বুধবার ১ GwcÖj ২০২০


শরণার্থীদের খুঁজে… ২১ : ভারত যাওয়ার পর আমাদের বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়- খান ই আলম


আমাদের কুমিল্লা .কম :
21.03.2020

শাহাজাদা এমরান।। সীমান্তবর্তী গ্রাম হিসেবে যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই আমরা যেমন আতংকে ছিলাম তেমনি সতর্কও ছিলাম। সতর্ক থাকার অংশ হিসেবে আমার বাবা আগে থেকেই সীমান্তবর্তী ভারতের বালি দোলা গিয়ে ছোট ছোট ঘর তুলে এসেছিলেন। যাতে সমস্যা হলে দ্রæত চলে যাওয়া যায়। পরবর্তী পর্যায়ে যুদ্ধ শুরু হলে আমরা সবাই ভারতে চলে যাই। আর এই সুযোগে স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় হানাদার বাহিনী ঘরের সব মালামাল লুট করে ঘর দুটি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়ে যায়। কথাগুলো বলেছিলেন ১৯৭১ সালের শিশু শরণার্থী খান ই আলম। তখন তিনি ১০ বছরের শিশু হিসেবে সব কিছু বুঝতে না পারলেও কিছু কিছু মনে আছে তার। বড় হয়ে বাবা থেকে জেনেছেন তার শরণার্থী জীবনের কথা। আর নিজের স্মরণে থাকা আর বাবার কথার রেফারেন্স দিয়েই এই প্রতিবেদকের মুখামুখি হন তিনি।
কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার আমড়াতলী ইউনিয়নের ইলাশপুর গ্রামের আবদুল জলিল ও জাহেদা খাতুনের ৩ ছেলে ও ১ মেয়ের মধ্যে খান ই আলম দ্বিতীয়।
শরণার্থী জীবনের কথা মনে পড়ে কিনা জানতে চাইলে খান ই আলম বলেন,আমার বয়স ১০ হলেও মোটামোটি কিন্তু আমি সবই বুঝতে পারি।প্রতিদিন বাজার থেকে এসেই বাবা আর চাচা নানান আতংকের খবর দিতেন বাড়িতে। বলতেন পাকিস্তানীরা যে কোন মুহুর্তে আমাদের দেশ দখল করে নিবে,আক্রমন করবে।২৬ মার্চের পর সীমান্তবর্তী গ্রামগুলি বিপদজনক হয়ে উঠে। চর্তুদিকে ছড়িয়ে পড়ে গুজব।ক্ষনে ক্ষনে খবর আসে পাঞ্জাবীরা এলো রে। ঐ গ্রামে পাঞ্জাবী ঢুকেছে। আমাদের একটি মাটির ঘর ছিল। ঘরের দেয়ালটি ছিল ২০ ইঞ্চি লম্বা । যখনি গুলাগুলির আওয়াজ আসত আমরা তখনি সবাই মিলে ঐ মাটির ঘরে লুকিয়ে থাকতাম। এভাবে ২৬ মার্চ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত এক আতংকের মধ্যে দিনগুলো অতিবাহিত হতো। তখন আমাদের একটি রেডিও ছিল। আশেপাশের বাড়ি গুলোতে কোন রেডিও না থাকাতে যখনি বিবিসি বা ভয়েস অব আমেরিকার খবর হতো তখন আশেপাশের বাড়ির মানুষ গুলো আমাদের উঠানে ভীর করতেন খবর শুনার জন্য।
৩১মার্চ সকালে খবর এলো ফকির হাট রেলষ্টেশন দিয়ে পাঞ্জাবীরা আসতেছে।এই খবর শুনে ইলাশপুর গ্রামের শতকরা ৭৫ ভাগ পরিবার যে যেভাবে পাড়ছে পূর্বদিকে অর্থাৎ ভারতের দিকে দেঁৗঁড়ে পালাচ্ছে। সবারই গন্তব্যস্থল সোনামুড়া এলাকার বালিদোলা জংগলে। ছোট ছেলে জোড়ে হাটতে পারতাম না। তারপরেও বাবা মা বলতেন বাবা দৌঁড় দেও। ঐ দিন এভাবে দৌঁড়ে যেতে বৃদ্ধ ও শিশুদের যে কি কষ্ট হয়েছে তা একমাত্র আল্লাহই ভাল জানেন। সব থেকে বেশী কষ্ট হয়েছে যাদের কোলের শিশু ছিল ঐ সকল মহিলাদের। কারণ,প্রত্যোক মহিলার হাতেই কোন না কোন ব্যাগ ছিল তার উপর ছিল শিশু। আহ! সে যে কি কষ্ট। আমার স্পস্ট মনে আছে, বালি দোলা গিয়েই এক গাছের নিচে আমি শুয়ে পড়ি। অবশ্য আমি একা না। বড় ছোট মিলিয়ে অনেকেই বাংলাদেশ সীমান্ত পাড় হয়েই যে যেভাবে পাড়ছে বসে শুয়ে কিছুটা বিশ্রাম নিয়েছে। পড়ে শুরু হয়েছে চর দখলের মত জংগল দখলের প্রতিযোগিতা। সম্ভবত সেটা ছিল শালবন। ছোট ছোট গাছ গুলো কেটে এবং জংগল পরিস্কার করে যে যার মত পারছে টং ঘরের মত ঘর তৈরী করছে। পুরুষরা বাঁশ দিয়ে তৈরী মাচায় থাকত আর মহিলারা ঘরে থাকত।
