মঙ্গল্বার ২ জুন ২০২০
  • প্রচ্ছদ » জেলা উপজেলার খবর » শরণার্থীদের খুঁজে… ১৭ : মুসল্লিরা জল না দিলে অনেকে ক্ষুধার চোটে মারা যেতেন — প্রদীপ কুমার পাল বাবুল


শরণার্থীদের খুঁজে… ১৭ : মুসল্লিরা জল না দিলে অনেকে ক্ষুধার চোটে মারা যেতেন — প্রদীপ কুমার পাল বাবুল


আমাদের কুমিল্লা .কম :
17.03.2020

শাহাজাদা এমরান।।  সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ করিনি এটা যেমন সত্য আবার এটাও অনেক বড় সত্য যে, দেশ স্বাধীন করার জন্য যে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল সেই মুক্তিযুদ্ধে আমরা যারা শরণার্থী হয়ে ভারতে ছিলাম আমাদের অবদানও কম নয়। তিনি বলেন,ভারতের প্রায় প্রতিটি শরণার্থী শিবিরের অফিসে একজন টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ করেছি।খেয়ে না খেয়ে সামান্য মাইনে নিয়ে পরিশ্রম করেছি। ভাল বেতন পাওয়া সত্তে¡ও দেশের স্বার্থে কুমিল্লা সেনানিবাসের টেকনিশিয়ানের চাকুরীটা ছেড়ে দিয়েছি। পরবর্তীতে শরণার্থী হয়ে ভারতে গিয়ে শরণার্থী ক্যাম্পের অফিসে অফিসে প্রয়োজনীয় কাজ করেছি। এটা কি অবদান নয়, এটা কি কোন কাজ নয়। কথা গুলো বলেছিলেন কুমিল্লা নগরীর বাদুরতলাস্থ কমার্সিয়াল ইন্সিটিটিউট এর প্রতিষ্ঠাতা অমর চন্দ্র পাল ও আশালতা পালের পুত্র চিরকুমার প্রদীপ কুমার পাল বাবলু। ১৯৪৫ সালের ৩ আগস্ট তিনি কুমিল্লা শহরের বাদুরতলায় জন্ম গ্রহন করেন। ৩ ভাই ও চার বোনের মধ্যে তিনি চতুর্থ।
মুক্তিযুদ্ধ ও শরণার্থী বিষয় সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রদীপ কুমার পাল বাবলু বলেন,আমি ১৯৬৬ সাল থেকে কুমিল্লা সেনানিবাসে একজন টেকনিশিয়ান হিসেবে চাকুরী করি। এতে কুমিল্লা সেনানিবাসের আর্মির বড় বড় অফিসারদের সাথে আমার সুসম্পর্ক গড়ে উঠে। দীর্ঘ দিন ধরে সেনানিবাসে কাজ করার সুবাধে আমার মধ্যে সব সময় মনে হতো যে, পাকিস্তান আর্মিরা কখনো বাঙ্গালীদের মনে প্রানে মেনে নিতে পারছে না। বাঙ্গালীরাও যে পাকিস্তানের নাগরিক এটা ভাবতে তাদের খুব কষ্ট হতো। তারা মনে করতো,পাকিস্তান অর্ডার করবে আর পূর্ব পাকিস্তান সাথে সাথে তা তালিম করবে।এগুলো সব সময় আমাকে পীড়া দিত। বাসায় এসে এ কথাগুলো বাবাকে বলতাম। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষনের পর থেকে হঠাৎ করে কুমিল্লা সেনানিবাসের সার্বিক পরিস্থিতি বদলে যায়। প্রায়ই বড় বড় ট্রাকে করে কি যেন ভিতরে ঢুকত। পড়ে মাল খালাস করে ট্রাক গুলো আবার বের হয়ে আসত। ইতিমধ্যে আমি লক্ষ করলাম,তারা খুব শিগগিরই বড় একটা কিছু করতে চাইতেছে যার প্রস্তুতি তারা গ্রহন করতেছে। আমি নিজেই অনুমান করলাম, এখন আর তারা আমাকে বিশ্বাস করে না।আমি হয়তো টাইপ করছি। এমন সময় একজন অফিসার এলো তখন তাদের একজন জানাল তুমি একটু বাহিরে যাও। মার্চের ১৫ তারিখের পর লক্ষ করলাম প্রকাশ্যই তারা সেনানিবাসের ভিতর যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এতে আমি ভয় পেয়ে যাই। সর্বশেষ আমি সেনানিবাসে অফিস করি ২০ মার্চ। এরপর চাকুরী ছেড়ে দেই। আর যাইনি। চাকুরী ছাড়ার সময় আমি ৫৭ ব্রিগেডের হেড কোয়ার্টারে দায়িত্ব পালন করেছি।
