সোমবার ১ জুন ২০২০


শরণার্থীদের খোঁজে… ১৮ : গুলির শব্দে হারিকেন বন্ধ করে খাটের নিচে শুয়ে থাকতাম -রতন কুমার বসু


আমাদের কুমিল্লা .কম :
18.03.2020

শাহাজাদা এমরান।।  ২৫ মার্চ থেকে ভারতে শরণার্থী হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত কুমিল্লার বাসায় যতদিন ছিলাম ভয়াভহ এক আতংকের মধ্যে আমাদের সময় কাটতো। যখনি গুলির শদ্ধ আসত তখনি হারিকেনের আলো বন্ধ করে মা আমাদের খাটের নিচে ঢুকিয়ে বলতেন চুপ করে শুয়ে থাক। কোন কথা বলিওনা। ঐ সময় গুলো কি যে এক বিভীষিকাময়ের মধ্যে ছিলাম তা এক মাত্র ঈশ্বরই ভাল জানেন।একটা পর্যায়ে বাধ্য হয়ে জীবন বাঁচাতে বাবা মা ভারতে পাঠিয়ে দেন। কথা গুলো বলেই আপ্লুত হয়ে গেলেন ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে ভারতে শরণার্থী জীবনে থাকা রতন কুমার বসু।
পিতা বিল্লেশ্বর বসু ও মাতা লাভন্য বসুর ৫ ছেলে ও ২ মেয়ের মধ্যে রতন কুমার বসু তৃতীয়। ১৯৫৫ সালে কুমিল্লা শহরের নানুয়া দিঘীর পাড়ে তিনি জন্ম গ্রহন করেন। বাবা বিল্লেশ্বর বসু ছিলেন কুমিল্লা রাজগঞ্জ রূপকথা সিনেমা হলের চীফ অপারেটর।
শরণার্থী জীবনে যাওয়ার আগের কুমিল্লার অবস্থা জানতে চাইলে রতন কুমার বসু বলেন, বাবুল সাহাদের বাসা আমাদের বাসা ছিল একেবারেই পাশাপাশি। তবে অপেক্ষাকৃত আমাদের বাসাটি ছিল কিছুটা নিচু আর বাবুল সাহাদেরটা ছিল উচু। একদিন সন্ধ্যার সময় দেখি আমাদের বাসা বরাবর পাঞ্জাবীদের একটি গাড়ি আসতেছে। এমন সময় মা ভয়ে হারিকেন বন্ধ করে দিয়ে আমরা সবাই খাটের নিচে লুকিয়ে থাকি। এক পর্যায়ে মা আমার ছোট ২ ভাইসহ আমাকে পেছনের জানালা দিয়ে বাহিরে পাড় করে দেয়। তখন নানুয়া দিঘির পেছনে জঙ্গলের মত ছিল। আমরা তিন ভাই জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে ছিলাম। পাঞ্জাবীদের গাড়ি যাওয়ার পর শুনি তারা বাবুল সাহার পিতা অনিল মোহন সাহা মোক্তার সাহেবকে ধরে গেছে। এতে আমরা আরো ভীত হয়ে পড়ি। পরদিন আমরা তিন বন্ধু অনিল মোহন সাহা মোক্তার মেশোর ছেলে বাবুল সাহা, মনমোহন সাহা মেশোর ছেলে রতন কুমার সাহাসহ আমরা ভারতে চলে যাই। আমরা এক কাপড়ে কুমিল্লা ছেড়ে যাই। যাওয়ার সময় কত যে কষ্ট যন্ত্রনা হয়েছে তা বলে বুঝানো যাবে না। বিশেষ করে গোমতী নদী যখন পাড় হই তখন মনে হয়েছে যে কোন সময় বুঝি বুলেট আমার জীবনটাকে নিয়ে যাবে। তবে আমার বড় ভাইয়ের বন্ধু কুমিল্লা শহরতলীর চাঁনপুর গ্রামের হাজি বাড়ির সাইফুল ইসলাম ভাই সেদিন যে উপকার করেছিলেন তা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভুলব না। তিনি যদি সেদিন আমাদের বোরকা পড়িয়ে সাহায্য না করতেন তাহলে গোমতী নদী পাড় হওয়া হয়তো আমাদের দ্বারা অসম্ভব ছিল। সাইফুল ভাই আমাদের তিনজনকে একেবারে ভারতের মতি নগর সীমান্ত পর্যন্ত দিয়ে আসেন। ইতিমধ্যে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। দুই বন্ধু যার যার মত করে চলে গেছে। কিন্তু আমি আর যেতে পারিনি। খোলা আকাশের নিচে অন্য কয়েকশ শরণার্থীদের সাথে আমিও মতিনগরে রাত কাটাই।বসার মত একটু জায়গায়ও ছিল না বালি আর মাটি ছাড়া। সারারাত কতক্ষন দাঁড়িয়ে থাকা যায়। একপর্যায়ে মাটিতেই শুয়ে বসে রাত কাটাই।