বুধবার ১ GwcÖj ২০২০


শরণার্থীদের খোঁজে… ২৫ ; মটর সাইকেল দিয়ে আহতদের হাসপাতালে নেন বাচ্চু ভাই -দুলাল চন্দ্র দে


আমাদের কুমিল্লা .কম :
25.03.2020

শাহাজাদা এমরান।। শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত বাসায় থাকতে চেয়েছিলাম। কিন্তু যখন দেখলাম যে, কুমিল্লায় থাকলে আর জীবন বাঁচাতে পারব না , তখন এক প্রকার বাধ্য হয়েই দেশ ছেড়ে ভারতে গিয়ে শরণার্থী জীবন ধারণ করি। কিন্তু ভারত গিয়েও আমরা বসে থাকিনি।ওখানে গিয়ে আমাদের ৮/১০ জনের একটি গ্রুপ হয়। আমাদের এই গ্রুপটি ত্রিপুরা রাজ্যের বিভিন্ন ক্যাম্প ঘরে ঘুরে নানা রকম কাজ করতাম। বিশেষ করে যারা রিলিফ বিতরণ করেছে তাদের আমরা সবচেয়ে বেশী সাহায্য করেছি।অনেক সময় অনেককে আমরা মাপে কিছুটা বেশী দিতাম। এজন্য সংশ্লিষ্টদের বকাও খেয়েছি। এ কথা গুলো জানালেন কুমিল্লা নগরীর বজ্রপুর ইউছুফ হাই স্কুল রোডের ধীরেন্দ্র চন্দ্র দে ও হিরন প্রভা দে’র ছেলে দুলাল চন্দ্র দে।
পিতা মাতার ৪ ছেলে ও ৬ মেয়ের মধ্যে দুলাল চন্দ্র দে সবার বড়। ১৯৪৯ সালের ২০ অক্টোবর তিনি জন্ম গ্রহন করেন। দেশে যখন স্বাধীনতার আন্দোলন শুরু হয় তখন তিনি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারী কলেজের ¯œাতক পর্যায়ের ছাত্র।
শরণার্থী জীবনে যাওয়ার আগে কুমিল্লার অবস্থা জানতে চাইলে দুলাল চন্দ্র দে বলেন, তখন আমি ভিক্টোরিয়া কলেজে ডিগ্রীতে পড়ি। সে সময় আমাদের ছাত্র নেতা ছিল অধ্যক্ষ আফজল খান,অধ্যক্ষ আবদুর রউফ,নাজমুল হাসান পাখি,আলহাজ্ব মো. ওমর ফারুকসহ আরো অনেকেই। তবে ওমর ফারুক ছাত্রলীগ করতেন না। তিনি ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নে।
তখন কুমিল্লার রাজনীতির সকল কেন্দ্রবিন্দু ছিল ভিক্টোরিয়া কলেজ কেন্দ্রিক। ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্ররাই বিভিন্ন ভাবে ভাগ হয়ে সারা জেলায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। মার্চ মাসের শুরুতেই বলা যায় দেশ চলছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথায়। ৭ মার্চের পর কুমিল্লা শহরের প্রায় প্রত্যেকের ঘরে ঘরে ছিল কালো পতাকা। এ সময় চলে যুদ্ধের প্রস্তুতি।২৫মার্চ রাত প্রায় ১২টার সময় মধুমিতা সিনেমা হলের পাশে অবস্থিত মা ফার্মেসীর মালিকের ছেলে আমার বন্ধু নীতেন্দ্র চন্দ্র সাহা ভুলু এসে জানাল,দুলাল কি করছ। শহরের অবস্থাতো খুব খারাপ। চর্তুদিকে গুলাগুলি হচেছ। এত রাতে ভুলুর আওয়াজ শুনে ঘর থেকে বের হয়ে পাশের বাসার নারায়ন চন্দ্র দে,বাবুল কর্মকার,নির্মল চন্দ্র দে আমার রুমে আসেন। পরে আমরা সবাই মিলে রাজগঞ্জ চৌমহনীতে যখন আসি তখন রাত সাড়ে ১২টা বেজে যায়। রাজগঞ্জ এসে দেখি কিছু আওয়ামীলীগ কর্মীর হাতে লাঠি। তারা খুবই উত্তেজিত অবস্থায় ছিল।