শুক্রবার ২ অক্টোবর ২০২০


শরণার্থীদের খুঁজে…২০ : শরণার্থী হয়েও হানাদারদের হাত থেকে বাঁচতে পারল না সুলতান চাচা -আবদুল গফুর


আমাদের কুমিল্লা .কম :
20.03.2020

শাহাজাদা এমরান।।  পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও এদেশের রাজাকার আল বদর আল শামস্দের ভয়ে শরণার্থী হয়ে আমাদের সাথে ভারত গেলেন সুলতান চাচা। যে জীবন বাঁচানোর জন্য তিনি নিজের ভিটে মাটি ছেড়ে পরদেশে আশ্রয় নিলেন সেই জীবন নিয়ে আর দেশে ফিরতে পারলেন না তিনি। হানাদার বাহিনীর অত্যাচার যখন আমাদের গ্রামে চরম আকার ধারণ করল তখন বাধ্য হয়ে আমাদের গ্রামের পূর্ব দিকে ভারতের সোনামুড়া জেলার দলির দোলা গ্রামে চলে যাই।সেখানে শরণার্থী হয়ে থাকাকালীন সময়ে প্রায়ই এক সাথে বসে ছোট বড় সবাই আড্ডা দিত।অক্টোবরের শেষ দিকে এমনি এক দুপুরে আড্ডা দেওয়ার সময় আমাদের ইলাশপুর গ্রাম বা তার আশে পাশের এলাকা থেকে হানাদার বাহিনীর ছুঁড়ে দেওয়া একটি বুলেট এসে বিদ্ধ করে চাচা সুলতান(৬০)কে। ঘটনাস্থলেই তিনি শহীদ হন। আহত হয় অনেকে। সেই দিন পুরো দলির দোলা এলাকা যেন কারবালার ময়দান। নারী পুরুষ শিশু বৃদ্ধ নির্বিশেষে সবাই বিলাপ করে কেঁদেছে। সবারই একটাই কথা ছিল,আমরাতো তাদের ভয়ে জীবন বাঁচাতে এই দেশে এলাম, তাহলে এখানে কেন তারা আমাদের উপর গুলি ছুড়বে , মারবে।দলির দোলায় মুক্তিযোদ্ধারা আশ্রয় নিতে পারে মনে করে প্রতিদিনই গুলি বোমা ফেলত হানাদার বাহিনী। কথা গুলো বলেই চোখ মুছতে লাগলেন আবদুল গফুর।
মো.আবদুল গফুর পিতা গোলাম নুর এবং মাতা কদরের নেছা। পিতা মাতার ৩ ছেলে আর ১ মেয়ের মধ্যে তার অবস্থান ৪র্থ। তিনি ১৯৫৩ সালে আদর্শ সদর উপজেলার আমড়াতলী ইউনিয়নের ইলাশপুর গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন।
শরণার্থী আবদুল গফুর ১৯৭০ সালে ভিক্টোরিয়া সরকারী কলেজে ভর্তি হয়েই জড়িয়ে পড়েন ছাত্রলীগের রাজনীতিতে। তখন কলেজ ছাত্রলীগের প্রভাবশালী নেতা ছিলেন ভিপি শাহ আলম। কোন পদ পদবী না থাকলেও কলেজের সকল মিছিল মিটিংয়ে অংশ নিতেন আবদুল গফুর লজিং থাকতেন শহরের চকবাজার রেশন দোকানের মালিক আবদুস সালাম সাহেবের বাসায়। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের ভাষনের পর থেকেই পাল্টে যেতে থাকে কুমিল্লা শহরের দৃশ্যপট। ২৫ মার্চ কালো রাতে সারা রাতের গোলাগুলির আওয়াজে ভীতসন্ত্রস্ত আবদুল গফুর পরদিন ২৬ মার্চ সকালে বাসার মালিককে না বলেই চলে যান বাড়িতে। তখন গোমতী নদীতে কোন ব্রিজ ছিল না। খেয়া পাড় হয়ে যেতে হতো বাড়িতে।
শরণার্থী হিসেবে কখন ভারত গেলেন জানতে চাইলে আবদুল গফুর বলেন,এপ্রিলের ২ বা ৩ তারিখ হবে। ক্যাপ্টেন হায়দারের নেতৃত্বে রঘুরামপুরে হানাদার বাহিনীর টহলের উপর একটি আক্রমন করা হয় । এতে বেশ কয়েকজন হতাহত হয়। এই ঘটনার পরই পরিস্থিতি সম্পূর্ন পাল্টে যায়। পাঞ্জাবীদের পুরো লক্ষবস্তুতে পরিনত হয় ইলাশপুর ও রঘুরামপুরসহ আশে পাশের এলাকা গুলো। এরপরদিনই দলে দলে আমরা সবাই ভারতে চলে যাই। আমাদের ইলাশপুর গ্রামের এমন একটি পরিবার হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না, যে তারা শরণার্থী জীবন যাপন করে নাই। আমাদের গ্রামের শতকরা ৮৫ ভাগ মানুষ আশ্রয় নিয়েছে গ্রামের ঠিক পূর্ব দিকে অবস্থিত ভারতের দলির দোলা জংগলে। এখানে এর আগে কোন বসতী ছিল না। আমাদের গ্রামের কয়েকজন মার্চের মধ্যভাগে যুদ্ধের আওয়াজ শুনেই জংগল পরিস্কার করে ঘর উঠিয়ে রেখেছিল। বাকীরা যুদ্ধের পর গিয়ে অবস্থান নেয়। বাঁশ ছন ইত্যাদি কেটে টং ঘরের মত ঘর তৈরী করে মানুষজন থেকেছে। পুরুষরা বাঁশ দিয়ে মাচা তৈরী করে খোলা আকাশের নিচে থেকেছে। বৃষ্টি হলে বৃষ্টিতে ভিজে গেছে কোন কিছুই করার ছিল না। আমাদের অবস্থানটি ছিল দলির দোলা পুকুর পাড় সংলগ্ন কাটাইয়া মাজার এলাকায়।