রবিবার ৩১ †g ২০২০
  • প্রচ্ছদ » sub lead 1 » নিরাপত্তাহীনতায় রোগী দেখতে অনীহা কুমেক চিকিৎসকদের


নিরাপত্তাহীনতায় রোগী দেখতে অনীহা কুমেক চিকিৎসকদের


আমাদের কুমিল্লা .কম :
29.03.2020

মাসুদ আলম : করোনা ভাইরাস আতঙ্কের মধ্যে পেটে ব্যথা নিয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় গত বৃহস্পতিবার কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ (কুমেক) হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন তাসলিমা আক্তার। মেডিসিন বিভাগের মহিলা ওয়ার্ডে ভর্তি আছেন তিনি। চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ থেকে সেবা নিতে আসেন তাসলিমা। আগে একবার এই হাসপাতালে পেটের অপারেশন হয়েছেন। তার অভিযোগ দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক ও নার্সরা তার শরীর ধরে দেখছেন না। তিনদিনে দুইবার ডাক্তার এসে দূর থেকে কিছু ওষুধ এবং পরীক্ষা লিখে চলে যান। পরীক্ষাগারগুলোও বন্ধ থাকে।
মেডিসিন বিভাগের মহিলা ওয়ার্ডের ইনচার্জ শাহীন আরা জানান, এই ওয়ার্ডে ৭০টি বেড রয়েছে। তারমধ্যে বর্তমানে রোগী ভর্তি রয়েছেন মাত্র দুইজন। করোনা আতঙ্কের আগে এই ওয়ার্ডে শতাধিক রোগী সবসময় বেড নিয়ে যুদ্ধ করতেন। ফ্লোরে রোগীর জন্য হাঁটা যেত না।
এদিকে শনিবার সকালে চর্ম ও যৌন সমস্যা নিয়ে আবু জাহের নামে এক ব্যক্তি এসেছেন কুমেক হাসপাতালের বহির্বিভাগে। ডাক্তার দেখানোর জন্য ১০ টাকা দিয়ে টিকিটও কেটেছেন। গিয়ে দেখেন ১২৪ নম্বর রুমে ডাক্তার নেই। রুম বন্ধ। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই দিন বহির্বিভাগের বসা চর্ম ও যৌন রোগের কোন ডাক্তারই আসেনি।
অন্যদিকে চক্ষু রোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ মুক্তা বসেন বহির্বিভাগে। তিনি এসেই আবার চলে যাওয়ার মুহূর্তে জানতে চাইলে এই চিকিৎসক জানান, রোগী দেখার মত সুরক্ষা নেই। করোনা ভাইরাস আতঙ্কের মধ্যে ঝুঁকি এড়ানোর মত হাসপাতাল আমাদেরকে কোন সুরক্ষা দেয়নি। তাই রোগী দেখে ঝুঁকি নিতে চাইনা।
চর্ম ও যৌন এবং চক্ষু বিভাগের মত ঠিক একই অবস্থা দন্ত, ডেন্টাল সার্জন, শিশু, গাইনি, মেডিসিন, সার্জারি, শৈল্য, ক্যাজুয়ালটি এবং কার্ডিওলজি বিভাগেও। বেশিরভাগ ডাক্তারের রুমে তালা। হাতেগোনা কয়েকজন মেডিকেলে আসলেও মুখ দেখিয়ে চলে যান। সহকারীকে বলে যান ঘন্টা খানিক পর বন্ধ করে চলে যাওয়ার জন্য।
বহির্বিভাগের টিকিট কাউন্টারের ইনচার্জ আবুল কাশেম জানান, করোনা ভাইরাস আতঙ্ক তৈরির পর থেকে চিকিৎসকরা নিয়মিত না আসায় আস্তে আস্তে রোগীর সংখ্যা কমছে বহির্বিভাগে। প্রতিদিনের সেই লম্বা লাইন আর নেই। শনিবার সকাল ৮টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত মাত্র ১৬২টি টিকিট বিক্রি হয়েছে। অন্যান্য সাধারণ সময়ে এক হাজার থেকে ১২শ টিকিট বিক্রি হয়েছে। বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আসা রোগীরা টিকিট কেটে ডাক্তার না পেয়ে আবার ফিরিয়ে দিতে চাচ্ছেন।
শনিবার সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কুমেক হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বিভাগের কোন রোগী নেই। পুরুষের দুইটি এবং মহিলাদের এক ওয়ার্ড রোগীশূণ্য। বাইরে কাউন্টারে তিনজন সেবিকা বসে থাকলেও ভিতরে সুনসান নিরবতা। যন্ত্রণায় রোগীদের কাতরানোর কোনো শব্দ নেই। কর্তব্যরত চিকিৎসকদের রুম বন্ধ। মেডিসিন বিভাগে একই দৃশ্য। ডাক্তার নেই। সেবিকারা মোবাইলে ফেসবুকিং করছেন। পুরুষ এবং মহিলা ওয়ার্ড মিলে মাত্র ৫জন রোগী। সারি সারি বেড পড়ে আছে। অধিকাংশ ডাক্তারদের রুমে তালা ঝুলছে। অন্যদিকে শিশু ও নবজাতক ওয়ার্ডে কান্নার শব্দ নেই। ওয়ার্ডগুলোতে আগের মত অসুস্থ শিশু ও নবজাতক নেই বললেই চলে। সার্জারি, গাইনি এবং ক্যাজুয়ালটি বিভাগের একই দৃশ্য।
অথচ কয়েকদিন আগেও ৫০০ বেডের এ হাসপাতালের ওয়ার্ড, ওয়ার্ডের ফ্লোর ও খোলা বারান্দা, সিঁড়ির নিচ ভরে থাকত এক হাজারের বেশি রোগীতে। এমন বিপরীত চিত্রের কারণ করোনা আতঙ্ক। এ আতঙ্ক ছুঁয়েছে চিকিৎসকদেরও।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোঃ মুজিবুর রহমান বলেন, করোনা ভাইরাস সংক্রামণ রোধে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় হাসপাতালে রোগী আসতে পারছে না। মানুষের মধ্যে করোনা ভাইরাস নিয়ে আতঙ্ক কাজ করছে। রোগীদের চিকিৎসার সেবার ডাক্তারদের সকল সুরক্ষা সামগ্রী দেয়া হয়েছে। তারপরও কেন রোগীরা সেবা পাবে না। কুমেক হাসপাতালে রোগীদের টেলি মেডিসিন সেবা দিচ্ছে। বাড়িতে বসে রোগীরা সেবা নিতে পারবে।