা রাস্তার পাশে তার একটি ধানের খড় দিয়ে তৈরী ডেরা আছে। ডেড়ার কাছে মাটির চুলা দিয়ে ছোট একটি পাতিলে সবে মাত্র ভাত বসিয়েছে। গায়ের কাপড় ছেড়া।আরেকটি পাত্রে কয়েকটা গোল আলু। আলু সিদ্ধ করে ভাত খাবে। তখন এই রাস্তা দিয়ে হাজার হাজার মানুষের ভারত যাওয়ার স্্েরাত। চলন্ত মানুষের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে সেই ভিখারী মহিলা ভাতের পাতিল দেখিয়ে সবাইকে আহবান করছে, ‘মাইগো একটা দানা অইলেও মুখে দিয়ে যা,দেশের জন্য কষ্ট করতেছ,তোমাগ পেটে ক্ষুধা আছে মাইগ’-ভিক্ষুক মহিলার এই আহবানে অনেকেই মহিলাকে মাথায় হাত ভুলিয়ে বলছে আপনি খান,আমাদের জন্য শুধু দোয়া করবেন।আবার অনেকেই যে যার মত করে হেঁটে চলে যাচ্ছে।একজন ভিক্ষুক মহিলার মধ্যে দেশের জন্য এতবড় ত্যাগ দেখে আমার চোখে কান্না চলে এল।স্বাধীনতার ৪৯ বছর গত হলেও এখনো এই মহিলার ‘মাইগো একটা দানা অইলেও মুখে দিয়ে যা’ ডাকটি আমি ভুলতে পারিনি। এ কথা বলেই কেঁদে ফেলেন শরণার্থী এড.দিলিপ কুমার পাল ওরফে ভুতু দা।
কুমিল্লা শহরের বাদুরতলার প্রখ্যাত প্রতিষ্ঠান কুমিল্লা কমার্সিয়াল ইন্সিটিটিউট এর প্রতিষ্ঠাতা অমর চন্দ্র পাল ও আশা লতা পালের ৩ ছেলে ও ৪ মেয়ের মধ্যে সবার বড় ভুতু দা। ১৯৪১ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি কুমিল্লা নগরীর বাদুরতলাস্থ নিজ বাড়িতে জন্ম গ্রহন করেন।
কেন শরণার্থী জীবনে চলে গেলেন জানতে চাইলে ভুতু দা বলেন,১৯৭১ সালের মার্চের ২৫ তারিখ বিকাল থেকে বিভিন্ন গ্রæপে ভাগ হয়ে শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে নেতাদের পরামর্শে আমরা পাহারা দেওয়া শুরু করলাম হাতে লাঠি নিয়ে। যাতে সেনানিবাস থেকে পাঞ্জাবীরা শহরে প্রবেশ করতে না পেরে। সন্ধার পর বাসায় চলে গেলাম। রাতে পুলিশ লাইনসহ শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে প্রচুর গোলাগুলির আওয়াজ শুনতে পেলাম। স্বাভাবিক ভাবেই ভয় পেয়ে গেলাম। পরদিন ২৬ মার্চ সকাল ১০ কি ১১টার দিকে বাসা থেকে বের হয়ে সিংহ প্রেসের দিকে আসতেই দেখি অজ্ঞাত এক যুবকের গুলিবিদ্ধ লাশ পড়ে আছে। একই সময় জানতে পেলাম কান্দিরপাড় আরো তিন জনের লাশ পড়ে আছে,রাজগঞ্জেও আছে। এতে ভয় পেয়ে সাথে সাথে বাসায় চলে আসি। ঐদিন রাতেই আমাদের বাসায় আসেন এম এইচ চৌধুরী,ডা.সুলতান আহমেদ,উকিল ইসমাইল,আলী আহমেদ ও ফরিদ উদ্দিন চাচারা।উনদের সাথে আমাদের পরিবারের অনেক সখ্যতা।