২৩ মার্চ থেকে আমিসহ আমাদের ১০জনকে স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতারা দায়িত্ব দিলেন আমরা যেন বর্তমান কুসিকের ১০ নম্বর ওয়ার্ডে পাহারা দেই। যাতে হানাদার বাহিনী এ দিকে না আসতে পারে। এ জন্য আমাদের সবাইকে দেওয়া হলো গজারি লাঠি। ২৫ মার্চ বিকেল থেকে শহরের অবস্থা দ্রæত পাল্টাতে থাকে। সন্ধ্যার পর থেকেই থেমে থেমে গুলির আওয়াজ আসছে। ভয় পেয়ে বাসায় চলে যাই। রাত ১২টার পর চলে গোটা শহরে হত্যাযজ্ঞ। ২৬ মার্চ সকালে বাসা থেকে বের হয়ে দেখি সিংহ প্রেসের দিকে এক যুবকের লাশ পড়ে আছে। শহরে লোকজন একেবারেই কম। প্রয়োজন ছাড়া কেউ বের হচেছ না।সবার মধ্যেই এক আতংক বিরাজ করছে। মা বাবা আমাদের দ্রæত বাসায় চলে আসতে বললেন। আমরা ভাইয়েরা বাসায় এলে মা ঘরের দড়জা বন্ধ করে দেন। পরে রাতে আমাদের পাড়ার মুরুব্বীরা এম এইচ চৌধুরী,উকিল ইসমাইল,ডা.সুলতান আহমেদ,ফরিদ উদ্দিনসহ আরো কয়েকজন আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে বাবা মার সাথে কথা বলে আমাদের ভাই বোনদের তিন চাচা ভাগ করে তাদের বাসায় নিয়ে যান। এভাবে কয়েকদিন থাকার পর তাদের পরামর্শেই আমরা মুরাদনগর আমাদের মামার বাড়ি চলে যাই। আমার তিন বোনই ছিল কিশোরী।সাথে ছিল আমাদের অনেক আত্মীয় স্বজন। ফলে কুমিল্লা শহর পার হয়ে গোমতী নদী পাড় হতে আমাদের অনেক কষ্ট করতে হয়। না জানি পাঞ্জাবীরা দেখে ফেলে। কেউ নি আবার পেছন দিয়ে গুলি ছুঁড়ে দেয়। রাস্তায় যে কিছু খাব সেই অবস্থাও ছিল না। ক্লান্ত শ্রান্ত শরীর নিয়ে মুরাদনগরের ব্রাক্ষন চাপিতলা গ্রামে মামার বাড়িতে গিয়ে পৌঁছি প্রায় সন্ধ্যায়। আমার মামা ঘনেন্দ্র ছিলেন জমিদার। আমাদের আগমনের খবর পেয়েই তারা রান্না করে রাখেন। সারা দিন অনাহারে ছিলাম।তাই ¯œান করে খাবার খেয়েই আমরা ঘুমিয়ে যাই।
ভারতে কবে গেলেন জানতে চাইলে প্রদীপ কুমার পাল বাবলু বলেন,আসলে বিপদ আমাদের পিছু ছাড়ে নি। যে ভয়ে কুমিল্লা শহর ছেড়ে আসলাম একই ভয় পেয়ে বসল মামার বাড়িতেও। কুমিল্লা থেকে আমরা মামার বাড়িতে আছি এ খবর পেয়ে যায় স্থানীয় রাজাকাররা। মামা স্থানীয় প্রভাবশালী হওয়ায় মামাকে কিছু না বললেও আমাদের নিয়ে শুরু হলো গ্রামে নানা কানাঘুষা। তাই মামার নিজের বিপদ যাতে না আসে সে জন্য তিনি আমাদের ভারতে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দিলেন। একদিন রাতে