শনিবার ৩০ †g ২০২০
  • প্রচ্ছদ » sub lead 2 » করোনার প্রভাবে ধ্বস নেমেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পোল্ট্রি শিল্পের


করোনার প্রভাবে ধ্বস নেমেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পোল্ট্রি শিল্পের


আমাদের কুমিল্লা .কম :
16.05.2020

তৌহিদুর রহমান নিটল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।।
চলমান মহামারী করোনা সংকটের ধাক্কায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ভেঙ্গে পড়েছে পোল্ট্রি শিল্পের চাকা। বিশেষ করে লেয়ার খামারিদের লাভ তো দুরের কথা উল্টো গুনতে হচ্ছে মোটা অংকের আর্থিক ক্ষতি। এক দিকে ক্রেতা সংকট অপর দিকে মোরগ পরিচর্যায় সময়মত ভ্যাকসিন না পাওয়া খামারিরা বেশ ক্ষতির সম্মুখীন।পুষ্টিহীনতার অভাব ও মানসম্মত খাবার না পাওয়ার কারণে বিভিন্ন রোগে অনেক মুরগী ইতিমধ্যে মারা গেছে। ক্রেতা সংকটের কারনে খামারে নিয়মিত উৎপাদিত ডিম বাজারে সরবরাহ না করতে পেরে ডিমের দাম কমে যাচ্ছে। আগে যেখানে একহালি ডিম পাইকারী ২৪ টাকা বিক্রি হত। তা এখন নেমে দাড়িঁয়েছে ১৬ টাকায়।
এতে খামার মালিকরা যেমন আর্থিকভাবে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে তেমনি এ শিল্পের সাথে জড়িত কয়েক হাজার শ্রমিকের চরম অর্থকষ্টে দিন অতিবাহিত করছে। খামার মালিকদের দাবি তাদের এই দূরাবস্থা কাটাতে এই সেক্টরে সরকারিভাবে বিশেষ উদ্যােগ ও আর্থিক সহাতায় পাওয়া গেলে এই শিল্প ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে।

জেলা প্রাণিসম্পদ সূত্রে জানা যায়, জেলায় বিভিন্ন উপজেলায় ছোট বড় মিলিয়ে লেয়ার এবং পোল্ট্রির এক হাজারের মত খামার রয়েছে। প্রায় দশ হাজার শ্রমিক কর্মরত আছে। এ শিল্পকে পুঁজি করে অনেকেই আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন। অনেক শ্রমিকের বেকারত্ব দূর হয়েছে।

সরেজমিন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার চুন্টা গ্রামে কৃষি ভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠান হাজী এস.এ. এগ্রো কমপ্লেক্স লিমিটেড খামারে গিয়ে দেখা যায়, ১৩ কানি জায়গার অধিকাংশ জায়গা জুড়ে কয়েকটি শেডে গড়ে তুলা লেয়ার পোল্ট্রি ফার্মের মুরগীর খামার। প্রায় ৩০ হাজার মুরগী পালন করে এখানে প্রতিদিন ৩০ হাজার ডিম উৎপাদন করা হয়। কিন্তু করোনা সংকটের কারণে খামারের সেই চাকা থমকে গেছে। সে সাথে পরিচর্যার অভাবে মোরগও মারা যাচ্ছে। এতে ডিমের উৎপাদনও কমে এসেছে। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আড়তদাররা ডিম নিতে আসলেও এখন তা অনেকটাই বন্ধ ।

কথা হয় ওই খামারে শ্রমিক মনির মিয়ার সাথে। তিনি বলেন, করোনার কারনে আমাদের কাজকর্ম তেমন হচ্ছে না। বেতনও পেতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আমাদের খামারে ডিম শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে নয় অন্যন্য জেলাতে সরবরাহ করা হয়। কিন্তু এখন সরবরাহ অনেকটা বন্ধ হয়ে যাওয়াতে আমাদের মহাজনও কষ্টে আছে।

