শনিবার ৬ জুন ২০২০


৮৫ ভাগ পৌরসভায় বেতন বাকি


আমাদের কুমিল্লা .কম :
10.05.2020

নিউজ ডেস্ক।।
করোনা সংক্রমণের মধ্যেও কাজ করছেন বিভিন্ন পৌরসভার কর্মকর্তা কর্মচারীরা। কিন্তু এই পরিস্থিতিতেও তারা ঠিকমতো বেতন পাচ্ছেন না। গত দুই মাস থেকে সাড়ে ৫ বছর পর্যন্ত বেতন বকেয়া রয়েছে সিংহভাগ পৌরসভার কর্মীদের। বেতন-ভাতা না পেয়ে সংস্থাগুলোর প্রায় ৩৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এখন রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বেতন-ভাতার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এদিকে করোনা পরিস্থিতিতে রাজস্ব আদায়ে ধসসহ নানা কারণে অধিকাংশ পৌরসভার আয়ের উৎস না থাকায় এমন পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। আর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইন লঙ্ঘন করে রাজনৈতিক বিবেচনায় পৌরসভাগুলো প্রতিষ্ঠা করার কারণে এর কাঠামো ভেঙে পড়েছে।
বাংলাদেশ পৌরসভা সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, বর্তমানে দেশে ৩২৮টি পৌরসভা রয়েছে। এরমধ্যে ৮৫ ভাগ পৌরসভায় ২ হতে ৬৫ মাস পর্যন্ত বেতন ভাতা বকেয়া রয়েছে। এই সমস্যাটি দীর্ঘদিনের হলেও বর্তমানে নুতন করে যুক্ত হয়েছে করোনা পরিস্থিতি। ভাইরাসটির প্রভাবে বর্তমানে সবকটি সংস্থায় রাজস্ব আদায়ে ধস নেমেছে। এসব কারণে নাগরিক সেবায়ও প্রভাব পড়ছে বলে জানিয়েছে পৌরসভা সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। তাই সংস্থাগুলোতে কর্মরত ৩৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

তারা জানিয়েছেন- সড়কবাতি নিশ্চিত করা, সুপেয় পানি সরবরাহ, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, মশক নিধন, স্বাস্থ্য সেবা, দুর্যোগে খাদ্যসহায়তা, আর্থিক সাহায্য, ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ উন্নয়ন, রাজস্ব সংগ্রহ, নাগরিক সনদ প্রদান, ট্রেড লাইসেন্স, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনসহ প্রায় ৭০ রকমের সেবা দিয়ে থাকে পৌরসভা। এসব সেবাসহ উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়ন করার পর যে অর্থ অবশিষ্ট থাকে, তা দিয়ে কোনোভাবেই বেতন -ভাতা দিতে পারেন না পৌর কর্তৃপক্ষ।
জানা যায়, পৌরসভায় স্থায়ী ও মাস্টাররোল মিলিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন ৩৫ হাজারের বেশি। এতে জনপ্রতিনিধি সম্মানী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ বছরে প্রয়োজন প্রায় ১ হাজার ২৪৯ কোটি টাকা। কিন্তু সংস্থাগুলোর সর্বোচ্চ রাজস্ব আয় হচ্ছে ১ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে গিয়ে পৌরসভাগুলোর রাজস্ব আয় দিয়ে বেতন-ভাতা, সম্মানী পরিশোধ না করে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন জনপ্রতিনিধিরা। এতে দিন যত যাচ্ছে, তত বকেয়ার পরিমাণ বাড়ছে। তবে সরকার পৌরসভায় অনুন্নয়ন খাতে বছরে একটি বরাদ্দ দিয়ে থাকে, কিন্তু তা বেতন-ভাতার এক ভাগেরও কম।
বাংলাদেশ পৌরসভা সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ম. ই তুষার বলেন, ‘জনসাধারণের সার্বিক সেবা দানের খাতগুলো মূলত রাজস্ব আদায়ের ওপর নির্ভর করে। সে কারণেই বেতন-ভাতা বকেয়া থেকে যাচ্ছে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। যারা অবসরে গেছেন, তাদের অবসর ভাতাও দিতে পারছেন না। বেতন-ভাতা প্রাপ্তির স্থায়ী সমাধানের জন্য দীর্ঘদিন ধরে আমরা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে আনতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করলেও কোনও কাজে আসেনি। সরকার আয়ের খাতগুলো বৃদ্ধি করে দিলে অথবা জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের আদলে তহবিল থেকে কর্মীদের বেতন-ভাতা প্রদান করলেই এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। তাই আমরা দাবি করেছি, আমাদের বেতনভাতা যাতে সরকারি কোষাগার থেকে দেওয়া হয়।’
স্থানীয় সরকার বিভাগ সূত্রে জানা যায়, পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা নিয়ে বিদ্যমান সমস্যা এবং এর সমাধানের বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (নগর উন্নয়ন) মো. মাহবুব হোসেনকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি এরই মধ্যে সরকারের কাছে তাদের সুপারিশ জমা দিয়েছে। গঠিত কমিটি পৌরসভার আয় বাড়ানো সাপেক্ষে বেতন দেওয়ার সুপারিশ করেছে। কারণ, স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন অনুযায়ী পৌরসভাগুলোকে নিজস্ব আয় দিয়ে চলতে হবে। সরকারের আইনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই বলেও কমিটি তাদের মতামতে জানিয়েছে।

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘দেশের পৌরসভাগুলোর নিজস্ব আয়ের তেমন কোনও উৎসও নেই। আইন লঙ্ঘন করে রাজনৈতিক বিবেচনায় গ্রামীণ অনেক এলাকাকে পৌরসভা গঠন করা হয়েছে, যে কারণে এসব সমস্যাগুলো দেখা দিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হলে পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা নিয়মিত পরিশোধ করতে হবে। নইলে তারা কাজে মনযোগ দেবে না।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিভাগের মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আইন অনুযায়ী পৌরসভাগুলো তাদের আয় থেকে ব্যয় নির্বাহ করবে। এখন তারা আয় করতে পারছেন না, তাই ব্যয় নির্বাহ হচ্ছে না। আমরা পৌরসভাগুলোর আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছি। তাদের আয় থেকেই ব্যয় নির্বাহ হবে।’
এদিকে, করোনার বিস্তার রোধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, ত্রাণকাজ পরিচালনা, পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধসহ বিভিন্ন প্রয়োজন মেটানোর জন্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও ৫২ কোটি ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়। গত ২৬ এপ্রিল স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত আদেশ জারি করা হয়। এর মধ্যে ‘খ’ ও ‘গ’ শ্রেণির ১৩৮টি পৌরসভার জন্য পাঁচ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ হিসাবে এই শ্রেণির প্রতিটি পৌরসভার জন্য গড়ে ৩ লাখ ৬২ হাজার টাকা পড়ে।
তবে পৌরসভা সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ম. ই তুষার বলেন, ‘আমরা পত্রপত্রিকা থেকে জানতে পেরেছি বেতন-ভাতাসহ করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য এই অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মন্ত্রণালয় থেকে আমাদেরকে যে চিঠি দেওয়া হয়েছে তাতে শুধু বলা হয়েছে এই অর্থ শুধু মশক নিধন ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজে ব্যবহার করার জন্য। এখান থেকে একটি টাকাও বেতন-ভাতার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।’