মঙ্গল্বার ২৬ †g ২০২০


শরণার্থীদের খুঁজে… ১৯ : আমাদের আশ্রয় দেওয়া বাড়িটি পুড়িয়ে দেওয়া হয়- বিজয়া দত্ত¡


আমাদের কুমিল্লা .কম :
19.03.2020

শাহাজাদা এমরান।। কুমিল্লা শহরের বিসিকে সাড়ে ১১ গন্ডা জায়গায় উপর আমাদের নিজস্ব সাবানের কারখানা ছিল।হাঁস,মুরগী,গরু সবই ছিল।বিশাল সংসার আমার। দেশে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সব কিছু ফেলে স্বামী সন্তানদের নিয়ে এক কাপড়ে চোখের জলে আঁচল ভিজিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে আসি।প্রথমে বরুড়া,পরে বাবার বাড়ি চাঁদপুরের কচুয়া এর পর সেখানেও যখন জীবন বিপন্ন হতে চলল তখন অজানা অচেনা ভারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম সেই কালো রাতে।কচুয়া,বরুড়া ও সদর দক্ষিণ পাড় হয়ে রাত পেরিয়ে সকাল এরপর যখন দুপুরও এলো তখন লাকসামের এক বাড়িতে মাত্র কয়েক ঘন্টার জন্য আশ্রয় নিয়েছিলাম। ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের একটু বসার জন্য ,জল মুখে দেওয়ার জন্য একটি বাড়িতে অনুরোধ করে বসার অনুমতি পেয়েছিলাম। ভয়ে কেউ কাউকে আশ্রয় দিতে চায় না পেছনে বিপদ হবে বলে। বিকালে আমরা যখন ঐ বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসি তখন পথিমধ্যে খবর শুনলাম,আমাদের আশ্রয় দেবার কারণে ঐ বাড়িটি সম্পন্ন পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এভাবে অনাহারে থেকে পুরো দুই দিন হেঁটে ভারতের ত্রিপুরা পৌঁছি।পরবর্তীতে দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত কলকাতা থাকি। সেই জীবনের দু:খ কষ্ট গুলো নিয়ে আজো বেঁচে আছি। জানালেন কুমিল্লা শহরের এক সময়ের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী বেনী গোসন দত্ত’র স্ত্রী বিজয়া দত্ত¡।
বিজয়া দত্ত¡।পিতা নবীন চন্দ্র লোধ এবং মাতা কাদম্বিনী লোধ।১৯৪০ সালের ২৫ ডিসেম্বর চাঁদপুর জেলার কচুয়া উপজেলার ভুইয়ারা গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। পরবর্তী জীবনে কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার চক্রতলা গ্রামের বেনী গোসন দত্বের সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই ব্যবসায়ী স্বামী তাকে কুমিল্লা শহরে নিয়ে আসেন। সেই থেকে আজো তিনি কুমিল্লায় রয়েছেন।