উনারা বাবার সাথে আলাপ আলোচনা করলেন। আমার ছোট ভাই রঞ্জিত ঢাকায় ছাত্রলীগের বড় নেতা ছিলেন। পাঞ্জাবীদের কাছে এই খবরও আছে। মুরুব্বীরা আমাদের ভাই বোনদেরকে বাসায় থাকা নিরাপদ মনে করলেন না। তাই আমিসহ আমাদের তিন বোন গেলাম উকিল ইসমাইল চাচার বাসায়, প্রদীপ কুমার পাল বাবলু গেলেন আলী আহমেদ চাচার বাসায় আর রঞ্জিত ভোচন গেল এম এইচ চৌধুরী চাচার বাসায়। আমাদের পাড়ার এই তিন পরিবারের কাছে আমরা ভাই বোনেরা কয়েক দিন আত্মগোপনে ছিলাম। পড়ে দেশের পরিস্থিতি ক্রমে আরো খারাপের দিকে চলে যাওয়ায় এবং শহরের রাজাকাররা টের পেয়ে যাওয়ায় আবার ঐ মুরুব্বীরা বাবাকে এসে বললেন, তাদের আর কুমিল্লা রাখা যাবে না। অন্য কোথায়ও পাঠিয়ে দিন। পরে সিদ্ধান্ত হল মুরাদনগর উপজেলার ব্রাক্ষèন চাপিতলা আমরা মামার বাড়ি যাব। আমার মামা নঘেন্দ্র চন্দ্র পাল ছিলেন জমিদার। এলাকায় মামার বিশাল প্রভাবও ছিল। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে একদিন ভোরে আমরা ভাই বোন ও অন্যান্য স্বজন মিলে প্রায় ৪০/৪৫ জনের একটি দল ভোরের অন্ধকার থাকতে থাকতে বানাশুয়া দিয়ে গোমতী নদী হয়ে বুড়িচং ব্রা²ন পাড়া হয়ে বিকালের দিকে মুরাদনগর মামার বাড়ি যাই। গোমতী নদীর পাড়ে প্রফেসর মফিজুল ইসলামের সাথে আমাদের দেখা হলে তিনিও আমাদের কিছু নির্দেশনা দেন। এরমধ্যে আবার যখন জাফরগঞ্জ বাজারে আসি তখন সেখানকার স্থানীয় জনগন আমাদের সামনের দিকে যেতে নিষেধ করে বলে, সামনে একজন পাকিস্তান আর্মিকে মেরে ফেলা হয়েছে। এই দিক দিয়ে যাবেন না। পরে আমরা এখানে আরো কিছুক্ষন অপেক্ষা করে জমির আইল দিয়ে বিকল্প রাস্তায় মামার বাড়ি যাই। মামার বাড়িতে প্রায় ১৫ দিন থাকার পর লক্ষ করলাম মুরাদনগরের পরিস্থিতিও খারাপ হতে লাগল। তাই মে মাসের প্রথম সপ্তাহে মামা ইউপি চেয়ারম্যান করিম সাহেব আর মেম্বার তুজু সাহেবকে ডেকে বললেন যে, আজ রাতে আমার ভাগিনা ভাগিনীদের ভারত সীমান্তে নিরাপদে পৌঁছে দিতে হবে তোমাদের। এর মধ্যে আমরা ২ ভাই ও তিন বোনসহ প্রায় ১০/১২ জনের একটি গ্রæপ রাত ১২টায় মামার বাড়ি থেকে রওয়ানা হই। আহ! সে যে কি কষ্ট ছিল তা যারা শরণার্থী ছিল তারাই বলতে পারবে। মুল রাস্তা দিয়ে তো যাওয়া সম্ভব ছিল না। তাই গ্রামীন অজো পাড়া গায়ের আকাঁবাকা মেঠোপথ পাড়ি দিয়ে কোম্পানীগঞ্জ ব্রাক্ষনবাড়িয়া হয়ে পর দিন বিকালে আমরা ভারতের কোনাবনে গিয়ে পোঁছি। যখন আমরা ব্রাক্ষনবাড়িয়া এলাকায় প্রবেশ করি তখন ফজরের নামাজ শেষ।রাস্তায় তখন শত শত মানুষের ¯্রােত। ঢাকা নারায়নগঞ্জের শরণার্থীরাও এই রাস্তা ব্যবহার করছে। সবাই কোনাবনের উদ্দেশ্যে যাত্রা। রাস্তার পাশের একটি মসজিদ থেকে কমিটির লোকেরা শরণার্থীদের ডেকে ডেকে চিড়া ,মুড়ি গুড় ও জল দিয়ে বলছে এই শুকনা খাবার গুলো সাথে নিয়ে যান রাস্তায় খেয়ে নিবেন। তখন আমাদের কাছে খাওয়ারও কিছু ছিল না।দেখলাম মানুষ হাটছে আর চিড়া মুড়ি গুড় খাচ্ছে। ভারত সীমান্তের যখন কিছুটা কাছাকাছি এলাম তখন প্রায় ৩টা বাজবে। এমন সময় দেখলাম রাস্তার পাশে এক ভিক্ষুক ভাত রান্না করছে আর আমাদের একটু খেয়ে যাবার জন্য অনুরোধ করছে। এই ভিক্ষুকের এই মমতা আমার আজীবন মনে থাকবে।যার কথা উপরে বলেছি।
