বুধবার ১ GwcÖj ২০২০


শরণার্থীদের খোঁজে… ২৪ : গুলি আমার পেটের ডান দিকে ঢুকে বাম দিক দিয়ে বের হয়ে যায়-রফিজ মিয়া


আমাদের কুমিল্লা .কম :
24.03.2020

শাহাজাদা এমরান।। শরণার্থী শিবির থেকে এসে আমরা আমাদের জমিতে কৃষি কাজ করতাম। একদিন দুপুর প্রায় ১২টার দিকে হবে জমিতে কাজ করছি আমি,ভাতিজা তোতা মিয়া,আমাদের গ্রামের মজিব মিয়া,মফিজ মিয়া,সিদ্দিক মিয়াসহ আমরা ১০/১২জন কৃষক। এমন সময় আমাদের জামবাড়ি এলাকা থেকে হঠাৎ একটি গুলি এসে আমার পেটের বাম দিক দিয়ে ডুকে আর ডান দিক দিয়ে বের হয়ে যায়।গুলির শদ্ধে কাজ ফেলে আমার সাথে যারা ছিল সবাই ভারতের দিকে দৌঁড়াতে লাগল সাথে আমিও।মাত্র কয়েক মিনিট দৌঁড়ানোর পরই আমি জমিতে লুটিয়ে পড়ি।জমি রক্তে লাল হয়ে যায়। আমার পেছনে ছিল ভাতিজা তোতা মিয়া।তখন সে চিৎকার দিয়ে সাথের সবাইকে আমার কাছে নিয়ে আছে। পরে আমাকে ধরে ইলাশপুর গ্রামের পালোয়ান পুকুরে নিয়ে যায়।হানাদার বাহিনীর ভয়ে সেখানে তখন কোন মানুষজন ছিল না। তারা আবার আমাকে কোলে নিয়ে ছুটে যায় ভারতে আমাদের শরণার্থী শিবিরের দিকে। আমার তখন কোন হুশ ছিল না। প্রথমে ভারতের নাওধরা নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে আগড়তলা পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে গিয়ে দেখি প্রফেসর খোরশেদ আলম স্যার। স্যার আমার পরিচয় পেয়ে সাথে সাথে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বলে সর্বচ্চো চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেয়। যেহেতু আমার গুলি পেট থেকে বের হয়ে গেছে সেজন্য আল্লাহর রহমতে আমি বেঁচে যাই।চার দিনের মধ্যে আমি কিছুটা সুস্থ হয়ে শিবিরে চলে আসি।খোরশেদ আলম স্যারের কথায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমাকে হাসপাতালের গািড় দিয়ে শরণার্থী শিবিরে দিয়ে যায়। কথাগুলো বললেন কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার জামবাড়ি এলাকার বাবরু মিয়া ও জেবুন নেছার ছেলে মো.রফিজ মিয়া। তিনি বর্তমানে ৭৫ বছরের বৃদ্ধ।
শরণার্থী মো.রফিজ মিয়া ১৯৪৫ সালে জন্ম গ্রহন করেন। পিতা মাতার তিন ছেলে ও ও এক মেয়ের মধ্যে তিনি সবার ছোট ছিলেন। পরিবারের বিভিন্ন অভাব অনটনের কারণে প্রাইমারী গন্ডি পাড় হতে পারেননি। তাই ছোট কাল থেকে কৃষি কাজে নিজকে সম্পৃক্ত করেন।
১৯৭১ সালের উত্তাল দিনগুলি সম্পর্কে জানতে চাইলে রফিজ মিয়া বলেন,১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর থেকেই স্বাধীনতার আন্দোলন সংগ্রাম কথাগুলো দেশ ব্যাপী প্রচার হতে থাকে। তখন থেকেই গ্রামে গঞ্জে স্বাধীনতার পক্ষে জনমত সংগঠিত করতে থাকে নেতারা। ৭১ সালের ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষনের পরই গ্রামে গ্রামে শুরু হয় স্বাধীনতার পক্ষে মিছিল মিটিং ও কমিটি গঠন ।তখনই আমাদের গ্রামের সবাই বলাবলি করত, যে কোন সময় দেশে যুদ্ধ লেগে যাবে। যার কারণে গ্রামে তখন কোন বিয়ে শাদির পর্যন্ত কোন অনুষ্টান করা হতো না। যে কোন সময় যুদ্ধ লেগে যেতে পারে এই ভেবে গ্রামের সকল অনুষ্ঠান বাদ দিয়ে দিত।

