বুধবার ১ GwcÖj ২০২০


শরণার্থীদের খোঁজে… ২৩ : এখন বোনাস জীবন নিয়ে বেঁচে আছি -হাজী আবদুল গনি


আমাদের কুমিল্লা .কম :
23.03.2020

শাহাজাদা এমরান।। ভারতের বালিদোলা শরণার্থী শিবিরের কাছে যে বাজার ছিল সেখানে সব কিছু পাওয়া যেত না।একেতো বাজার ছিল ছোট তার উপর বিক্রেতাদের তুলনায় ক্রেতা ছিল কয়েকশ গুণ বেশী। তাই কাঁচা বাজারের দাম সব সময় আকাশচুম্বি থাকত। ফলে আমরা সুযোগ পেলেই কয়েক দিন পর পর কুমিল্লা এসে বাজার করে নিতাম। একদিন ধানী জমিতে কাজ করে আমরা কয়েকজন মিলে চলে আসলাম রাজগঞ্জে।বাজার করে যাওয়ার পথে গোমতী নদীর খেয়াপাড় এসে নৌকাতে উঠব এমন সময় মাঝি হাতের লগি ফেলে দিয়ে ইশারা করল পেছনের দিকে তাকান। পেছনে তাকিয়ে দেখি কয়েকজন পাঞ্জাবী সেনা বন্ধুক তাক করে রেখেছে গুলি করার জন্য। আল্লাহর রহমতে এমন সময় পাকিস্তানী অবসরপ্রাপ্ত এক ইপিআর সদস্য আমরা তাকে বিহারী নুর খাঁ হিসেবে জানি এবং চিনি। সে এসে হাজির। তিনি সেনাদার উর্দুতে কি যেন বললেন।পরে দেখলাম সেনারা বন্ধুক নামিয়ে ফেলল আর নুর খাঁ বলল,জলদি যা…।কলেমা পড়তে পড়তে গোমতী নদী পাড় হয়ে সোজা চলে গেলাম ভারতের আমাদের আশ্রয় কেন্দ্রে। এরপর দেশ স্বাধীনের আগ পর্যন্ত আর কোন দিন কুমিল্লা শহরে আসিনি। এখন মাঝে মাঝে সে দিনের কথা মনে হলে ভাবি, এখন তো বোনাস লাইফ নিয়ে আল্লাহর মেহেরবানীতে বেঁচে আছি। কথা গুলো বললেন কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার আমড়াতলী ইউনিয়নের করুনাপুর গ্রামের মো.আবদুল গনি হাজী।
পিতা হাজি মো.সাফর আলী ও মাতা ফাতেমা খাতুনের ৩ ছেলের মধ্যে তিনি সবার বড়। ১৯৪৫ সালে হাজী আবদুল গনি জন্ম গ্রহন করেন।ফকির বাজার হাই স্কুলে ৮ম শ্রেনীতে পড়ার সময়েই তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তখন তাদের নেতা ছিলেন নুরুল ইসলাম,সফিকুল ইসলামসহ ছাত্রনেতারা। শংকুচাইল,রসুলপুর ইত্যাদি এলাকায় স্বাধীনতার পক্ষে বিভিন্ন মিছিল মিটিংয়ে তিনি অংশ নিয়েছেন।
শরণার্থী জীবনে কিভাবে গেলেন জানতে চাইলে হাজি গনি জানান,২৬ মার্চ সকালে ঘুম থেকে উঠেই শুনেন চর্তুদিকে নানা ভয় আর আতংকের খবর। কেউ বলছে কুমিল্লা শহরে শত শত মানুষকে মেরে ফেলে রাখা হয়েছে আবার কেউ বলছে পুলিশ লাইন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরপর থেকেই গ্রাম জুড়ে চলছে গুজব আর আতংকের খবর। কোনটা সত্য আর কোনটা গুজব তা বের করা কঠিন হয়ে পড়ছে। আমাদের করুনাপুর গ্রামের মানুষজন কুমিল্লা শহরে যাওয়া প্রায় বন্ধই করে দিয়েছে। সবাই বিকাল আর রাত হলে বিবিসির খবর শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করত। এভাবে কয়েক দিন যাওয়ার পর সম্ভবত এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে হবে । একদিন সকালে মির্জানগর দিয়ে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী আর শালুকমুড়া দিয়ে মুক্তিবাহিনী আসতেছে। সবারই উদ্দেশ্য তৈলকুপি বাজার অবস্থান নেওয়া। কিন্তু পড়ে মুরুব্বীদের কাছে শুনেছি, মুক্তিবাহিনী হানাদার বাহিনীর শক্তি