বৃহস্পতিবার ৪ জুন ২০২০


করোনাঃ আরেকটি মৃত্যুসঙ্গী মাত্র-


আমাদের কুমিল্লা .কম :
16.05.2020

নাসির উদ্দিন।।

সম্পদ মানুষকে ভীতু আর অসহায় করে তুলে। যার সম্পদ বেশি তার ভয়ও বেশী। সম্পদ যার নেই তার ভয়ও নেই। ফলে সম্পদহীনরাই যুগে যুগে বেঁচে থাকার জন্য লড়াই সংগ্রাম করেছে। আর বিত্তশালীরা জীবন বাঁচাতে নিজেদের আড়ালে রেখেছে, পালিয়ে বেঁচেছে বা প্রতিরক্ষা নিয়েছে। এই পৃথিবী যোদ্ধাদেরই। যুদ্ধ করেই এখানে বাঁচতে হয়। পৃথিবী হচ্ছে সার্ভাইভাল ফর দ্যা ফিটেস্ট। কেবলমাত্র কোনো অপার ক্ষমতার দোহাই-বড়াই মানবকূলকে এতদিন টিকিয়ে রাখতে পারতো না। অপেক্ষাকৃত দুর্বল মহামারী কোভিড-১৯ একথা আবারও প্রমাণ করেছে।

ফলে, আতঙ্ক বা ভয় নয়, জয় করতে হবে করোনাকেও। মনে করতে হবে এটি আরেকটি সর্বজনীন প্যান্ডেমিক, যা আমাদের বসবাসের সার্বজনীন সংগ্রামকে খানিকটা বাড়িয়ে দিলো। মৃত্যুর যেসব উপসর্গ আগে থেকেই ছিলো, তার সাথে আরেকটি উপসর্গের হিসাব যুক্ত হলো মাত্র। পৃথিবীতে বিভিন্ন রোগে প্রতিবছর প্রায় ৩ কোটি লোক মারা যায়। কোভিড-১৯ এর ফলে আরও ১০ লক্ষ মৃত্যু তালিকায় যুক্ত হবে। অন্যান্য ভয়াবহ রোগের মতো এই রোগের হিসেবও আমাদের মস্তিষ্কে একসময় থাকবেনা। আমরা এটাকেও স্বাভাবিক করে নেব। ফলে শত্রুর ভয়ে ঘরে বসে থেকে এই যুদ্ধে বিজয় অর্জন সম্ভব হবে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও অবশেষে একথাটি স্বীকার করলো। সংস্থাটি বলেছে, করোনার সাথেই আমাদের দীর্ঘকাল বসবাস করতে হবে।

ইতোমধ্যে আমরা জেনেছি ভাইরাসটি আগে থেকেই ছিল। ফলে এতোদিন আমরা এই ভাইরাসের সঙ্গেই বসবাস করেছি? রোগটি প্যান্ডেমিক (বৈশ্বিক মহামারী) হিসেবে দেখা দেয়নি বলে এ-র থেকে পরিত্রাণে মানবজাতি গলদঘর্ম হয়নি? রোগটি ছড়িয়ে পড়ার ধরন আবিস্কৃত না হলে এটিকে ইনফ্লুয়েঞ্জা বিবেচনা করেই হয়তো চিকিৎসাও চলতো। মানুষ স্বাভাবিক চলাফেরা করতো। আক্রান্তদের কেউ কেউ সুস্থ হতো। ৩-৪ শতাংশ মৃত্যুবরণ করতো। ভাইরাসটির চরিত্র আবিষ্কারের ফলে এর মৃত্যু এবং সংস্পর্শকে এতো ভয় পাচ্ছি। যে কোনো আবিষ্কারে মানুষ প্রথম আশ্চর্য হয় আর তার প্রচলন ও ব্যবহারে মানুষ অভ্যস্ত ও স্বাভাবিক হয়। গত ৪ ও ৮ মার্চের অন্য দুটি পোস্টে আমি উল্লেখ করেছিলাম, এ ধরনের প্রতিকূলতা মোকাবেলা করেই মানবজাতি টিকে আছে। ভবিষ্যতেও মানুষ তার লব্ধ জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে করোনাকে জয় করে টিকে থাকবে। অপেক্ষা একটি ভ্যাক্সিন আবিস্কারের।