তখন আমরা এখান থেকে হাঁটতে হাঁটতে চলে আসি কান্দিরপাড় লির্বাটি সিনেমা হলের সামনে। তখনো পুলিশ লাইনের দিকে বিকট শব্দে থেমে থেমে গুলির আওয়াজ আসছে। কান্দিরপাড় আমানিয়া রেস্ট হাউজের সামনে আর টাউন হল সুপার মার্কেটে সামনে দেখলাম অনেক মানুষের জটলা। সবার মধ্যেই চরম আতংক।পুলিশ লাইন কি হইতেছে,সব কিছু শেষ করে দিচেছ,এ দিকে আসবে নাতো এই ছিল আতংকিত মানুষের কথা বার্তা। রাত একটার উপর হয়ে গেছে। দেখলাম আস্তে আস্তে উৎসুক মানুষও কমতে শুরু করল। আমরা আবার বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। মাতৃভান্ডার মিষ্টির দোকানের সামনে আসতেই দেখলাম সার্কিট হাউজ থেকে আর্মির একটা জিপ গাড়ি খুব দ্রুত বেগে চালিয়ে আমাদের সামনে দিয়ে পুলিশ লাইনের দিকে যাচ্ছে। এতে আমরা খুব ভয় পেয়ে গেলাম। এরপর বর্তমান মনোহরপুরে অবস্থিত সোনালী ব্যাংকের বিপরীত গলি দিয়ে মুন্সেফ বাড়ি হয়ে রাত ২টা ৩০ মিনিটের দিকে বাসায় যাই।বাসায় আসার কিছুক্ষণ পরই শুনতে পাচ্ছি শুধু পুলিশ লাইন না সারা শহরেই গুলাগুলি শুরু হয়ে গেছে। ভগবানের কৃপায় আমরা বেঁচে যাই। আমরা আর কিছুক্ষন কান্দিরপাড় থাকলেই হয়তো মারা যেতাম।
২৬ মার্চ সকালে বাবা ঘুম থেকে উঠেই বললেন,কি করবি এখন। কুমিল্লায় থাকলে তো বাঁচবি না। বাবাকে বললাম, বাবা আর কয়েকটা দিন অপেক্ষা করি দেখি কি হয়। এর মাত্র কিছুক্ষণ পরই মানে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে আমাদের বাসার সামনে দিয়ে একজন পাকিস্থানী আর্মি অফিসার জিপ গাড়িতে করে গুলি গুলি করতে করতে চকবাজারের দিকে চলে যায়। এতে পুরো এলাকা আতংকিত হয়ে পড়ে। পড়ে বেলা বাড়ার সাথে সাথে সারা শহর থেকে খবর আসতে ছিল গত রাতেই গুলাগুলিতে শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে অসংখ্য লাশ পড়ে আছে আর আহত অবস্থায়ও আছে অসংখ্য মানুষ। নিহতদের মধ্যে যাদের নাম এখন স্মরণ আছে তারা হলেন,কেডি রায়, নিতাই চন্দ্র সাহা,পিয়ারী সাহা,প্রিয় লাল ঘোষ প্রমুখ। তখন নানুয়া দিঘির পাড়ের ইকবাল আহমেদ বাচ্চু ভাই। তার একটি ৫০সিসি মটর সাইকেল ছিল। তিনি এই মটর সাইকেল দিয়ে সারা শহর ঘুরে ঘুরে আহত মানুষদের সদর হাসপাতালে এনে চিকিৎসা করান। আজ আমি শেষ বয়সে এসে এ কথা