এখানে প্রায়ই দেশ থেকে রেকি করে কিংবা যুদ্ধ করে মুক্তিযোদ্ধারা আসত। আমরা মাচায় বসতে দিতাম। আমি তাদের পানি খাওয়াতাম। মুক্তিযোদ্ধারা যখনি আমাদের এখানে আসত তখনি শুধু আমাদের পরিবার না অন্যন্য পরিবার যার ঘরে যা ছিল তাই দিয়ে তাদের আপ্যায়ন করাতো। আমাদের এখানে আসা মুক্তিযোদ্ধাদের নেতাদের মধ্যে ছিলেন কমান্ডার মোসলেম উদ্দিন অন্যতম। মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করার মাশুলও আমাদের দিতে হয়েছে সুলতান চাচাকে হারিয়ে। গুপ্তচোরেরা হানাদার বাহিনীর কাছে খবর পাঠাল দলির দোলা সীমান্তের ঘর গুলিতে মুক্তিযোদ্ধারা এসে বিশ্রাম নেয়। এর পর থেকে আমাদের আশ্রিত এই এলাকায় প্রায়ই গুলি ছুঁড়ত,বোমা ফেলত । একদিন দুপুরে পুকুর পাড় আমরা ছোট বড় মিলিয়ে অনেকেই আড্ডা দিচ্ছি। এমন সময় হঠাৎ করে একটি গুলি এসে পড়ল। আমাদের সুলতান চাচার ঠিক বুক বরাবর। চাচা অপেক্ষাকৃত আমাদের একটু দূরে বসেছিলেন এবং ঐ স্থানে তিনি একাই ছিলেন। সাথে সাথে চাচা মা বলে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। রক্তে লাল হয়ে গেল পুরো এলাকা। চাচা ঘটনাস্থলেই শহীদ হলেন আহত হলেন আরো কয়েকজন। এরপর থেকে আমরা দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত এক সাথে ৫জনও একত্রে হতাম না,আড্ডাও দিতাম না।
শরণার্থী শিবিরে খাবারের অনেক কষ্ট হতো। রেশন যা দেওয়া হতো প্রয়োজনে তুলনায় তা খুবই অল্প। যেহেতু আমাদের বাড়ি সীমান্তবর্তী ইলাশপুর গ্রামে তাই বাবা বড় ভাই বা চাচারা সময় বুঝে বাড়ি গিয়ে তরকারী সবজি নিয়ে আসতেন।
উপযুক্ত হওয়ার পরেও কেন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেননি জানতে চাইলে আবদুল গফুর বলেন,ভারতে গিয়ে আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে প্রশিক্ষনে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার বড় ভাই আবদুল লতিফ মাস্টার যেতে দেননি। তিনি ইতিমধ্যেই ক্যাম্পের বাজারের রিলিফ কমিটির আহবায়ক হয়ে যান। তখন ভাই বলতেন সবাই যদি মুক্তিযুদ্ধে চলে যাও তাহলে শরণার্থীদের রিলিফ দিবে কে। কিভাবে তারা বাঁচবে। রিলিফ দেওয়াটাও মুক্তিযুদ্ধের একটি অংশ। তখন বড় ভাইয়ের কথায় আর মুুক্তিযুদ্ধে না গিয়ে শরণার্থী শিবিরে রিলিফ বিতরণ করি।
কবে দেশে আসলেন জানতে চাইলে আবদুল গফুর বলেন, ৮ ডিসেম্বর সকালেই শুনি কুমিল্লা থেকে পাঞ্জাবীরা বিতারিত হয়ে গেছে। এ কথা আমাদের শিবিরে শোনার পর কেউ আর কারো অপেক্ষা করেনি। যেহেতু দোলির দোলা থেকে ইলাশপুর কাছে ছিল তাই যে যেভাবে পাড়ছে দৌঁড়ে চলে আসছে। কারণ,নিজের দেশের মাটি যে সোনার চেয়েও দামী এ কথা সেদিন আবার প্রমান করলাম।
বাড়ি এসে কি দেখলেন জানতে চাইলে আবদুল গফুর বলেন, বাড়ি এসে দেখি আমাদের ছনের ঘরগুলো ভেঙ্গে ফেলেছে। আর টিনের ঘরটির পালার মধ্যে আগুনের পোড়া দাগ ছিল। মনে হলো আগুন দিয়েও কোন কারণে না পুরিয়ে মালামাল নিয়ে গেছে। ২/৩ ঘরের যত মালামাল ছিল সব লুট করে নিয়ে গেছে।
আবদুল গফুরের দাবী,শরণার্থী হিসেবে নয়,সরকার যেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সহায়তাকারী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।