মঙ্গল্বার ২৬ †g ২০২০


শরণার্থীদের খোঁজে… ২২ : অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যাই – দেলোয়ার হোসেন


আমাদের কুমিল্লা .কম :
22.03.2020

শাহাজাদা এমরান।। একেক পরিবারে একাধিক সদস্য থাকায় আমাদের শরণার্থী শিবিরগুলোতে ছিল তীব্র অভাব। তাই রিলিফ যা দেওয়া হতো তাই দিয়ে অনেকেরই চলত না। তাই তারা বনের ভিতর ঢুকে লাকড়ি তৈরি করে সীমান্তে পাঞ্জাবিদের পদচারণার খোঁজখবর নিয়ে মাথায় করে লাকড়ি কুমিল্লা শহরে এনে বিক্রি করে আবার চলে যেতেন ভারতে। এরা ছিল আমাদের পাড়া প্রতিবেশী। শরণার্থী হিসেবে ভারত গিয়েও তারাই ছিল আমাদের প্রতিবেশী। বয়স কম। ছোট মানুষ। সারা দিন এক জায়গায় থাকতে আর ভাল লাগে না। খেলতে পারি না। তাই আমাদের ওই প্রতিবেশীরা যখন আজ লাকড়ি নিয়ে যাচ্ছে তখন আমি বললাম আমিও কুমিল্লা যাব। প্রথমে মা রাজি না হলেও তারা বললেন খালাম্মা অসুবিধা নেই আমরা বিকলে আসার সময় আবার নিয়ে আসব। আমাকে কখনো কোলে নিয়ে কখনো বা পায়ে হেঁটে কুমিল্লা শহরে নিয়ে গেলেন। পুরাতন চৌধুরীপাড়ার আমার এক আত্মীয় শিরাজুল ইসলাম মাস্টার সাহেবের বাসায় রেখে তারা লাকড়ি বিক্রি করতে গেছে। তখন এয়ার আহমেদ সেলিমের বর্তমান বাসা সংলগ্ন এলাকায় একটি পুকুর ছিল নাম তার জোড়া পুকুর। ওইখানকার আরো কয়েকজন ছোট ছেলের সাথে পুকুর ঘাট আমি খেলছি। এমন সময় হঠাৎ একটি গুলি এসে ঠিক আমাদের সামনে এসে পড়ে। আর সামান্য একটু সামনে দাঁড়ালেই গুলিটা আমার গায়ে লাগত। সেদিন ভয়ে যেভাবে চিৎকার দিয়ে উঠেছিলাম তা মনে হলে আজো গা শিউরে উঠে। কথাগুলো বলেই কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন শিশু শরণার্থী মো.দেলেয়ার হোসেন।
মো.দেলোয়ার হোসেন। পিতা হাজি ডা.মো.মোর্তজা আলী ও মাতা সালেহা বেগম। কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার আমড়াতলী ইউনিয়নের ইলাশপুর গ্রামে তার জন্ম। জন্মগ্রহণ করেন ১৯৬৫ সালে। পিতা মাতার ছেলে ও ৫ মেয়ের মধ্যে তার অবস্থান দ্বিতীয়।
মো.দেলোয়ার হোসেন জানান,আমার বুঝার বয়স অনুযায়ী যতটুকু মনে পড়ে আর বাবা-মার কাছ থেকে যতটুকু শুনেছি, সেই মতে বলতে পারি মার্চ মাসের শুরুতেই দেশের অবস্থা যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। ৭ মার্চের পর এ কথা আরো বেগবান হয়। ২০ মার্চের পর সীমান্তবর্তী গ্রামগুলি অশান্ত হয়ে উঠে। আমরা যারা শিশু ছিলাম আমাদের বাইরে খেলাধুলার ব্যাপারেও এক ধরনের অলিখিত নিষেধাজ্ঞা ছিল। বাবাকে দেখেছি এর আগে অনেক রাতে বাজার থেকে আসত। পাড়ার দোকানগুলোতে গল্পগুজব করত। কিন্ত ইদানিং সন্ধ্যার পর পরই বাবা বাসায় চলে আসে। বাড়ি এসেই বড়দের সাথে দেশের পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করতেন। যুদ্ধ শুরু হলে আমরা কোথায় যাব, কী করব ইত্যাদি বিষয় নিয়ে। মার্চের শেষ দিকে অবস্থা শোচনীয় হয়ে উঠল। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের একদিন সকালে গ্রামে খবর এলো রসুলপুর রেল স্টেশনে আর্মি এসেছে। এখনি আমাদের গ্রামের দিকে আসছে। বিদ্যুৎ গতিতে ছড়িয়ে পড়ল এ কথা। এ কথা শুনার সাথে সাথে মুহূর্তেই সারা গ্রাম শূন্য হয়ে গেল। সবাই যার হাতে যা ছিল তা নিয়েই ছুটল পূর্ব দিকে ভারতের দলির পুকুর পাড় এলাকায়। আমাদের একটি বড় সিন্ধুক ছিল। ভারতে আসার সময় বাবা সেটি পুকুরে ফেলে দেয়। যাতে কেউ না নিতে পারে। ভারতে গিয়ে নারী-পুরুষ ছোট বড় সবাই যে যার মতো করে জঙ্গল পরিষ্কারে নেমে পড়েছে। বিকালের দিকে কিছুটা পরিস্থিতি শান্ত হলে আমার বাবা চাচারা গিয়ে বাড়ির ঘরের বেড়া ,দরজা, চাল খুলে এখানে নিয়ে এসে ঘর তুলেছে। গরু,ছাগল,হাঁস মুরগিও অনেকে এনেছে। দলির পুকুর পাড়ে আমাদের ঘরের সামনে মাটি খুঁড়ে বাংকারও করা হয়েছে। যেহেতু আমাদের বাড়ি থেকে ভারতে আশ্রয় নেওয়া বাড়িটির অবস্থা খুব বেশি দূরে না। তাই যে কোন সময় হানাদার বাহিনী এখানে এসে আক্রমণ করতে পারে। এই একটি ভয় ছিল সবার মধ্যে।