নির্দিধায় বলতে পারি,সেদিন কুমিল্লা শহরে আর একটি লোকও দেখিনি যারা এমন সাহসী কাজ করতে পারে। সেদিন যদি কমান্ডার ইকবাল আহমেদ বাচ্চু ভাই এগিয়ে না আসতেন তাহলে সেদিন কুমিল্লা শহরে শহীদের তালিকা অনেক অনেক দীর্ঘ হতো। চোখের সামনে কি অসীম সাহসী ভূমিকা নিয়েছিলেন বাচ্চু ভাই তা ভাবতে আজো মনে শিহরণ জাগে। এই ইকবাল আহমেদ বাচ্চু ভাই পরে বিবির বাজার এর একটি সম্মুখ যুদ্ধে আহত হন।
২৮ মার্চ দুপুরে কার্ফু শিথিল হলে রাজগঞ্জ যাই। গিয়ে দেখি একটা আর্মি ভর্তি ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের দেখে বললেন তোমাদের এখানে কি। চলে যাও।
এপ্রিলের ১ তারিখে একটি ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে দুলাল চন্দ্র দে জানান,সম্ভবত সকাল ১০টা ১১টা হবে। রাজগঞ্জ বাজারের সুরুজ মিয়ার দালানের নিচে একটি টেবিলের উপর ৫/৭ জন কে বসিয়ে গুলি করা হয়। এতে একজন ড্রেনে পড়ে অল্পের জন্য বেঁচে যান আর অন্যরা ঐখানেই মারা যান। এই দৃশ্য দেখে সিদ্ধান্ত নিয়েছি না আর এক মুহুর্তও দেশে থাকা যাবে না।
২ এপ্রিল সকাল ৭টার সময় আমরা বজ্রপুরের বাসা থেকে রওয়ানা দেই। সাথে ছিল আমার ৬ বোন,মাসি,বন্ধু ভুলু ও আমি।মা আর বাবা বাসাতেই রইল। চোখের পানিতে বুক ভাসিয়ে তারা আমাদের বিদায় দেন। রাজগঞ্জ দিয়ে যখন গোমতী নদীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম তখন আত্মার ভিতর এক ফোটাও জল ছিল না। আমার বোন গুলোর জন্য বেশী ভয় পেয়েছিলাম। আমরা পাকিস্থানী হানাদারদের গতিবিধির খবর নিয়েই বাসা থেকে বের হই। গোমতী নদীতে খেয়া পাড় হয়ে মাঝিগাছা দিয়ে আমরা সীমান্ত পাড় হই। একটা কথা না বললে অন্যায় হবে। রাস্তায় রাস্তায় বিভিন্ন বাড়িতে বাড়িতে আমাদের জন্য চা বিস্কুট জলের ব্যবস্থা ছিল। এটা শুধু আমাদের উদ্দেশ্যে না। গোমতী নদীর পর আর ভারত সীমান্তের সোনামুড়া যাওয়ার আগ পর্যন্ত যত গুলো গ্রাম পড়েছে প্রত্যেক গ্রামের কোন না কোন বাড়িতে সে দিন দেখেছি শরণার্থীদের বিশ্রাম,বাথরুম করা,হাল্কা নাস্তা করার ব্যবস্থা করেছিল। এতে তাদের বিপদ হবে জেনেও সে দিন এই গ্রামবাসীরা দেশের জন্য এত বড় ত্যাগ স্বীকার করেছিল। কে হিন্দু আর কে মোসলমান,বৌদ্ধ কিংবা খ্রীষ্টান তা জানতে চায়নি। গ্রামের মানুষের সে দিনের ভালবাসা আমার আজীবন মনে থাকবে। গোমতী নদী পাড় হতেই দেখি শত শত মানুষ মিছিলের মত রাস্তায়। সবার গন্তব্য একটাই, ভারত। সন্ধ্যা নাগাদ আমরা সোনামুড়া গিয়ে পৌঁছলাম। এখানে গিয়ে রাতে একটি থাকার জায়গায় পেলাম। পরদিন সকালে সোনামুড়া থেকে মেলাঘর যাই। মেলাঘরে থাকলেও প্রতিদিন আমরা সোনামুড়া আসতাম।