বৃহস্পতিবার ৪ জুন ২০২০


ধনাঢ্য ব্যক্তি যখন ভিক্ষুকের তালিকায় নাম লিখেন


আমাদের কুমিল্লা .কম :
14.05.2020

সৈয়দ নুরুর রহমান।।

তার রয়েছে শহরে পাঁচতলা বাড়ি।
তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক,
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক,
‘হ্যালো সুইটি মিট’ এর মালিক, জেলা রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সভাপতি, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির জেলা ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক মো. শাহ আলম।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একজন ধর্ণাঢ্য ব্যক্তি হিসেবেই পরিচিত। অথচ সরকারি এান সহায়তা দেয়ার জন্য করা হৃতদরিদ্রদের তালিকায় এই ধনী ব্যক্তি তার স্ত্রী, মেয়ে, ভাই, বোন, শ্যালক, শ্যালকের স্ত্রী, ভাইপো, বোনের দেবরসহ ১৩ স্বজনের নাম ঢুকিয়েছেন। মো. শাহ আলম একজন ওএমএস ডিলারও বটে।
এ সংবাদটি পড়ে সত্যি মুষড়ে পড়েছি। ভাব দেখে মনে হচ্ছে ওলটপালট করে দে মা লুটেপুটে খাই।
১৬ কোটির বেশি মানুষের বাংলাদেশে করোনা দুর্যোগ মোকাবেলার ক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা মনে হয় একাই লড়ছেন। দেশের করোনা সংক্রমণ রোধে সরকার যখন গরীব মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য গভীর আন্তরিকতা নিয়ে প্রাণান্তকর লড়াই করছে তখন দলীয় মুখোশধারী এই সকল দুর্বৃত্তদের অনাচার, সীমাহীন লালসা সরকারের জনবান্ধব সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে বির্তকের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অনতি বিলম্বে এদের গ্রেফতার এবং দ্রুত বিচারের আওতায় নিয়ে আসা প্রয়োজন। দু’একটি দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলে এ জাতীয় দুবৃর্ত্তপনার ঘটনা কমে আসবে- এ বিশ্বাস আপাতত রাখতে চাই।
ইতোমধ্যে কোভিড-১৯ রোধে সরকার ঘোষিত ‘সাধারণ ছুটি’-তে অবরুদ্ধ দেশে কর্মহীন হয়ে পড়া মানুষের জন্যে সরকার বিশেষ ওএমএস সুবিধা কর্মসূচি চালু করেছে। এজন্য ভিক্ষুক, ভবঘুরে, কর্মহীন, হৃতদরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের তালিকা তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে ওএমএস কার্ড।
গরিব মানুষের এ তালিকায় এ পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্বীকৃত ধনী ব্যক্তি মো. শাহ আলমের পরিবারের ১৩টি নামসহ ৯১টি ‘বিতর্কিত নাম’ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সুবীর নাথ চৌধুরী।
এই ওএমএস তালিকায় দেখা গেছে- ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার ১০ নং ওয়ার্ডের তালিকার ১৬ নম্বরে রয়েছে মো. শাহ আলমের স্ত্রী মোছাম্মৎ মমতাজ আলমের নাম, ১২ নম্বরে মেয়ে আফরোজার নাম, তার তিন ভাই-বোন মো. সেলিম, মো. আলমগীর ও শামসুন্নাহারের নাম রয়েছে ৮, ৯ ও ২৭ নম্বর ক্রমিকে। এছাড়া, তার আরেক ভাই খোরশেদ মিয়ার ছেলে নাছিরের নাম রয়েছে ৭ নম্বরে, যদিও নাছির এখন প্রবাসী। তার শ্যালক মো. তাজুল ইসলামের নাম তালিকার ৩ নম্বরে এবং শ্যালকের স্ত্রী আসমা ইসলামের নাম ৫ নম্বরে রয়েছে। তার আরেক শ্যালকের স্ত্রী মোছাম্মৎ জান্নাতুল ইসলামের নাম রয়েছে তালিকার ১০ নম্বরে। এ নেতার আরেক শ্যালক প্রবাসী শফিকুল ইসলামের নামও রয়েছে তালিকার ১৩ নম্বরে।
এছাড়া তার বোনের তিন দেবর মতিউর রহমান, মাহবুবুর রহমান, লুৎফুর রহমানের নাম তালিকার ৭২, ৭৩ ও ৭৪ নম্বর ক্রমিকে রয়েছে। স্থানীয় সাংবাদিকরা মো. শাহ আলমের কাছে গরীব দুস্থদের নামের তালিকায় তার পরিবারের সদস্যদের নাম থাকার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের জানান, এ বিষয়টা কাউন্সিলর বলতে পারবে। পৌরসভা যাচাই-বাছাই করে তালিকা চুড়ান্ত করেছে।
“তাছাড়া আমি কোনো কার্ড বণ্টন করিনি। আমি হলাম ডিলার। ডিলার কোনো কার্ড দিতে পারে না।”
তবে ওএমএস কার্ডে বিত্তবানদের নাম তোলার ব্যাপারে জানতে চাইলে পৌরসভার ১০ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকবুল হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, “এ বিষয়ে আমি সৎ পথে রয়েছি। আমার জানা মতে আমি কোনো ভুল করিনি।”
এদিকে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সুবীর নাথ চৌধুরী জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ভিক্ষুক, ভবঘুরে, হৃতদরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ, যারা কোনো সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনির অর্ন্তভুক্ত নন, তাদের জন্য এই বিশেষ ওএমএস সুবিধা চালু করা হয়েছে।
এ সুবিধায় একজন ওএমএস কার্ডধারী প্রতি মাসে ১০ টাকা কেজি দরে ২০ কেজি চাল কিনতে পারবেন। সেজন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভা এলাকায় ৯ হাজার ৬০০ জনকে দেওয়া হচ্ছে ওএমএস কার্ড।
ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের মাধ্যমে প্রথম দফায় প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে ৫০০ জনের নামের তালিকা করা হয়েছে। তিনি বলেন, “প্রথম দফার তালিকা অনুযায়ী ইতোমধ্যে ১০ টাকা কেজি দরে ২০ কেজি করে চাল পেয়েছেন তারা।”
জেলা শহরের একটি পাঁচতলা বাড়ির মালিক মো. শাহ আলমের ওই ১৩ জন আত্মীয়সহ বিতর্কিত ৯১ জনই প্রথম দফার চাল তুলেছেন বলে জানিয়েছেন সুবীর নাথ চৌধুরী। খাদ্য নিয়ন্ত্রক জানান, তালিকা থেকে ঐ নেতার পরিবারের লোকজনসহ ৯১ জন সামর্থ্যবানের নাম বাদ দেয়ার জন্যে চিঠি দিয়ে পৌর মেয়রকে নির্দেশ দিয়েছেন জেলা ওএমএস কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক মো. হায়াত উদ দৌলা খান। ওএমএস তালিকায়
শাহ আলমের পরিবার-পরিজনের নাম থাকার কারণে জেলা প্রশাসক ইতোমধ্যে মো. শাহ আলমকে শোকজ (কারন দর্শানোর নোটিশ) করেছেন।
মুলত যাদেরকে এই তালিকা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তারাই প্রকৃতদের নাম এড়িয়ে তাদের পছন্দের লোকদের নাম দিয়েছে। এতে করে যে উদ্দেশ্যে যাদের জন্য সরকার এ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে তারাই বঞ্চনার শিকার হবে।
লেখক :সাবেক সাধারণ সম্পাদক,কুমিল্লা প্রেস ক্লাব ও জেলা আইনজীবী সমিতি।