শনিবার ৬ জুন ২০২০
  • প্রচ্ছদ » sub lead 1 » প্রসঙ্গ গণস্বাস্থ্যের কীট : তবে কেন লোক হাসালি?


প্রসঙ্গ গণস্বাস্থ্যের কীট : তবে কেন লোক হাসালি?


আমাদের কুমিল্লা .কম :
01.05.2020

নাসির উদ্দিন।।

গ্রামবাংলার বহুল প্রচলিত একটি প্রবাদ, “সেই-তো নখ খসালি, তবে কেন লোক হাসালি?” এটি যুগে যুগে কালে কালে গ্রাম শহরে দেদার ব্যবহার হচ্ছে। কবে কখন কে এর উদ্ভাবক সেটা অজানা রয়ে গেছে। তবে উক্তিটি যে যথাযথ এবং কালোত্তীর্ণ এটি বলার অপেক্ষা রাখে না। আমাদের ঔষধ প্রশাসনের গত তিনদিনের ভূমিকা; অতঃপর সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর এ উক্তিটিই বারেবারে মনে পড়েছে। গাধা যেমন ঘোলা করে তবেই জল পান করে, তেমনি ঘটনা ঘটিয়েছে ঔষধ প্রশাসন। এ ধরনের নির্লজ্জদের চশমখোর বলে প্রবোধ দেয়ার প্রচলনও যুগে যুগে চলে এসেছে। এই চশমখোরদেরই হয়তো এখন আমরা দেখছি প্রশাসনের সর্বত্র।

কেউ হয়তো বলবেন, ঔষধ প্রশাসন ফার্সি কবি জালাল উদ্দীন মুহাম্মদ রুমির, “গতকাল আমি চালাক ছিলাম তাই দুনিয়াকে পাল্টাতে চেয়েছিলাম, আজ আমি বুদ্ধিমান হয়েছি, তাই আজ নিজেকেই বদলাচ্ছি” এমন চিন্তায় উদ্ভুদ্ধ হয়েছে।
তাদের উদ্দেশ্যে বলি, আলবার্ট আইনস্টাইনের “যার জ্ঞান যত বেশি, তার ইগো তত কম। আর জ্ঞান কম, মানে ইগো বেশি” এই উক্তিটি থেকেই আমরা বুঝতে পারি এই দুর্জনেরা প্রকৃতই কোন প্রকৃতির।

গতকালই আমরা দেখেছি, করোনার ব্যাপকতার ব্যাপারে আশংকা প্রকাশ করেছে সরকার গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটি। তারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে জরুরি ভিত্তিতে ৫ লাখ (পিসিআর) কীট সংগ্রহের তাগিদ দিয়েছে। একইদিন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ডাঃ নাসিমা সুলতানা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, সরকারের কাছে মাত্র ১ লাখ কীট রয়েছে। আমরা জানি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু দেশ প্রতিদিনই ১ লাখ বা তার-ও বেশি লোকের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করছে। জনসংখ্যা ও জনঘনত্বের বিচারে বাংলাদেশেও একই পথ অবলম্বন জরুরি। কিন্তু প্রস্তুতিগত দুর্বলতার কারণে আমরা দিনে ৫ হাজার লোকের পরিক্ষাও করতে পারছি না। এ অবস্থায় আমরা একটি ভয়াবহ ভবিষ্যতের অপেক্ষাই কেবলমাত্র করতে পারি।

এদিকে মানসম্পন্ন কীটের সংকট এখন বিশ্বব্যাপী। চাইলেই সহসায় কীট সংগ্রহ সম্ভব নয়। ডাঃ নাসিমা সুলতানা বলেছেন কোনো দেশই এখন লক্ষ লক্ষ কীট দিতে রাজী হচ্ছে না। চাহিদাপত্র দেয়া আছে, হয়তো ১০/২০ হাজার করে কীট পাওয়া যাবে ধীরে ধীরে। তার মানে সরকারের সামনে বিকল্প পথ খোলা নেই। তাই র‌্যাপিড টেস্টের মাধ্যমে হলেও অবস্থা সামাল দেয়ার চিন্তা থেকেই হয়তো গণস্বাস্থ্যের এই বিষ হজমে রাজি হয়েছে সরকার।

প্রশ্ন হচ্ছে সরকার, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ঔষধ প্রশাসন এই তিন দিন কেন গোঁ ধরে বসেছিল? যে অনুমোদন তিন দিন পর দেয়া হলো সেটা তিন দিন আগেই তো সম্ভব ছিলো। ঔষধ প্রশাসন তখন প্রসিডিওর এর গালভরা বুলি দিল কেন? নাকি যত গাজ্বালা এবং ইগোর মূলে ডঃ জাফরুল্লাহ। মানুষ মারা যাক তবুও গণস্বাস্থ্যকে ক্রেডিট দেয়া যাবে না। অবশেষে পরিস্থিতিই কি সরকারকে বাধ্য করলো?

তবে যে কারণেই হউক ঔষধ প্রশাসন শেষ পর্যন্ত যে পজিটিভ চিন্তা করেছে আপাতত এতেই দেশবাসীর স্বস্তি। আমাদের আশা এবং অপেক্ষা এই কীট টেস্টে উত্তীর্ণ হবে। দেশবাসী অধিকতর র‌্যাপিড টেস্টের মাধ্যমে কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবে।

কারণ আমরা দেখছি, মানুষ ঢাকার টেস্ট ল্যাবগুলোর সামনে অসহায়ের মতো টেস্টের জন্য, রিপোর্টের জন্য দিনের পর দিন হন্যে হয়ে ঘুরছে। যারা পরীক্ষা করাচ্ছে, দেখা গেছে তাদের ২০ শতাংশই আক্রান্ত। এসব মানুষ ঘুরাঘুরি করে আরও অসংখ্য মানুষকে আক্রান্ত করছে। সুযোগ সহজতর হলে লক্ষ লক্ষ মানুষকে টেস্টের আওতায় আনা যাবে। এতে মানুষ আক্রান্ত হবে কম।

বর্তমানে করোনা উপসর্গ নিয়ে কেউ মারা গেলে তার লাশ পরীক্ষার ব্যাপারে প্রশাসনকে অধিক তৎপর দেখা যায়। কারণ মৃতব্যক্তি করোনা ছড়াবে। অথচ আইইডিসিআর মানুষকে জীবিত ও সুস্থ রাখার ব্যাপারে ততটা তৎপর হচ্ছে না। তাহলে রাষ্ট্রের কাছে সাধারণ মানুষ কি লাশের চেয়েও মূল্যহীন? মৃতরাই কি কেবল রোগ ছড়ায়? করোনা নিয়ে যারা লোকালয়ে চষে বেড়াচ্ছে, তারা কি রোগ ছড়াচ্ছে না? তাদের ব্যাপারে কি রাষ্ট্রের দায় নেই? নাকি অস্বাভাবিক মৃত্যুর এই পথ খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার?
লেখক :রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দৈনিক প্রথম আলোর কুমিল্লার সাবেক নিজস্ব প্রতিবেদক।