বিবিসি সহ বিভিন্ন প্রচারমাধ্যম সূত্রে ইতিমধ্যেই আমরা জেনেছি করোনাভাইরাস নতুন কোন ভাইরাস নয়। ভাইরাসটি প্রথম শনাক্ত হয়েছিল ১৯৬৪ সালে লন্ডনের সেন্ট থমাস হাসপাতালের গবেষণাগারে। ড. জুন হার্টে আলমেইডা নামের একজন ভাইরোলজিস্ট এর আবিস্কারক। আজকের কোভিড-১৯ করোনাভাইরাসেরই একটি প্রজাতি। এর আগে বিশ্ববাসী একই করোনাভাইরাস গোত্রের সার্স ও মার্স ভাইরাসকে দেখেছে।

[(ডঃ জুন হার্টের জন্ম ১৯৩০ সালে গ্লাসগোর আলেসান্দ্রায়। অল্প বয়সে গ্লাসগো রয়্যাল ইনফার্মারিতে হিস্টোপ্যাথলজিতে গবেষণাগার কর্মী হিসাবে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি প্রথমে লন্ডন পরে কানাডায় চলে যান। অন্টারিও ক্যান্সার ইন্সটিটিউটে ইলেকট্রনিক মাইক্রোস্কোপের মাধ্যমে এন্টিবডি সংহত করার একটি পদ্ধতি আবিস্কার করেন তিনি। এই পদ্ধতিতে ভাইরাসগুলো আরও স্পষ্ট দেখার সুযোগ হয়। তার এই প্রতিভার সুবাদে ১৯৬৪ সালে তাকে লন্ডনের সেন্ট থমাস হাসপাতাল মেডিকেল কলেজে ফিরিয়ে আনা হয়।

সেখানে সাধারণ ঠাণ্ডা, জ্বর, সর্দি, কফ নিয়ে গবেষণারত ডক্টর ডেভিড টাইরেলের সঙ্গে কাজ শুরু করেন তিনি। ড. টাইরেল বেশ কয়েকটি সাধারণ সর্দি-কাশির ভাইরাস স্বেচ্ছাসেবীদের শরীরে বৃদ্ধি করতে পারছিলেন, কিন্তু সবগুলো নয়। তার মধ্যে একটি ভাইরাস বিশেষভাবে তাঁর নজরে আসে। সেটির নাম দেয়া হয়েছিল বি-৮১৪। যা সারের একটি বোর্ডিং স্কুলের একজন ছাত্রের কাছ থেকে এসেছিল ১৯৬০ সালে। ড. টাইরেল দেখতে পান, অন্যান্য কয়েকটি লক্ষণ স্বেচ্ছাসেবীদের মধ্যে তৈরি করা গেলেও, বি-৮১৪ তাদের নিয়মিত কোষের ভেতরে আর বেড়ে উঠতে পারে না। তিনি বি-৮১৪ এর নমুনা ড. জুন আলমেইডাকে পাঠান। ড. জুন নমুনার মধ্যে যে ভাইরাস কণা দেখতে পান সেগুলো ইনফ্লুয়েঞ্জার ভাইরাসের ব্যতিক্রম। ড. টাইরেল ও ড. জুন আলমেইডার এবং সেন্ট থমাসের দায়িত্বে থাকা অধ্যাপক টনি ওয়াটারসন, ভাইরাসটির নামকরণ করেন করোনাভাইরাস। কারণ ভাইরাসের চারপাশ জুড়ে অনেকটা মুকুটের মতো সাদৃশ্য ছিল
ড. জুন ইঁদুরের মধ্যে হেপাটাইটিস এবং মুরগির সংক্রামক ব্রঙ্কাইটিস তদন্ত করার সময় এর আগে এ ধরণের কণাগুলি দেখেছিলেন।)]