নারী শ্রমিক বেদেনা বেগম বলেন, এই খামারে বেতন দিয়ে আমার সংসার চলে। এখন ঠিকমত বেতন না পাওয়াতে পরিবার নিয়ে অনেকটা কষ্টে আছি। মালিকও আছে বেকায়দায়। তিনি বাঁচলে তো আমরা বাঁচতাম।

আরো কয়েকজন খামার শ্রমিক জানান, আমরা তো মালিকদের সহযোগীতায় খেয়ে পড়ে আছি। কিন্তু হাতে টাকা পয়সা না থাকায় গ্রামের বাড়িতে পরিবার পরিজন কষ্টে দিনপার করছেন। স্বাভাবিক সময়ে কর্ম ব্যস্ততার মধ্যে দিন শুরু হলেও এখন বেশীরভাগ অলস সময় কাটছে। কবে জানে করোনা দূর হয়।

খামারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: লৎফুর রহমান বলেন, ১৪ বছর যাবত ব্যবসাটিকে নিজ অর্থায়ন ও ব্যাংকের ঋণের মাধ্যমে পরিচালনা করে আসছি। করোনার মহামারীতে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। এমন ক্ষতির সম্মুখীন কখনও হয় নি। আমরা নিরুপায়।

এস.এ. এগ্রো কমপ্লেক্স লিমিটেড খামারের মালিক আবু শামীম মো: আরিফ বলেন, আমার খামারের প্রায় পাঁচ হাজার মুরগী মারা গেছে। আমাদের উৎপাদিত ডিম কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। যা আমাদের উৎপাদন খরচের মধ্যে পড়ছে না। এতে করে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধসহ আনুসাঙ্গিক খরচ মিটানো কঠিন হয়ে পড়ছে। এখন পর্যন্ত খামারে অর্ধকোটি টাকার লোকসান গুনতে হয়েছে। সামনের দিনগুলি নিয়ে শঙ্কায় আছি। সরকার যদি আমাদের বিশেষ প্রনোদনার আওতায় এনে সহযোগীতা করে তাহলে এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে পারব।

আবাবিল দেশী চিক এন্ড হ্যাচারির মালিক হাসান শুভ বলেন, আমার খামারে চার হাজার বয়লার মুরগী ছিল। করোনার কারনে ৯৫ টাকার কেজি মুরগী বিক্রি করতে হয়েছে ৬৫ টাকায়। প্রতি কেজিতে লোকসান হয়েছে ৩০ টাকা। এছাড়া জায়গায় ভাড়া শ্রমিক খরচ মিটিয়ে দেড় মাসে প্রায় একলক্ষ ৭১ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে।

ঈশা পোল্ট্রি এন্ড হেচারীর মালিক ফারুক মিয়া বলেন, আমার খামারে ৩০ হাজার মুরগী ছিল। খাবারে অভাবে কিছু বিক্রি করে দেয়। তবে অনেক মুরগী বিভিন্ন অসুখে মারা গেছে। ৩০ জন শ্রমিক বেকার অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে । করোনায় আমার প্রায় অর্ধকোটি টাকা লোকসান হয়েছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা: এ. বি.এম সাইফুজ্জামান বলেন, করোনা সংকটে খামারিদের কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। প্রথম দিকে লকডাউনের ধাক্কায় পরিবহনের কিছু সমস্যার কারনে খাদ্য সংকট কিছুটা ছিল। পরবর্তীতে সরকারের আন্তরিকতায় আমরা প্রাণিসম্পদ বিভাগ জেলা প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করে এই সেক্টরের পরিবহন যাতে বাধাগ্রস্ত না হয় আমরা সেই ব্যবস্থা নিয়েছি। সরকার এই ব্যাপারে পাঁচহাজার কোটি টাকা প্রনোদনার ঘোষনা দিয়েছে। সেটা পেলে আমরা তাক্ষণিক ব্যবস্থা নেব। ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের বিষয়ে উর্ধ্বতন কৃর্তপক্ষকে জানিয়েছি।