স্থানীয় চেয়ারম্যান মেম্বারকে ডেকে তাদের দায়িত্ব দিলেন আমাদের যেন রাতের মধ্যে মুরাদনগর সীমান্ত পাড় করে ভারত সীমান্তের কাছাকাছি পৌঁছে দিয়ে আসেন। পাঞ্জাবীদের ভয়ে কোম্পানীগঞ্জ ব্রাক্ষনবাড়িয়ার সিএন্ডবি সড়ক ব্যবহার না করে আবাদী জমি দিয়ে আমরা হাঁটতে শুরু করলাম। হাঁটছি তো হাঁটছি। রাস্তা যেন কোন ভাবেই শেষ হয়না। ক্ষেতের আইল দিয়ে হাটতে গিয়ে কতবার যে আমি ও আমার বোনেরা পড়ে গিয়ে ব্যাথা পাইছি সেই হিসেব দেয়া সম্ভব না। হাটতে গিয়ে পা ফুলে গেছে,তবুও হাটা বন্ধ করিনি।
এক পর্যায়ে ফজর নামাজের আজান দেওয়া হলো। দিনের আলো শুরু হতেই দেখি রাস্তায় শুধু আমরা না। শত শত শিশু বৃদ্ধসহ নারী পুরুষ মিছিলের মত রাস্তা ধরে হাটছে। সবার কাছেই কোন না কোন বোঝা আছে। সবার চোখে মুখে ভয়াবহ আতংক। সবার যাত্রাপথ ভারতের কোনাবনের দিকে। জায়গার নামটা মনে নেই। রাস্তার পাশে একটা মসজিদের কাছে আসতেই দেখলাম মুসুল্লীরা ফজর নামাজ পড়ে মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে ছোট ছোট প্যাকেট করে শুকনা খাবার দিচ্ছে। কে হিন্দু আর কে মুসলমান এটা তারা জানতে চায়নি। লুঙ্গি,পাঞ্জাবী ও টুপি পরিহিত সেই মুসল্লীগণ সে দিন যদি আমাদের সেই চিড়া মুড়ি,গুড় ও জল না দিতেন তাহলে হয়তো অনেক বৃদ্ধ বৃদ্ধা বা শিশুরা ক্ষুধার চোটে মারাই যেতেন। সেই মুসলিম ভাইদের কথা আজো আমি শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করি। সন্ধ্যার একটু আগে আমরা কোনাবন পৌঁছি। ভাগ্য ভাল সেখানে গাড়িসহ আমাদের এক খালাত ভাইকে পেয়ে যাই। আমার এই খালাত ভাই তখন তার গাড়িতে করে আমাদের আগড়তলা খালাতো বোন কানন বালার স্বামী ইঞ্জিনিয়ার মনোরঞ্জন রায়ের বাড়িতে নিয়ে যান।
ভারতে গিয়ে এরপর কোথায় ছিলেন জানতে চাইলে শরণার্থী প্রদীপ কুমার পাল বাবলু বলেন,ভারতে যাওয়ার প্রায় ১০/১৫ দিন পর আগড়তলা শহরের বটতলা চৌমহনীতে এক দিন হঠাৎ করে মো. শওকত আলী,ক্যাপ্টেন মেরীসহ কুমিল্লা সেনানিবাসের অনেক বাঙ্গালী অফিসার ও স্টাফের সাথে দেখা হয়। যাদের সাথে আমি দীর্ঘ দিন কাজ করেছি। ক্যাপ্টেন মেরী সাহেবতো আমাকে পেয়ে মহা খুশি। আরে বাবুল,এখানে এসে তো তোমাকে প্রচন্ড মিস করছি। কাগজপত্র টাইপ করা ,টাইপ মেশিন ও ফটোষ্ট্যাট মেশিন ঠিক করাসহ আনুসাঙ্গিক আরো অনেক বিষয়ে খুব সমস্যায় আছি। তুমি আমাদের সাথে চল। মেজর শওকত সাহেব বললেন, সবাইতো আর দেশে গিয়ে যুদ্ধ করবে না। আমাদেরকে সাহায্য করাও যুদ্ধের সমতুল্য কাজ হবে। এখান থেকে তারা আমাকে নিয়ে গেলেন গাড়িতে করে। অফিসে গিয়েই বললেন এগুলো তারাতারি টাইপ কর। শরণার্থী হিসেবে ক্যাম্পে কিংবা আত্মীয়ের বাসায় না থেকে এখানে চাকুরীও কর,থাকোও। বেতন থেকে শুরু করে খাবার সব কিছুরই ব্যবস্থা হবে কোন সমস্যা