বিশ্বের জনসংখ্যা ৭৫০ কোটি প্রায়। বিশ্বে প্রতি সেকেন্ডে জন্ম নেয় ৪ জন। আর প্রতি সেকেন্ডে মারা যায় ২ জন। জন্মমৃত্যুর অনুপাত সমান না হলেও মানুষ প্রতি মুহূর্তেই মরছে। প্রতি বছর পৃথিবীতে গড়ে ৫ কোটি ৬০ লক্ষ মানুষ মৃত্যুবরণ করে। এই মৃত্যু কত বিচিত্র তার হিসাব নেই। তবে কিছু অভিন্ন কারণ রয়েছে। যা সবচেয়ে বেশি মানুষের জীবন কেড়ে নেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৬ সালের তথ্য উপাত্তের উপর ভিত্তি করে, ২০১৮ সালে এর একটি তালিকা করেছে। এরমধ্যে মৃত্যুর প্রধান ১০টি কারণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সূত্রে উল্লেখ করছি।

১. হার্ট ডিজিজ; বিশ্বে মানুষের সবচেয়ে বড় ঘাতক। এই রোগে প্রতি বছর ৯০ লাখেরও বেশি মানুষ মারা যায়। এই মরন ব্যাধি থেকে বেঁচে থাকতে আমরা চর্বিজাতীয় খাবার, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করি। উচ্চ মাত্রার বায়ুদূষণও দক্ষিণ এশিয়ায় এই রোগ বেশি হবার একটি কারণ। আর ইউরোপ আমেরিকায় জাংক ফুড এবং অতিরিক্ত এলকোহল পানের কারণে এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

২. বিশ্বে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষ স্ট্রোকে প্রাণ হারায়। মাত্রাতিরিক্ত কোলেস্টেরল ও ফ্যাটের দরুন রক্তনালীতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি বা রক্ত জমাট বেঁধে মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে মস্তিষ্কের কোষগুলো মরে যায়। আবার উচ্চ মানসিক উত্তেজনায় মস্তিষ্কের রক্তনালী ছিঁড়ে রক্তক্ষরণের কারণে স্ট্রোক হয়।

৩. লোয়ার রেসপিরেটরি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন বা এলআরটিআই বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে মারাত্মক সংক্রামক রোগ। উন্নত চিকিৎসা থাকা সত্ত্বেও বছর বছর শ্বসন সংক্রান্ত এসব রোগ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ছে এবং লাখো মানুষ মৃত্যুবরণ করছে। এ রোগে আক্রান্ত হয়ে বছরে ৪০ লক্ষাধিক মানুষ মারা যাচ্ছে, যার বড় অংশই ৫ বছরের কম বয়সী শিশু। এই রোগগুলো ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংক্রমিত হয় এবং রোগীর ফুসফুস ও শ্বসনতন্ত্র আক্রান্ত করে। ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং নিউমোনিয়া এলআরটিআইয়ের প্রধান দুই উদাহরণ।

৪. ক্রোনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজ
বা সিওপিডিঃ প্রতি বছর এ রোগে প্রায় ৩২ লক্ষ মানুষ মারা যাচ্ছে! ব্রঙ্কাইটিস, এমফিসেমা, অ্যাজমা সহ বেশ কিছু ফুসফুস সংক্রান্ত রোগ সিওপিডির অন্তর্ভুক্ত। এই রোগে আক্রান্তদের ফুসফুস গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাধারণত ধূমপায়ীরাই সিওপিডির প্রধান শিকার। অধিক জনবহুল শহরের কারণে অধূমপায়ীরাও এর শিকার হচ্ছেন। তাছাড়া দূষিত বায়ু এবং ধূমপায়ীর নিত্য সংস্পর্শেও একজন সুস্থ মানুষ সিওপিডিতে আক্রান্ত হতে পারেন।