আমাদের ভাগ্য ভাল বলতেই হবে। আমরা যখন ভারতের কোনাবন সীমান্তে প্রবেশ করলাম, তখন দেখলাম আমাদের এক খালাতো ভাই ট্রাক নিয়ে বসে আছে। তিনি আগড়তলা থেকে মাল নিয়ে কোনাবনে এসেছিলেন। আমরা তো তাকে পেয়ে আকাশের চাঁদ হাতে পেলাম। এখান থেকে আমরা মামাতো বোন কানন বালার স্বামী ইঞ্জিনিয়ার মনোরঞ্জন রায়ের বাড়িতে যাই। এখানে আমরা প্রায় এক মাস ছিলাম। আগে থেকেই আমার বড় দিদি শোভা রানী পাল দু:খ ভারতে ছিলেন। আমরা আসছি শুনে দিদি আমার তিন বোনকে তার কাছে আসামের শিলচড়ে স্বামী পরেশ চন্দ্র পালের বাড়িতে নিয়ে যান। আমি জুন মাসে আগড়তলা রেডক্রসে চাকুরী পেয়ে যাই। আমাদের টীমের দায়িত্ব ছিল আগড়তলায় অবস্থিত বাংলাদেশের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে শিশুদের গুড়া দুধসহ নানা শিশু খাদ্য সরবরাহ করা। এই চাকুরীটি পাওয়ায় আমি খুব খুশি হলাম। একদিকে দেশের মানুষের সেবা করতে পারব অন্য দিকে চাকুরীর টাকা দিয়ে এখানে নিজে চলতে পারব। তখন আগড়তলা সেক্টর ৪ এর ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন পিএল শর্মা,রেডক্রিসেন্টের সুপারিটেন্ট ছিলেন ড. রতীন্দ্র দত্ত আর ইনচার্জ ছিলেন গোস্ট দত্ত¡। আর আমার সাথে ছিলেন চট্রগ্রামের সন্তোষ দাশ। অফিস ছিল রানীর বাংলো টিলার উপর। স্থানীয় হাপানিয়া ক্যাম্পে বড় বড় স্ট্যোভ ছিল। আমরা গুড়া দুধ গুলে দুই জাল দিয়ে শিবিরে শিবিরে পাঠাতাম। আমি দৈনিক মজুরী পেতাম ১০ রুপি।
কবে দেশে এলেন জানতে চাইলে এড.দিলিপ কুমার পাল ওরফে ভুতু দা জানান, কুমিল্লা শহরের নুনাবাদ কলোনীতে চাকুরী করত পাকিস্থানী নাগরিক অহেদ আলী খান। পাকিস্থানী নাগরিক হলেও সে ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি। এটা তখন কুমিল্লার সবাই জানত।১৭ ডিসেম্বর সে গাড়ি নিয়ে কি কাজে আগড়তলা গেল। আসার পথে আমার সাথে দেখা। তাকে দেখেই আমি গাড়িতে উঠে সোজা কুমিল্লায় চলে আসি।
আপনার বাবা মা কিংবা বাড়িতে কোন ক্ষতি হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, না। আমরা চলে যাওয়ার পর পাঞ্জাবীরা আর বাবা মাকে ডিসর্টাব করেনি। বিশেষ করে পাকিস্তানী আর্মি অফিসার বোখারীর ঘনিষ্ট সহচর ছিল ক্যাপ্টেন জামান। এই ক্যাপ্টেন জামান সব সময় বাবার সাথে যোগাযোগ করে আমাদের সার্বিক সহযোগিতা করেছিল।
আপনার কোন চাওয়া পাওয়া আছে কিনা জানতে চাইলে এড.দিলিপ কুমার বলেন, আমি যে ভারতে ক্যাম্পে ক্যাম্পে ঘুরে শত শত শিশুদের দুধ খাওয়ালাম এটাও তো একটা মুক্তিযুদ্ধের কাজের অংশ। আমি চাই সরকার যেন শরণার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের সহায়তাকারী হিসেবে ঘোষনা করে।