সবচেয়ে কষ্টকর ছিল বাথরুমের অভাব। অসংখ্য মানুষের জন্য ছোট দুটি বাথরুম ছিল। দেখা গেল সারা রাতই এই বাথরুম দুটিতে সিরিয়াল লেগে ছিল। বিশেষ করে মহিলা শরণার্থীদের কষ্ট ছিল অবর্ণনীয়। সকালে উদয়পুর শম্ভ কাকার বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেই। এখানে প্রায় এক মাস থাকার পর কুমিল্লা থেকে আমার মা ভাইবোনদের নিয়ে ভারতে চলে আসেন। এরপর দিন আমরা তেলিয়া মোড়া মামা করুণাময় সরকারের বাড়িতে আশ্রয় নেই। মামার ঘরটি বড় ছিল না। তাই কয়েকদিন পর আমরা তেলিয়ামুড়া শরণার্থী শিবিরে চলে আসি। এই ক্যাম্পের স্থানীয় নেতা ছিলেন আমার মামা করুনাময়। এখানে প্রায় ১৫ /২০ হাজার শরণার্থী ছিল। এই শরণার্থী শিবিরেও আমাদের কষ্টের শেষ ছিল না। সবচেয়ে কষ্ট ছিল ঘুমাবার। কারণ,আমরা ভাই বোন,বাবা মাসহ পরিবারের সদস্য ছিলাম ৯জন। কিন্তু আমাদের থাকার জন্য রুম দেয়া হলো মাত্র একটি। এই একটি রুমেই আমরা পালাক্রমে ঘুমাতাম। রাতে,দুপুরে ও বিকালে এভাবে রুটিন করে আমরা ঘুমাতাম যেমন চাকুরীর ওভার টাইমের ডিউটির মত। এ ছাড়া বিশুদ্ধ পানি আর চিকিৎসার অভাবে অসংখ্য মানুষ আমাদের শিবিরে মারা যায়। এই শিবিরে যারা মারা গেছে তাদের বেশীর ভাগকেই দাফন বা দাহ করা হতো না। কোন পাহারের নিচে পাথরের নিচে চাপা দিয়ে রাখা হতো। এই ছাড়া বিকল্প কোন উপায়ও ছিল না। এ দৃশ্যগুলো ছিল বড়ই বেদনার।
এই ক্যাম্পে যাওয়ার পর আমাদের আরেকটি সমস্যা দেখা দিল। এর একটি হল রিলিফ যা দেওয়া হতো আমাদের প্রয়োজনের তুলনায় তা ছিল খুবই কম। যেহেতু আমরা লোকসংখ্যা বেশী ছিলাম। তাই আমি শুরু করলাম দিন মজুরের কাজ। এক পর্যায়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অফিসে দিন মজুরের কাজ পেয়ে গেলাম। তেলিয়ামুড়া থেকে খোঁয়াই গিয়ে পর্যন্ত আমাকে কাজ করতে হয়েছে। আমাকে দৈনিক ৫০ থেকে ৬০ টাকা দেওয়া হতো। রিলিফ আর আমার এই মজুরী দিয়ে কোন মতে চলত আমাদের সংসার। আসলে শরণার্থী শিবিরে ছিলাম সত্যি। কিন্তু এখানে নানা কষ্টের কোন শেষ ছিল না। তারপরেও মনেরে বুঝ দিতাম দেশে থাকলে তো পাঞ্জাবীরা মেরেই ফেলত। এখানে যে খেয়ে না খেয়ে জীবন নিয়ে বেঁচে আছি এটাই বা কম কিসের। তবে ভারতীয় মানুষের আচার ব্যবহার ভাল এবং সহযোগিতামূলক ছিল উল্লেখ করে রতন কুমার বসু বলেন,তাদের সাহায্য ছাড়া কোন ভাবেই ঐখানে আমাদের থাকা সম্ভব হতো না।
কবে দেশে আসলেন জানতে চাইলে রতন কুমার বসু বলেন, ১২ ডিসেম্বর আমরা পরিবারের সবাই এক সাথে কুমিল্লা চলে আসি। বাসায় এসে দেখি আমাদের ঘর বাড়ি কিছুই নেই।সব কিছু লুটপাট করে নিয়ে গেছে। এ সময় আমার মামার বন্ধু জনতা ব্যাংকের অফিসার শহীদ মামা আমাদের সার্বিক সহযোগিতা করেছিল।
রতন কুমার বসু বলেন,একটি দেশ স্বাধীন করতে হলে সেই দেশের মানুষের বিভিন্ন পর্যায়ের সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। কেউ যুদ্ধ করেছেন,কেউ যুদ্ধ সংগঠিত করেছেন,কেউ পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ ভাবে সাহায্য করেছেন। আমরা যারা শরণার্থী ছিলাম আমরা যদি এ দেশের রাজাকারদের সাথে হাত মিলিয়ে পাঞ্জাবীদের সাহায্য করতাম তাহলেও হয়তো আমাদের শরণার্থী হইতে হতো না। সুতরাং কিছু সংখ্যক রাজাকার আলবদর ছাড়া এদেশের সকল মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসলই হলো আমাদের আজকের বাংলাদেশ। যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান। সুতরাং,আমার দাবী সরকার যেন আমাদেরও স্বীকৃতির আওতায় নিয়ে আসে।