সম্পর্কে কোন পূর্ব ধারণা না নিয়ে হঠাৎ করে তাদের উপর আক্রমন চালিয়ে দেয়। ঐ দিন মুক্তিবাহিনীর তুলনায় হানাদার বাহিনীর লোকবল ছিল দ্বিগুন বেশী। ফলে কিছুক্ষণ পরেই মুক্তিবাহিনী র মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। এই যুদ্ধে অসংখ্য লোক মারা যায়। মির্জানগর,রঘুরামপুর,করুণাপুর ও ইলাশপুরের অসংখ্য বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। গ্রামের চর্তুদিকে যখন পাকিস্তানীরা আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে তখন আমার বাবা মা বলল,সামনের দিকে দৌঁড় দে। সীমান্তবর্তী গ্রাম হিসেবে ভারতের সীমান্তবর্তী স্থান গুলো আমাদের ভাল চেনা আছে। তাই আমরা প্রথমে ফুলকুমারী এলাকায় যাই। এখানে থাকা সম্ভব না ভেবে বাবা বললেন না,বাতাদোলা শরণার্থী ক্যাম্পেই চলে যাই। এই বাতাদোলা শরণার্থী শিবির ক্যাম্পে আমাদের জন্য একটি ঘর দেওয়া হল। উপরে ছনের চাল আর বেড়া ছিল ঘরে। ২ দিন পরেই আমরা রিলিফ পাবার কার্ড পেয়ে যাই। আমাদের এই ক্যাম্পে প্রায় ২ হাজার শরণার্থী ছিল। এখানে বিশুদ্ধ খাবার পানির অভাবে প্রায় ৫০/৬০ জন শিশু ডায়রিয়ায় মারা যায়। এই বাতা দোলা ক্যাম্পে এক মাস থাকার পর আমরা চলে যাই ভৈরবপুরি ক্যাম্পে। এখানেও চিকিৎসার অভাবে অনেক মানুষ মারা যায়।
একদিন আমার ভাতিজা আবদুস সাত্তারসহ আমরা ৩ জন সিদ্ধান্ত নেই বাড়ি গিয়ে পুকুরে বড়শি দিয়ে মাছ ধরে আনব। পাকিস্তানী বাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষন করে আল্লাহর নাম নিয়ে ভৈরবপুর শরণার্থী ক্যাম্প থেকে আমরা বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই । বাড়িতে গিয়ে সবেমাত্র পুকুরে বড়শি ফেলেছি এমন সময় চর্তুদিক থেকে বৃষ্টির মত গুলাগুলি শুরু হয়েছে। অসংখ্য গুলি আমাদের তিনজনের বামে ডানে মাথার উপর দিয়ে গেছে। আমরা মাটিতে শুয়ে পড়ি। সেদিন ভাবিনি বাঁচব। কিন্তু কথায় আছে রাখে আল্লাহ মারে কে, আর মারে আল্লাহ রাখে কে ? কথাটির শতভাগ ফল পেলাম সেদিন। একপর্যায়ে গোলাগুলি বন্ধ হলে আমরা ভারতের ক্যাম্পে চলে যাই।
কবে দেশে আসলেন জানতে চাইলে শরণার্থী হাজী আবদুল গনি জানান,দেশ স্বাধীন হওয়ার দিন বিকালেই আমরা দেশে চলে আসি। শুধু আমরা না। আমাদের করুণাপুরের সবাই ১৬ ডিসেম্বর দেশে চলে আসেন। বাড়িতে আমাদের কয়েকটি ঘর ছিল। আমাদের একটি ঘর ছাড়া সব ঘর পুড়িয়ে ফেলছিল হানাদার বাহিনী। যে ছোট ঘরটিতে সময়ে সময়ে এসে সরাইল এর পীর সাহেব মাওলানা ইসহাক হুজুর থাকতেন আল্লাহর মেহেরবানীতে সেই ঘরটি পুড়ে নাই।
আগামীর কোন স্বপ্ন আছে কিনা জানতে চাইলে হাজী গনি জানান,জীবন তো প্রায় শেষ। এই জীবনে এখন আর কি স্বপ্ন দেখবো। তবে একটি কথা বলতে চাই,স্বাধীনতার এত বছর পর আপনিই একমাত্র সাংবাদিক যিনি ৭১ সালে ঘটে যাওয়া আমাদের দু:খ কষ্ট গুলো জানতে এসেছেন সেই জন্য আপনাকে ধন্যবাদ জানাই। সরকারকে শুধু বলতে চাই,আপনারা তো কত রকম স্বীকৃতিই কতেকজনকে দেন। শরণার্থী হিসেবে আমাদেরও একটু স্বীকৃতি দেন না। যাতে আমরা একটু সম্মান নিয়ে মরতে পারি।