কিভাবে শরণার্থী হয়ে ভারত গেলেন জানতে চাইলে বাকরুদ্ধ হয়ে যান বিজয়া দত্ত।একটু নিজেকে সামলে নিয়ে বলতে শুরু করলেন।আমরা তখন কুমিল্লা বিসিকে নিজের বাসায় থাকি। আমার স্বামী ছিলেন আওয়ামীলীগের একনিষ্ট কর্মী। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চ ভাষনের পর থেকেই কুমিল্লা শহরে এক দিকে চাপা আতংক অন্য দিকে বাংলাদেশের পতাকা বানানোর হিড়িক চলছে। ২৪ মার্চ দিনের বেলা আমার স্বামী কুমিল্লা শহরের সব টেইলার্সের দোকান ঘুরেও একটি পতাকা বানানোর সুযোগ পাচ্ছিল না।প্রতিটি দোকানেই পতাকা বানানোর তীব্র ভীর ছিল।টেইলার্সের দোকানে সুযোগ না পেয়ে আমার স্বামী কাপড় কিনে আনলেন। রাতে আমার ভাই জিতেশ চন্দ্র লোধ পতাকার ডিজাইন এঁকে দেন। আমি রাত ৩টা পর্যন্ত সেলাই করে বাংলাদেশের পতাকা তৈরী করি। পতাকা বানানো উপলক্ষে সে দিন আমার বাসায় এক উৎসবের আমেজ বিরাজ করে। বাসায় মাংশসহ ভাল ভাল খাবার তৈরী করি। সকাল ৮টার দিকে আমার স্বামী একটি বড় বাঁশ এনে বাসার সামনে পতাকা টানিয়ে দেন। সবার মধ্যে এক ধরনের ব্যাপক আনন্দ বয়ে যায়।কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস দুপুর ২টার দিকে কে বা কারা বাঁশ থেকে পতাকাটা নিয়ে যায়। এতে আমার পরিবারে এক ধরনের আতংক বিরাজ করে।আমাদের কেউ টার্গেট করল কিনা এটা নিয়েও স্থানীয়রা বলাবলি শুরু করল। এরপর দিন ২৫ মার্চ রাতে ঠাকুরপাড়া সংলগ্ন আনসার ক্যাম্প থেকে ব্যাপক গুলাগুলির আওয়াজ আসতে লাগল। রাতের এই গুলির শদ্বে ভয় পেয়ে দোকানের কর্মচারীরা বেতন না নিয়েই সবাই সকালে পালিয়ে চলে যায়। ২৬ মার্চ থেকে শহরে ৩ দিন কার্ফু দেয়া হয়। এর মধ্যে বিকাল ৩ থেকে ৫টা পর্যন্ত শিথিল রাখে। আমরা নিজেরা যেখানে আতংকে আছি সেখানে আবার দেখা গেল শহরের আমাদের অন্যান্য আত্মীয় স্বজনরাও ভয়ে আমাদের বাসায় চলে আসে।
আমাদের সাবান দোকানের পাশেই পুনম ব্যাটারী নামে একটি ফ্যাক্টরী ছিল। এর মালিক বিহারী।সে কোন দিন আমাদের বাসায় আসে নি। হঠাৎ করে ২৮ মার্চ দুপুরে বাসায় এসে জিজ্ঞাসা করে দিদি কেমন আছেন।আপনাদের খোঁজ খবর নিতে এলাম। এই বিহারীর আগমন আমাদেরকে আরো ভয় পাইয়ে দেয় বেশী। সে কি কোন গোয়েন্দা হয়ে আসছে না তো। কুমিল্লা ডিসি অফিসে চাকুরী করত আমার স্বামীর বন্ধু আবদুর রহমান। খুব ভাল মানুষ ছিলেন। তিনি ৫ এপ্রিল দুপুরে বাসায় ছোট একটি চিরকুট পাঠান। তাতে লেখা ছিল, দত্ত¡ তুমি আর এক মুহুর্তের জন্যও কুমিল্লা শহরে থাকবে না। তোমার নামে তালিকা হয়ে গেছে। আমি ৫টি বড় গরুসহ হাঁস মুরগী পালতাম।সাবানের দোকানে ও কারখানায় কত মাল ছিল। কিন্তু এই চিরকুট পেয়ে সব কিছু রেখে পকেটে যে ৩৩ টাকা ছিল তাই নিয়েই বিকাল ৪টার দিকে আমি,স্বামী,ছেলে দেবাশিষ(৭).