এপ্রিলের দিকে একটি ঘটনার কথা বলতে গিয়ে শরণার্থী খান ই আলম বলেন,শালুক মুড়া ও তৈলকুপি গ্রামে একদিন পাঞ্জাবীরা গণহত্যা চালায়। এই হত্যাকান্ডে আমার চাচাতো ফুফাতো ভাই রঘুরামপুরের কেরমত আলী সর্দারের দুই ছেলে বোমা বিস্ফোরণে মারা যায়। এই খবর বালিদোলা আসলে সবার মাঝে কান্নার রোল পড়ে যায়।
শরণার্থী শিবিরের কোন স্মৃতি মনে আছে কিনা জানতে চাইলে খান ই আলম বলেন,ভারতে আমরা কান্তি বাজার দিঘির পাড়ের দলি মুড়া পুকুর পাড়ে থাকতাম। এখানে বাবা যুদ্ধ শুরু হবার আগেই পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে ঘর তুলে রাখে। এ জন্য অন্যদের তুলনায় আমাদের কষ্ট কিছুটা কম হয়েছে। সেখানে যাওয়ার পর আমার মেজ চাচার একটি মেয়ে হয়।তখন সবাই মিলে তার নাম রাখে শেফালী।
খাবার,থাকার,গোসলের ,বাথরুমের এবং পানির সহ নানা দূর্ভোগের কথা উল্লেখ করে খান ই আলম বলেন,এমন কোন হেন কষ্ট ছিল না যা আমরা করিনি। পাঞ্জাবীদের গতিবিধি দেখে বাবা চাচারা মাঝে মাঝে বাড়ি গিয়ে শাক সবজি নিয়ে আসতেন। আর শরণার্থী শিবির হিসেবে আমরা এখানে রিলিফ পেতাম। বাতাদোলা বাজার থেকে পায়ে হেঁটে বাবা চাচারা রিলিফ আনতেন। অনেক সময় সখ করে আমিও যেতাম।
একটি স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে খান ই আলম বলেন,একদিন রাতে সবাই ঘুমিয়ে আছে। হঠাৎ বিকট শদ্ধে একটি আওয়াজ এলো। প্রতিটি ঘরেই কান্নার রোল পড়ে গেল। অন্ধকার রাত হলেও অনেকেই দোঁড়াদোঁড়ি শুরু করে দিল। না জানি পাঞ্জাবীরা এখানে চলে আসছে। আবার কেউ কেউ ঘরের ভিতরই চুপ করে বসে বসে কাঁদছে। সকাল হওয়ার পর বাহিরে গিয়ে দেখলাম, সেখানে লুতু মিয়া বটগাছের নিচে আমাদের এলাকা থেকে পাঞ্জাবীদের ছোঁড়া একটি বোম এসে পড়েছে। বোমটি যে স্থানে পড়েছে সেই স্থানটি বিশাল এক গর্ত হয়ে আছে। খবর পেয়ে বিএসএফ এসে জায়গায়টি পরিদর্শন করে যায় এবংএই এলাকার টহল জোরদার করার আশ্বাস দেয়। নভেম্বর মাসের শুরুতে আমাদের বাশ মঙ্গল থেকে পাঞ্জাবীদের ছোঁড়া এক গুলিতে এখানে সুজা মিয়া নামে এক বৃদ্ধ মারা যায়।
সুখ স্মৃতি আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন,তখন ভারতে গরু ছাগলের অনেক দাম কম ছিল। আমাদের শিবিরে প্রায় প্রতিদিনই কয়েকজন গ্রæপ হয়ে গরু বা ছাগল কিনে ভাগ ভাগ করে বিক্রি করতেন। এ জিনিসটি দেখলে আমাদের খুব ভাল লাগত।
মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে দেখা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রায় প্রতিদিনই মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের এখানে আসতেন। যার ঘরের সামনে বসতেন তিনিই তাদের সবাইকে পানি খাওয়াতেন। পারলে কেউ কেউ নাস্তাও খাওয়াতেন। আমি অনেক দিন ঘর থেকে জগে করে পানি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের খাওয়াইছি।
আমরা শরণার্থী হয়ে ভারতে যাওয়ার পর মে বা জুন মাসে আমাদের বাড়িটি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলে ঐ দিন বিকালেই আমরা বাড়ি চলে আসি। বাড়িতে এসে দেখি,ঘর নেই। মাটির ঘরটিও ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে। ঘরের ভিতর গাছ জম্মে জঙ্গল হয়ে আছে। পরে এ গুলো পরিস্কার করে আস্তে আস্তে আবার স্বাভাবিক জীবনে যাওয়া হয়।
সেই দিনের শিশু শরণার্থী খান ই আলম দাবী করেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে নানান ভাবে সহযোগিতা করার জন্য ইলাশপুর গ্রামকে স্বীকুতি দেওয়া হোক। কারণ, এই গ্রামের লোক গুলি গ্রামে থেকেও নির্যাতিত হয়েছে আবার শরণার্থী হয়ে ভারত গিয়েও মুক্তিযুদ্ধাদের বিভিন্ন ভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেছে। এই গ্রামের এমন একটি পরিবার খুঁজে পাওয়া যাবে না যারা শরণার্থী হয়নি কিংবা ১৯৭১ সালে ক্ষতিগ্রস্থ হয়নি।