যখন যুদ্ধ শুরু হল তখন আমার স্ত্রী রূপিয়া খাতুন সাত মাসের অন্ত:সত্তা ছিল। ২৫মার্চ রাতে কুমিল্লা আক্রমনের পর ২৬ মার্চ সকাল থেকেই শুরু হয় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সীমান্তবর্তী গ্রাম গুলোতে টহল। তখন এপ্রিল মাস। সম্ভবত সেদিন ছিল প্রথম রোজা। হঠাৎ করে খবর এলো বাশমঙ্গল দিক দিয়ে হানাদার বাহিনী গ্রামে ঢুকছে। একটু পড়েই জামবাড়ি এসে আক্রমন করবে। এ কথা শুনে আমরা যে যেভাবে ছিলাম সেই ভাবেই দৌঁড় দিলাম। তখন আমি খালি গায়ে ছিলাম। সবাই দোঁড়াচ্ছে কিন্তু আমার ৭ মাসের অন্ত:সত্তা স্ত্রী তো জোড়ে হাঁটতেও পারছে না।আহ! সেদিন কত কষ্ট করে যে, সীমান্ত পাড় হয়েছিলাম মহান আল্লাহ তা ভাল জানেন। আমরা সকাল ৯টার দিকে ভারতের ত্রিপুরার নাওধারা এলাকায় গিয়ে উঠি। নাওধারা এলাকাটি স্বীকৃত কোন শরণার্থী শিবির ছিল না। আমাদের জামবাড়ি গ্রাম আর ভারতের নাওধারা এলাকাটি হল পাশাপাশি । যার ফলে আমরা সেখানে গিয়ে ঘর উঠিয়ে থাকি। আর ক্যাম্প বাজার থেকে রিলিফের মাল নিয়ে আসতাম। এই আশ্রয় শিবিরেই আমার বড় ছেলে জন্ম গ্রহন করে। ভারতের বাজার গুলোতে তখন শাক সবজির দাম ছিল অনেক বেশী। যার কারণে আমরা বেশীর ভাগ বাজার করতাম আমাদের এলাকায় এসে।নাওধারায় মুক্তিযোদ্ধারা এসে আশ্রয় নিতেন, বিশ্রাম নিতেন। এ কারণে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী প্রায়ই আমাদের নাওধারায় বোমা বিস্পোরণ ঘটাত। একদিন তো আমরা সবাই এক সাথে মারা যেতাম। যদি না বোমটি আর একটু পেছনে না পড়ত।
মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কখনো দেখা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে মো.রাফিজ মিয়া বলেন,বাবারে,মুক্তিযোদ্ধাদের যদি আমরা সহযোগিতা না করতাম তাহলে দেশ স্বাধীন হতে আরো অনেক সময় লাগত। তারা যখন ভারত থেকে যুদ্ধ করতে দেশে প্রবেশ করেছে তখন এর আগে আমরা রাস্তাঘাট সম্পর্কে তাদের ধারণা দেই। কখনো জীবনের বিনিময়ে হানাদার বাহিনীর গতিবিধি যেনে মুক্তিযোদ্ধাদের অবহিত করি। আবার যুদ্ধ শেষে মুক্তিযোদ্ধারা যখন আবার এই সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে তখনি অনেকেই আহত অবস্থায় আসত। ক্ষুধার্থ থাকত। আহত যোদ্ধাদের আমরা সেবা দিয়েছি। আমাদের যা ছিল তা দিয়েই ক্ষুধার্থ মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করেছি।
কবে দেশে আসলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, যে দিন কুমিল্লা মুক্ত হল সেই দিন ৮ ডিসেম্বর দুপুরেই আমরা বাড়ি চলে আসি। বাড়ি এসে দেখি আমাদের মাটির ঘরটির একটি ওয়াল ভেঙ্গে ফেলেছে আর অন্য দুটি দোচালা ঘর পুড়িয়ে ফেলেছে।
মো.রাফিজ মিয়া তার কথা শেষ করলেন সরকারের কাছে একটি দাবি জানিয়ে। দাবিটি হল সরকার যেন শরণার্থীদের সরকারী ভাবে স্বীকৃতি প্রদান করে।