মেয়ে কাকলী(৪) ও ৬ মাস বয়সী আরেক মেয়ে সুদিতাকে নিয়ে সোজা চলে গেলাম বরুড়া এক আত্মীয়ের বাড়িতে। পথে পথে নানা হয়রানীর কথা নাইবা বললাম। আত্মীয়ের বাড়িতে ২ দিন থাকার পর দেখলাম তারা নিজেরাই বিপদে আছে। ভারত যাওয়ার ব্যবস্থা করতেছে। তখন চলে গেলাম কচুয়ায় বাবার বাড়ি। বাবার বাড়ি গিয়েও শান্তি নেই। ঐখানেও একই অবস্থা। তখন আমার এক তালই নিপেন্দ্র মজুমদার বাড়ি এসে জানালেন,ভারতের সরকার সীমান্ত খুলে দিয়েছে। চল আমরা ভারত চলে যাই। মে মাসের প্রথম সপ্তাহে একদিন সকাল ৮টার দিকে নাস্তা খেয়ে আমরা ২ পরিবারের ১১ জন সদস্য ভগবানের নাম নিয়ে রওয়ানা হলাম। পাঞ্জাবীদের ভয়ে মুল রাস্তা বাদ দিয়ে জমির আইল দিয়ে কচুয়া থেকে হাটা শুরু করলাম। বরুড়া হয়ে লাকসামের হরিশ্বর যখন আসি তখন বিকাল হয়ে যায়। প্রচন্ড ক্ষুধার সাথে হাটতে হাটতে সবার পা ফুলে গেছে। এখানে এক আত্মীয়ের বাসায় রাত কাটাই। ভোরে সূর্য উঠার আগেই আবার এই আত্মীয়ের বাসা থেকে রওয়ানা দেই। হাঁটতে হাঁটতে জমির উপর তৈরী করা এক বাড়িতে যখন উঠি তখন বিকাল হয়ে যায়। জায়গায়টার নাম এখন মনে নেই। সবারই প্রচন্ড ক্ষুধা। ঐ বাড়ির মালিককে বলি আমরা খুব ক্ষুধার্ত পারলে আমাদের কিছু খাবার দিন। তিনি জানালে,মুড়ি ছাড়া ঘরে এই মুহুর্তে আর কিছুই নেই। পড়ে এই খালি মুড়ি যে আমরা কত স্বাধে খেয়েছি তা বলে শেষ করা যাবে না। জল আর মুড়ি খেয়েই আবার আমরা হাঁটতে লাগলাম। কারণ,আমাদের তো লক্ষ সীমান্তের দিকে ভারত যাওয়া। আমরা এই বাড়ি থেকে বের হওয়ার আধা ঘন্টার মধ্যে স্থানীয় রাজাকাররা খবর পেয়ে এই বাড়িটি একেবারে পুড়িয়ে দেয়। এক পর্যায়ে রাত হয়ে যায়। আমার তালুই স্থানীয় ২ জন মানুষকে টাকার বিনিময়ে ঠিক করে যে,তারা আমাদের নিরাপদে সীমান্ত পৌঁছে দিবে। তাদের দেখানো পথ ম্যাপ অনুযায়ী এবার আমরা হাঁটতে লাগলাম। ৬ মাসের মেয়েকে কোলে নিয়ে ছোট ছোট দুই ছেলে মেয়েকে হাটিয়ে কত যে কষ্ট করেছি তার হিসেব হয়তো কোন দিন মিলবে না। পরে বিকাল ৪টার সময় আমরা ভগবানের দোয়ায় সোনামুড়া গিয়ে পৌঁছি।
ভারতের সোনামুড়ার কাকরাবন নামক এলাকায় আমার এক মামাত ভাই অশ্বনী কুমার দত্তে¡র বাড়িতে উঠি। এই বাড়িতে থাকা অবস্থায় আমরা শরণার্থী হিসেবে রিলিফও পেয়েছি। এখানে আমরা কিছুদিন থাকার পর আমার ছোট মেয়ে খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে। হাতে টাকা নেই। খাই অপরের বাড়িতে মেয়ের চিকিৎসা করাব কিভাবে? কলকাতায় থাকা আমার এক ভাসুরকে স্বামী চিঠি লিখে কিছু টাকা দেওয়ার জন্য। তার টাকা পেয়ে আমার স্বামী বড় দুই ছেলে মেয়েকে নিয়ে কলকাতা যায়।