এখানে আমরা ৭/৮ জনের একটি গ্রুপ করে ফেলি। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী গ্রাম গুলো থেকে যারা এসেছে তারা প্রতিদিন সকালেই তাদের জমি থেকে বিভিন্ন শাকসবজি নিয়ে আসত। আমাদের কাজ ছিল তাদের থেকে কিছু কিছু রেখে এক সাথে অনেক গুলো জমিয়ে দুপুরের দিকে শরণার্থী ক্যাম্পে যাদের কিছু নেই তাদের মধ্যে বিলি করতাম। পরে মেলাঘর ক্যাম্প থেকে চলে যাই উদয়পুর ক্যাম্পে। মেলাঘরে খুব ভাল ভাবেই ছিলাম। একটি গ্রুপ তৈরী করে শিবিরে শিবিরে নেতৃত্ব দিতাম। কিন্তু যেহেতু মেলাঘর ছিল সীমান্তবর্তী ক্যাম্প তাই প্রতিদিনই এখানে গুলাগুলির আওয়াজ শুনতাম। তাই সব সময় ভয় ভয় লাগত। ভাবলাম,জীবন বাঁচাতে দেশ থেকে ভারত আসলাম মা বাবাকে ফেলে এখানে যদি এখন মারা যাই তাহলে তো লাশটাও বাবা মা দেখবে না। তাই চলে গেলাম উদয়পুর ক্যাম্পে। এই ক্যাম্পে প্রায়ই আসতেন আফজল খান,আনসার আহমেদসহ বড় বড় নেতারা। তাই উদয়পুর আসার পর আর কোন ভয় লাগেনি। আমি কোন সময়ই অবসর থাকতে পারি না। তাই উদয়পুর ক্যাম্পে এসে যারা রিলিফ দেয় তাদের বললাম,আমি আপনাদের সাথে কাজ করি। একথা শুনে তারা তো মহা খুশি। আমার দায়িত্ব ছিল রিলিফের চাল ডাল গুলো মেপে মেপে দেওয়া। আমাকে ইশারা ইঙ্গিতে বলত,আমি যেন মাপে কিছুটা কম দেই।আমি সব সময়ই বেশী বেশী দিতাম। এতে ডিলার প্রায়ই আমাকে বকতেন। তারপরও আমি তার কথা শুনতাম না। কারণ,আমি মনে করি আমিও যেমন শরণার্থী তারাও শরণার্থী। কেন তাদের কম দেব। তারা তো আমার মত বিপদে পড়েই নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে এসেছে।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, শরণার্থী শিবিরে কলেরায় আমাদের বজ্রপুরের মনমোহন দাসের ছেলে নারায়ন চন্দ্র দাস মারা যায়। ঐ দিন যে কত কেঁদেছি আর কষ্ট পেয়েছিলাম তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। অনেক দু:খ কষ্টের মধ্যে দিয়েই অতিবাহিত করেছি শরণার্থীর দিন গুলো।
কবে দেশে আসলেন জানতে চাইলে দুলাল চন্দ্র দে বলেন, ৯ ডিসেম্বর সকালেই আমরা কুমিল্লা চলে আসি। তবে ভাল কথা হচেছ যে, কুমিল্লায় আমাদের বাড়ি ঘরে কোন অত্যাচার হয়নি । বাবা-মাকেও কিছু বলেনি।
সরকারের কাছে আমার চাওয়,া শুধু আমাদের শরণার্থীদেরই না সীমান্তবর্তী গ্রাম গুলোকেও স্বীকৃতি দিতে হবে। কারণ,স্বাধীনতা যুদ্ধে এই গ্রাম গুলোর মানুষদের অবদানও কম নয়।