৫. ফুসফুস ক্যান্সারঃ বিশ্বে প্রতি বছর এই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ১৬ লক্ষ মানুষ মৃত্যুবরণ করছে। এদের শতকরা ৮৫ ভাগই ধূমপায়ী।

৬. ডায়াবেটিসঃ মানুষের শরীরে ইনস্যুলিন নামক একধরনের হরমোন থাকে। যা দেহে উৎপাদিত কিংবা খাদ্যের মাধ্যমে গৃহীত গ্লুকোজ প্রক্রিয়াকরণ ও শোষণে সহায়তা করে। কোনো কারণে দেহে ইনস্যুলিন উৎপাদন কমে গেলে কিংবা বাধাগ্রস্ত হলে গ্লুকোজের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এ অবস্থাকে ডায়াবেটিস বলে। প্রতিকারহীন এ রোগে প্রতিবছর প্রায় ১৬ লক্ষ মানুষ মারা যায়। নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন এই মৃত্যুকে প্রলম্বিত করতে পারে মাত্র।

৭. অল্টহাইমারস (আলঝেইমার) একধরনের ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশের প্রকট রূপ। যা রোগীর দেহে একধরনের অ্যামাইলয়েড প্রোটিন উৎপন্ন করে। এতে করে রোগীর বিভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে। এ রোগের কারণ এখনো পর্যন্ত চিকিৎসকদের অজানা। ফলে এর কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিকারও নেই। প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষ প্রতিবছর এই রোগে প্রাণ হারায়।

৮. ডায়রিয়াঃ কলেরা ও আমাশয়ের মতো উদরাময় ব্যাধিতে ভুগে প্রতি বছর ১৫ লক্ষ মানুষ মারা যাচ্ছেন, যার মাঝে ৫ লাখের অধিক ৫ বছরের কমবয়সী শিশু। পানিবাহিত এ রোগ সাধারণ দূষিত পানি পানেই ঘটে থাকে। অধিকাংশ সময়ই অবহেলা এবং ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু হয়। পানি এবং সোডিয়াম ও ক্লোরাইডের মতো ইলেকট্রোলাইট শরীর থেকে অতিমাত্রায় কমে গিয়ে রোগীর দেহে চরম পানিশূন্যতা সৃষ্টি করে, যা তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।

৯. যক্ষ্মাঃ যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে প্রতি বছর পৃথিবী থেকে ১৪ লক্ষ প্রাণ ঝরে যায়। ১৮ এবং ১৯ শতকে পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় ত্রাসের নাম ছিল যক্ষ্মা। কিন্তু ২০ শতকের মধ্যভাগে সেলমান ওয়াকসমানের যক্ষ্মার প্রতিষেধক আবিষ্কার একে একটি মামুলি রোগে পরিণত করেছে। তথাপি টিবি বা টিউবারকুলোসিস ব্যাকটেরিয়ার দাপট যেন এতটুকু কমেনি। বিশ্বে এখনো বছরে ৯০ লক্ষ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হন, এরমধ্যে ১৪ লক্ষ মানুষ মারা যায়।

১০. সড়ক দুর্ঘটনাঃ ২০১৭ সালে বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ১৩ লক্ষাধিক মানুষ। আর দুর্ঘটনায় আহত হয়ে মৃতের মতো বেঁচে আছেন ৫ কোটিরও বেশি মানুষ। উন্নয়নশীল দেশগুলোই বেশি দুর্ঘটনাপ্রবণ। বছরে যে ১৩ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারান, তার প্রায় ১১ লাখই উন্নয়নশীল দেশে।
লেখক : দৈনিক প্রথম আলোর কুমিল্লার সাবেক নিজস্ব প্রতিবেদক ও সমাজ বিশ্লেষক