আমি অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে আগড়তলাতেই থাকি। পড়ে ভাসুর আবার টাকা পাঠালে ৫০ টাকা দিয়ে বিমানের টিকেট করে কলকাতা যাই। কলকাতা সল্টলেক কয়েকদিন এক আত্মীয়ের বাড়িতে থাকার পর আমরা আগড়তলার রিলিফ কার্ড দিয়ে এখানকার শরণার্থী শিবিরে খাবার আনতে গেলে কর্তৃপক্ষ মাল দেয়নি। তারা বলে আপনারা আগরতলার শরণার্থী। সল্টলেকে তখনো পুরো শরণার্থী শিবির খোলা হয়নি। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া শরণার্থীরা পাইপের ভেতর খুব কষ্ট করে থাকত। এরপর আমরা হাওয়ার লিনুয়া গ্রামে যাই। এখানে আসার পর আমার ভাসুর প্রতি মাসে ১০০ টাকা দিত। এটাকা দিয়ে এত গুলো মানুষের কিভাবে হয়। অনাহারে অর্ধহারে আমাদের দিন কাটত। এ সময় আমাদের খাবার কষ্টের কথা শুনে দমদমের এক দিদি তার প্রভাবশালী স্বামীকে বলে আগড়তলার কার্ডের কথা গোপন করে আমাদের জন্য এখানে কার্ড করে দেন। এরপর শরণার্থী শিবিরের রিলিফ আর ভাসুরের দেওয়া ১০০ টাকা দিয়ে কোনমতে সংসার চালিয়েছি। এক পূজার সময় ভাসুর আমার ও ছেলে মেয়েদের কাপড় কিনার জন্য ২০০টাকা দেন। এই টাকা দিয়ে আমি সেলাই মেশিন কিনি। পরে ভগবানের দোয়ায় স্থানীয়দের কাপড় সেলাই করেও আমি অনেক টাকা রোজগার করি।
কবে দেশে আসলেন জানতে চাইলে বিজয়া দত্ত¡ বলেন,দেশ স্বাধীন হওয়ার সাথে সাথেই আমার স্বামী কুমিল্লা চলে আসে। কুমিল্লা এসে দেখে আমাদের বাসা,দোকান কারখানা সব খোলা অবস্থায় খালি পড়ে আছে। আর ভিতরে বড় বড় আগাছা জন্মে জংগল হয়ে উঠেছে। তিনি অনেক কষ্টে কোনমতে থাকার মত বাড়িটি প্রস্তুত করে আর চলার মত সাবানের দোকানটি চালু করে মাস দুই পর আমাদের ভারত থেকে নিয়ে আসেন।
শরণার্থী বিজয়া দত্ত¡ দু:খ করে বলেন, আবার স্বামী স্ত্রী কষ্ট করে সেই সাবানের ফ্যাক্টরীকে দাঁড় করাই। সাড়ে ১১ গন্ডার উপর আমার বাড়ি ও কারখানা ছিল। পাকিস্তান হানাদার বাহিনী আমার সম্পদ নিতে না পারলেও স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে আমাদের পুরো সম্পত্তি ৯০ দশকের শেষ দিকে দখল হয়ে যায়। একেবার উচ্ছেদ হয়ে আজ আমি মেয়ের বাসায় থাকি। রক্তে ঘামে গড়ে উঠা এই সাড়ে ১১ গন্ডা সম্পত্তি কৌশলে দখল হয়ে যাওয়ার পর আমার স্বামী শেষ জীবনের চার বছর মানুসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। সুতরাং সরকারের কাছে আর কিবা চাইব বলেন? তবে এটা বলতে পারি সরকার যেন শরণার্থী হিসেবে আমাদেরকে একটু মুল্যায়ন করেন।