বাংলাদেশের হাজার হাজার শরণার্থীরা তাদের প্রত্যেকের গরু ছাগল ভারতে নিয়ে যায়। যেহেতু ওইখানে এগুলো রাখার কোন সুযোগ ছিল না তাই সবাই ভারতের বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করার জন্য নিয়ে যায়। হাটে বাংলাদেশি পশুর সরবরাহের তুলনায় ভারতের স্থানীয় ক্রেতা ছিল একেবারেই কম, তাই গরু ছাগলের মূল্য কমে আসে। ফলে আমার বাবা চাচারা বাজার থেকে গরু কিনে এনে জবাই করে ভাগ দিয়ে বিক্রি করত। যেহেতু শরণার্থী ছিল শতশত। এক পর্যায়ে আরো অনেকেই এ কাজে জড়িত হয়। বড় হয়ে বাবা মা থেকে শুনেছি, সেখানে আমাদের খাবার খুব সংকটে ছিল। কোন দিন যদি পাঞ্জাবিদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বাড়ি যেতে না পারত সে দিন অনেক কষ্ট হতো। দলির পুকুর পাড় এলাকার আশে পাশে বন জঙ্গল আর আবাদি জমি ছাড়া কোন বসতি ছিল না। তাই ভারতের শিশুদের সাথে মেশার কোন সুযোগ ছিল না। তবে যখন বড়দের সাথে বাজারে যেতাম তখন সেখানকার শিশুদের দেখেছি।
কোন দু:খজনক স্মৃতি মনে আছে কিনা জানতে চাইলে শিশু শরণার্থী দেলোয়ার হোসেন বলেন,একদিন বিকালে আমাদের গ্রামের সুজা মিয়া দুপুরের খাবার থেয়ে দলির পুকুর পাড়ে বসে বসে দাঁত খিড়াল করছে। এমনি সময় একটি বন্ধুকের গুলি এসে তার বুকে লাগে। মুহূর্তের মধ্যেই তিনি মারা যান। এই গুলিটি করা হয়েছিল আমাদের পাশের গ্রামের পাঞ্জাবিদের ক্যাম্প থেকে। পাঞ্জাবিরা প্রায় আমাদের এই আশ্রয় কেন্দ্রে গুলি চালাত,বোমা ফেলত। তাই সব সময়ই এখানকার আশ্রিত মানুষগুলো চরম আতংকের মধ্যে থাকত। দলির পুকুর পাড় সংলগ্ন এলাকায় আমরা যেখানে ঘর তুলেছি, সেখানে একটি বড় মাঠ ও একটি প্রচীন বট গাছ ছিল। ভয়ে মা যেতে দিতেন না। তবে আমি সুযোগ পেলেই বট গাছের নিচে বসে খেলা করতাম।
মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন,আমাদের শিবিরে মুক্তিযোদ্ধারা সব সময় দেখতাম বিকালে আর সকালে আসত। কারণ,সকালে তারা বিভিন্ন অপারেশনের এজেন্ডা নিয়ে আমাদের সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রাবেশ করতো আবার সকালে একই সীমান্ত দিয়ে তারা ভারত ঢুকত। দেখতে শুনতে খারাপ ছিলাম না বলে তারা আমাকে আদর করত। একটু পানি খাওয়াতে বলত।প্রায় সময় আমাদের এখানে বিশ্রাম নিত। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আমি জানতে চাইতাম আপনারা এই বন্ধুক দিয়ে কেন মানুষ মারেন। তখন তারা আমাকে বলত,তোমরা যে নিজেদের বাড়ি ঘর ফেলে এই জঙ্গলে থাকতেছ ওই মানুষগুলোর জন্য। ওরা মানুষ না। ওরা আমাদের দেশ দখল করতে চায়। ইত্যাদি বলে আমাকে বুঝাত।
দেশ স্বাধীন হওয়ার দিন বিকালেই আমরা সবাই বাড়ি চলে আসি। বাড়ি এসে দেখি আমাদের ঘরের ভিটে অনেক বড় বড় গাছ হয়ে আছে।আর আমার বাবা যে সিন্ধুকটা পুকুরে ফেলে গেছিল সেই সিন্ধুক কয়েকজন মিলিয়ে পুকুর থেকে উঠায়।
সরকারের কাছে কোন টাকা বা সুযোগ সুবিধা চান না জানিয়ে এই শিশু শরণার্থী বলেন, সরকার যেন আমাদের শরণার্থী হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয় এটাই আমার চাওয়া।