নেই। সেদিনই আমি দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করলাম যে,আসলে যারা কাজ জানে ও পাড়ে তারা পৃথিবীর যে কোন প্রান্তেই যে অবস্থায় থাকে না কেন তারা কখনো বেকারও থাকে না আবার না খেয়েও থাকে না। ভগবানের কাছে লাখো কোটি শুকরিয়া যে,ভুতু দাও চাকুরী পেয়ে গেল আমিও পেয়ে গেলাম। এক পর্যায়ে আমাকে গোটা আগরতলা রাজ্যের যত গুলো শরণার্থী ক্যাম্পের অফিস ছিল প্রায় সব খানেই যেতে হতো। কারণ,সেখানে অনেকেই ছিল টাইপ করতে পারত কিন্তু মেশিন নষ্ট হয়ে গেলে তা ঠিক করতে পারত না। তাই আমাকে এক ক্যাম্প থেকে আরেক ক্যাম্প যখনি অর্ডর করতেন তখনি চলে যেতাম অফিসের গাড়ি দিয়ে। এই চাকুরী করতে গিয়ে একদিন আমার পরিচয় হয় ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৫৯ মাউন্ট রেজিমেন্টের মেজর টেনডন শিং এর সাথে। একটা সময় দেখা গেল ভারতীয় এই মেজরের মাধ্যমে ভারত সেনাবাহিনীর অফিসের অনেক কাজেও আমাকে নেয়া হতো।তবে ভারতীয় সেনাবাহিনী কখনো আমাকে ফ্রি কাজ করায়নি। আমি নিতে না চাইলেও তারা আমাকে জোড় করে হাত খরচ দিয়ে দিত।
বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ক্যাম্পে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মাইনুল হুদা,নাজমুখ হাসান পাখির সাথেও আমার দেখা হয়েছে।
আপনার সেখানে কোন সমস্যা হয়ছে কিনা জানতে চাইলে প্রদীপ কুমার পাল বাবুল বলেন,আসলে আমার কোন সমস্যা হয়নি। তবে যারা শরণার্থী শিবিরে ছিল তাদের হাজারো সমস্যা ছিল যা নিজের চোখে দেখেছি। সবচেয়ে বড় কষ্ট পেতাম তখন, যখন দেখতাম আপনজন মারা গেছে কিন্তু পানির অভাবে গোসল করাতে পারছে না,জায়গার জন্য দাফন করতে পারছে না,অর্থের জন্য দাহ করতে পারছে না। শিবির গুলোতে যে শত শত শিশু মারা গেছে তার ৯০ ভাগ মারা গেছে শুধু মাত্র বিশুদ্ধ পানির অভাবে। পানির সংকট ছিল সবচেয়ে বেশী।
কবে দেশে আসলেন জানতে চাইলে প্রদীপ কুমার পাল বাবলু জানান,আমরা আগের দিন্ জেনে গেছি আগামীকাল ৮ ডিসেম্বর কুমিল্লা মুক্ত হবে। ৮ ডিসেম্বর দুপুর ২ টায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৫৯ মাউন্ট রেজিমেন্টের মেজর টেনডন সিংহ নিজ গাড়িতে আমাকে কুমিল্লা সীমান্তের কাছাকাছি নামিয়ে দিয়ে যান। পড়ে আমি বাকী পথটুকু পায়ে হেঁটে কুমিল্লা শহরে চলে আসি।
বাসায় আসার পর বাবা মা তো আমাকে পেয়ে যে গলায় ধরে কিভাবে কান্না করল বুঝাতে পারব না। তবে তাদের এ কান্না ছিল আনন্দের। ছেলেকে ফিরিয়ে পাওয়ার কান্না।
আপনার শেষ বক্তব্য কি জানতে চাইলে প্রদীপ কুমার পাল বাবলু বলেন, বক্তব্য আমার একটাই। শুধু আমাকে না। দেশের সকল শরণার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের সহায়তাকারী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক।