রবিবার ৯ অগাস্ট ২০২০


সীমানার নারিকেল গাছ ও নিষ্পাপ পারুল


আমাদের কুমিল্লা .কম :
16.05.2020

মোহাম্মদ আইয়ুব।।
চাঁদপুর শহর থেকে ১২ কিলোমিটার উত্তর পূর্বে গাছ পালা ও নদী বেষ্টিত বাঘাদী গ্রামে পারুলদের বাড়ী। পারুল ৭ বছর বয়সের নিষ্পাপ এক অবুঝ শিশু। পারুলদের সম্পত্তির সীমানা নিয়ে প্রতিবেশীদের সাথে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। পারুলদের বাড়ির সীমানায় একটি পুরনো নারিকেল গাছ আছে। প্রতিপক্ষ প্রতিবেশী ১১ জন মিলে একদিন ঐ নারিকেল গাছ থেকে নারিকেল পাড়ছিল। পারুল তাদের নারিকেল পাড়তে বাধা দেয়; এই বাধা দেয়ার কারনে প্রতিপক্ষরা পারুলকে পাচারের উদ্দেশ্যে অপহরন করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। পারুলের পিতা লালু মিয়া (ছদ্মনাম) চাঁদপুর সদর মডেল থানায় একটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে পাচারের উদ্দেশ্যে অপহরন মামলা করেন।
থানার অফিসার ইন-চার্জ মামালাটির তদন্তভার আমার উপর অর্পর করেন। আমি তদন্তের দায়িত্ব অত্যান্ত গুরুত্বের সহিত গ্রহন করি; কারন পাচারের জন্য শিশু অপহরনের ঘটনাটি স্পর্শকাতর বিধায় উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কড়া নজরদারি থাকবে। আমি মামলার ঘটনাস্থলে গিয়ে এজাহারে বর্নিত সীমানার নারিকেল গাছটি অত্যন্ত সূক্ষ ভাবে পর্যবেক্ষন করি। পারুলদের সীমানায় আর কোন নারিকেল গাছ আছে কি-না তাও সতর্কতার সহিত অবলোকন করি। সীমানার নারিকেল গাছটির আগা চিকন মৃত প্রায়; পারুলের পিতা এই নারিকেল গাছটি-কে নিয়ে মামলার সূত্রপাত বলে ঘটনাস্থলে আমাকে বর্ননা দেয়। প্রত্যক্ষদর্শী কোন সাক্ষী পারুলের পিতা হাজির করতে পারেন নাই, আমিও ঘটনার কোন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী পাই নাই। নারিকেল গাছটিতে বিগত ১০-১৫ বছরের মধ্যে নারিকেল ধরেছে বলে মনে হয় না। স্থানীয় নিরপেক্ষ স্কুলের শিক্ষক, মসজিদের ইমাম এবং অন্যান্য মুরুব্বী স্থানীয় বহু লোকজনকে প্রকাশ্যে ও গোপনে জিজ্ঞাসাবাদ করি। তাদের কেহই উক্ত নারিকেল গাছে কখনোই নারিকেল তো দূরে থাক ডাবও ধরতে দেখে নাই। এই পর্যায়ে পারুল অপহরন নিয়ে আমার সন্দেহের সৃষ্টি হয়।
এগারো জন আসামীদের মধ্যে একজন কবর খননকারী; এলাকার কোন মুসলমান মারা গেলে ঐ ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কবর খনন করে থাকেন। মৃতের আত্মীয়-স্বজন যদি কিছু আর্থিক সহযোগিতা করেন তবে তা দিয়েই তিনি জীবিকা নির্বাহ করেন। তিনজন নদীতে মাছ ধরে জীবিকা চালায়, তিনজন রিক্সাচালক, দুইজন কৃষি কামলা এবং অপর দুইজন গৃহিণী। অপর দিকে মামলার বাদী পারুলের পিতা লালু মিয়া একজন রিক্সা চালক কিন্তু মুলত সে একজন দাঁদন ব্যবসায়ী। উক্ত আসামীরা পারুলকে পাচারের উদ্দেশ্যে অপহরন করতে পারে আমি কিছুতেই এর হিসেব মেলাতে পারছিলাম না।
ইতোপুর্বে পারুলের বাবা এই লোক গুলোর বিরুদ্ধে বিজ্ঞ আদালতে আরো তিনটি মামলা দায়ের করেছিল। ঐ মামলা থেকে জামিন নিতে একজন গৃহিণী তার উকিলের ফি জোগাড় করার জন্য সর্বশেষ মাথা গোঁজার ঠাই তার ঘরের চালের টিন বিক্রয় করতে বাধ্য হয়েছিল। এই ব্যপারটি আমি সরেজমিনে তদন্তকালে দৃশ্যমান পাই।
সীমানার নারিকেল গাছে নারিকেল ধরতে দেখেছে এমন কোন সাক্ষী ও পারুল অপহরণের কোন তথ্য প্রমান না পাওয়ায় আমি আসামী গ্রেফতার করা থেকে আপাতত বিরত থাকি। অপরদিকে পারুলের পিতা লালু মিয়া তার মেয়েকে উদ্ধার করার চেয়ে আসামী গ্রেফতার করার জন্য আমার উপর বিভিন্ন ভাবে চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। এতে করে প্রকৃতপক্ষে পারুল অপহরন হয়েছে কি না আমার সন্দেহ আরো ঘনীভূত হয়। আমি আসামী গ্রেফতার না করায় পারুলের পিতা কতিপয় হলুদ সাংবাদিকের সহয়তায় স্থানীয় কিছু অখ্যাত পত্রিকায় আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা বানোয়াট সংবাদ প্রকাশ করে। এরপরেও আমি আসামী গ্রেফতার করতে উদ্যোগ না নেওয়ায় পারুলের পিতা তৎকালীন পুলিশ সুপার চাঁদপুর, ডিআইজি চট্টগ্রাম রেঞ্জ, সচিব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রধান উপদেষ্টার দফতর সহ বিভিন্ন উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের বরাবরে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন যে, আমি আসামীদের নিকট থেকে ৩০,০০০/= টাকা ঘুষ গ্রহন করে তার মামলার আসামী গ্রেফতার থেকে বিরত থাকি। সব নালিশি দফতরে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিলেও সৃষ্টিকর্তার বাহক হযরত জিব্রাইল (আঃ) এর দফতরে কোন অভিযোগ দায়ের করেন নাই। কারন মহান সৃষ্টিকর্তার দফতরে মিথ্যা অভিযোগ গ্রহন করা হয় না, বোধ করি এই কথাটা লালু মিয়ার ভালোই জানা ছিল।
আমি পারুলকে উদ্ধারের জন্য সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা সহ তদন্তের সকল কৌশল অবলম্বন করেও কোন সন্তোষজনক ফল পাচ্ছিলাম না। অপর দিকে আমার বিরুদ্ধে দায়ের করা অভিযোগের তদন্ত বিভিন্ন দফতর থেকে শুরু হয়েছে। তখন আমার অবস্থা এমন যে “একা ভোলা কয়দিক সামলাবো”। এই পর্যায়ে আমার বিরুদ্ধে একটি তদন্তের বিবরন তুলে ধরছি।
পুলিশ সদর দফতরে সিকিউরিটি সেল নামে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত করার জন্য একটি সেল রয়েছে। আমাকে উক্ত মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র সহ ঐ দফতরে তলব করেন। আমি যথারীতি নির্দিষ্ট তারিখে হাজির হলাম। তদন্তকারী অফিসার এএসপি র‌্যাঙ্কের, বয়স অনুমান ৫০ বছর; উনাকে আমার বেশ অভিজ্ঞ মনে হল। তিনি আমার বক্তব্য মনযোগ সহকারে শুনলেন। নারিকেল গাছের ছবি সহ আমার উপস্থাপিত সকল কাগজপত্র নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করলেন। সব দেখে-শুনে তাঁকে খুব গম্ভীর এবং চিন্তিত দেখালো। তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন চাকরি কত দিন ধরে করছি। আমি বললাম “স্যার প্রায় তিন বছর”। তিনি আমার পিঠে আলতো করে হাত বুলিয়ে বললেন, “ইয়াংম্যান তোমার চাকরি বেশি দিন হয় নাই, যদি পারুলকে উদ্ধার করতে পার তবে ভালো। খোদা না করুক যদি মেয়েটির লাশ পাওয়া যায় তবে তোমার চাকরি তো যাবেই জেলও খাটতে হবে”। উনার এই কথা শুনে আমার শরীর হিম শীতল হয়ে গেল আমার গায়ের সব পশম খাড়া হয়ে গেল। তিনি আমার চেহারার মলিনতা দেখে আরো বললেন, “যাও আমি তোমার বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত রিপোর্ট আপাতত দিচ্ছি না, যেকোন কৌশলেই হোক মেয়েটিকে উদ্ধার করো”। জীবনে প্রথম নিজের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ মোকাবেলা করতে এসে শুরুতে ভেঙে পড়লেও স্যারের দিকনির্দেশনা মূলক কথায় আমি কিছুটা সাহস ফিরে পাই; এটা অনেকটা লঞ্চডুবি যাত্রীর খড়কুটা আঁকড়ে ধরে বাঁচার মতন। আশা-নিরাশার দোলাচলে আমি আমার কর্মস্থলে ফিরে গেলাম।
ঐ ঘটনার তিন দিন পর, তৎকালীন এসপি চাঁদপুর মামলাটির নথিপত্র সহ তার অফিসে তলব করলেন। আমি তাঁর অফিসে হাজির হওয়ার সাথে সাথে পারুল উদ্ধারের অগ্রগতি কতটুকু জানতে চাইলেন। আমি বিমর্ষ বদনে উত্তর দিলাম, “স্যার, এখনো অপহৃতার কোন সন্ধান মেলে নাই”। তখন তিনি কড়া ভাষায় আদেশ দিলেন, “আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সন্তোষ জনক অগ্রগতি চাই”।
যখন আমার উপর দিয়ে ১২-১৪ নাম্বার বিপদ সংকেত বয়ে যাচ্ছে ঠিক তখনি আমি জানতে পারি বাড়িতে আমার বাবা-মা আমার বিয়ের জন্য পাত্রী পছন্দ করে রেখেছেন। বাড়িতে যাওয়ার জন্য বারবার তাগাদা দিচ্ছেন। আমি ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেলাম, মনে হল ইহা যেন “মরার উপর খাড়ার ঘা”। নতুন জীবনে পদার্পনের আকুলতা উপেক্ষা করে বাবা-মাকে আমার উক্ত সমস্যার কথা না জানিয়েই চাকুরির ব্যস্ততার অজুহাত দিয়ে আপাতত বাড়ি আসা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়ে দেই।
এভাবেই কোন অগ্রগতি ছাড়াই মামলা তদন্তের সময়সীমা প্রায় তিন মাস চলে গেল; তদন্তের আইনগত সময়সীমা প্রায় শেষের দিকে। অন্যকোন গত্যন্তর না দেখে মামলার নথিপত্র সহ এসপি স্যারের অফিসে হাজির হলাম। স্যারকে জানালাম এই মামলায় আমি তিনজন লোককে সন্দেহ করেছি। এক- মুহুরী (যে মামলাটির এজাহার লিখেছে); দুই- বাদীর পক্ষের উকিল; তিন- মামলার বাদী পারুলের পিতা লালু মিয়া। অনুমতি দিলে প্রথম দুইজনকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে মামলার রহস্য উদঘাটিত হবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। কারন অশিক্ষিত বাদী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৫(১) ধারার মর্মার্থ বুঝার কথা নয়। এসপি স্যার বললেন, “তোমার যুক্তিসংগত সন্দেহ হইলে তদন্তের সার্থে আটক করতে পারো”। অনুমতি পেয়ে কোর্টের সামনে একটি রেস্তোরায় বসে মুহুরীকে ফোন করে উক্ত রেস্তোরায় আসতে বললাম। পুর্বেই একটি রেইডিং পার্টি রেস্তোরার আশেপাশে নিয়োজিত রেখে ছিলাম। মুহুরী রেস্তোরায় আসা মাত্রই তাকে আটক করে থানায় নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করি। আইনজীবীর সহকারী হিসেবে অভিজ্ঞ মুহুরী কিছুতেই মুখ খুলতে চায় না। রাত্রি দশ ঘটিকায় চাঁদপুর বার ও প্রেস ক্লাবের সভাপতি থানায় এসে হাজির। কারন ঐ মুহুরী অত্যন্ত ক্ষমতাধর একটি সংঘঠনের সাধারন সম্পাদক। বার ও প্রেস ক্লাবের সভাপতি মামলার রহস্য উদঘাটনে সর্বোচ্চ সহায়তার আশ্বাস দিয়ে মুহুরীকে ১৫ দিনের জন্য তার জামিনে দেওয়ার অনুরোধ করেন। কর্তৃপক্ষের সহিত আলোচনা করে শর্ত সাপেক্ষে জিডি এন্ট্রি করে মুহুরীকে তার জামিনে ছেড়ে দেওয়া হয়। চৌদ্দ দিন পুর্ন হওয়ার পর আমি বার ও প্রেস ক্লাবের সভাপতি সাহেবকে ওসি স্যারের মাধ্যমে সময় শেষ হওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিলাম।

এদিকে আমার বাবা-মা পাত্রী পক্ষকে ১৫ দিনের মধ্যে আমি বাড়ি যাব পাত্র-পাত্রী উভয় উভয়কে দেখবে বলে কথা দিয়ে রেখেছেন। তারা আমাকে বাড়ি যাওয়ার জন্য আবার চাপ প্রয়োগ করতে লাগলেন। আমার বাবা আমাকে ফোন করে বলেন, “তোর চাকরি করার দরকার নাই; বিয়ের ব্যপারে ছুটি না পাইলে সেই চাকুরী করার দরকার কি?”। আমার উপর দিয়ে কি ঝড় বয়ে যাচ্ছে আমি কোন ভাবেই তাদের বলতে পারছিলাম না।
১৫ দিন পুর্ন হলো। নাইট ডিউটি করে সকাল আটটায় ডিউটি শেষ করে ঘুমাতে যাই এমন সময় আমার শুভাকাঙ্ক্ষী এক উকিল সাহেব আমার মোবাইলে ফোন দিয়ে বলেন; আপনার মামলার ভিক্টিম পারুলকে পাওয়া গেছে এবং সে ঢাকা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সম্পাদকের হেফাজতে আছে, একটি দৈনিক পত্রিকায় ছবি সহ ছাপানো হয়েছে। তার কথা শুনে আমি বিছানা থেকে লাফ দিয়ে উঠলাম এবং তখনি পত্রিকার দোকানে থেকে ঐ পত্রিকাটি সংগ্রহ করলাম। পত্রিকার বিজ্ঞাপন পড়ে মামলার বাদী পারুলের বাবা কে ফোন দিলে তার মোবাইল বন্ধ পাই। পারুলদের বাড়িতে গিয়ে পারুলের চাচা কে সঙ্গে নিয়ে প্রয়োজনীয় ফোর্স ও একজন সঙ্গীয় অফিসার সহ কর্তৃপক্ষের অনুমতিক্রমে ঢাকায় উদ্দেশ্যে রওনা করি। আনুমানিক ঐদিন দুপুরে আমি শাহ্বাগ থানায় হাজির হয়ে ঐ থানার একজন অফিসার রিকুইজিশন করে প্রেস ক্লাবে যাই। পারুল তার চাচাকে দেখা মাত্রই দৌড়ে এসে ঝাপটে ধরে বাঁধ ভাঙা কান্না জুড়ে দেয়। পারুলের অকৃত্রিম কান্না দেখে উপস্থিত সকলের চোখে পানি চলে আসে। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সম্পাদক সাহেবকে বিনয়ের সাথে বলি, “এই পারুল আমার ৃ মামলার ভিক্টিম আমি তাকে নিতে এসেছি, তাকে আমাদের নিকট হস্তান্তর করুন; আইনকে সহায়তা করুন”। কিন্তু তিনি ভিক্টিমকে আমাদের হেফাজতে দিবেন না বলে অস্বীকৃতি জানান। তখন আমি বললাম, “মেয়ের চাচা আমাদের সাথে আছে আমাদের হেফাজতে দিলে তার কোন ক্ষতি হবে না”। কিন্তু তিনি দিতে চাইলেন না এবং বললেন, “চার-পাঁচ মাস হয়ে গেছে পারুল অপহরন হয়েছে আপনারা উদ্ধার করতে পারলেন না; আজ পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে নিতে এসেছেন?” বলে প্রশ্ন করেন। তিনি পারুলের বাবার হেফাজতে পারুলকে দিতে চান বলে আমাকে জানান। আমি তাকে বলি আমার দীর্ঘ তদন্তে এমন একটি জায়গায় হাত দিয়েছি যার ফলে দুষ্কৃতিকারীরা বাচাঁর জন্য মেয়েটিকে প্রেস ক্লাবের সামনে নামিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। তিনি আমার কথার কর্নপাত করলেন না তবে আমি তার মধ্যে কোন রকমের অপরাধ বোধ লক্ষ করি নাই। সুতরাং প্রায় এক রকম বাধ্য হয়েই শাহ্বাগ থানায় গিয়ে একটি জিডি এন্ট্রি করে চাঁদপুর চলে যাই।
পরের দিন ওসি শাহ্বাগ স্যারের পরামর্শে চ্যানেল আই এর একটি গাড়িতে করে “জীবন যেখানে যেমন” অনুষ্ঠানের পরিচালক এবং কলাকুশলীরা ভিক্টিম পারুলকে নিয়ে চাঁদপুর থানায় হাজির। ভিক্টিমকে তাদের নিকট থেকে হেফাজতে নিয়ে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে উক্ত কলাকুশলী সহ পারুলদের বাড়িতে গেলে ঐ গ্রামের বর্তমান ও সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ চ্যেয়ারম্যানগন সহ স্থানীয় হাজার হাজার লোক পারুলকে দেখার জন্য সমবেত হয়। পারুলের বাড়িতে পা রাখা মাত্রই পারুল দৌড়ে গিয়ে তার মাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে। পারুলের অকৃত্রিম কান্না দেখে উপস্থিত সকলের চোখে পানি চলে আসে কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে পারুলের মায়ের চোখে একফোটা পানিও দেখা যায় নাই। এথেকে উপস্থিত সকলেই বুঝতে পারে পারুল অপহরন ঘটনাটি একটি সাজানো নাটক ভিন্ন আর কিছুই নয়। তখন সকলেই পারুলের পিতা লালু মিয়াকে খুজতে শুরু করে কিন্তু তাকে কোথাও দেখা যায় নাই।
পারুলকে বিজ্ঞ আদালতে হাজির করা হইলে জাগতিক লীলা-খেলা ও কল্পিত অপহরন সম্পর্কে অনবগত নিষ্পাপ শিশু পারুল বিজ্ঞ আদালতে তার জবানবন্দীতে প্রকাশ করে –আনুমানিক চার মাস পুর্বে তার পিতা তাকে কচুয়া থানাধীন এক আত্মীয়ের বাসায় রেখেছিল। সেখান থেকে তিন মাস পর তাকে ঢাকায় একটি বাড়িতে কাজের মেয়ে হিসেবে নিয়োজিত করে; ঐ বাড়িতে সে ঘর মোছা, থালা বাসন ধোয়ার কাজ করত। বিগত তিনদিন পুর্বে তার পিতা একটি সিএনজি অটোরিক্সা করে ঢাকায় প্রেস ক্লাবের গেইটে বসিয়ে রেখে এখনি আসছি বলে চলে যায়। দীর্ঘক্ষন ধরে তার পিতা ফিরে না আসায় সে কান্নাকাটি করিলে প্রেস ক্লাবের দারোয়ান তাকে ভিতরে নিয়ে সাধারন সম্পাদক সাহেবের নিকট বুঝিয়ে দেয়।
এর পরের ঘটনা আরো করুন, সপ্তাহ খানিক পর লালু মিয়া চাঁদপুর শাপলা চত্বরে আমাকে দেখে আকস্মিক আমার পা জড়িয়ে ধরে বলে, “স্যার মুহুরী আমাকে বলেছিল আমার মেয়েকে খুন করে লাশ ফেলে দিতে তবে মামলার দারোগা সহ সকল আসামী গ্রেফতার হবে। আমি আমার মেয়েকে খুন করতে নিয়েও তা করতে পারি নাই; হাজার হোক আমারই তো মেয়ে”। তখন আমার সেই সিকিউরিটি সেলের স্যারের কথা মনে পড়ে গেল। আমি লালু মিয়া কে তুলে নিয়ে তার প্রতি শত রাগ থাকলেও তার সত্য কথনে আমার সমস্ত রাগ নিমিষে উবে গেল।
সীমানার একটি নারিকেল গাছের বস্তুগত সাক্ষ্যের কারনে এগারো জন নিরপরাধ মানুষ মিথ্যা মামলার হয়রানি থেকে রক্ষা পেল। কিন্তু তদন্তকারী কর্মকর্তার উপর দিয়ে হাজারো কালবৈশাখী ঝড় বয়ে গেল। এই পুরো ঘটনাটির ভিডিও চিত্র ধারন করে চ্যানেল আই এর “জীবন যেখানে যেমন” অনুষ্ঠানের পরিচালক চ্যানেল আই তে একাধিক বার প্রচার করেছিলেন।
লেখক: স্মৃতির পাতা থেকে
মোহাম্মাদ আইয়ুব
অফিসার ইনচার্জ,
লালমাই থানা,কুমিল্লা।
বিঃদ্রঃ যাকে প্রথম দেখার জন্য হৃদয়ের হাজার আকুলতা সত্বেও সেসময় দেখতে যেতে পারিনি, তাকে নিয়েই আজ ১৬ই মে যুগল জীবনের ১২ টি বৎসর পূর্ণ করলাম।
আলহামদুলিল্লাহ্।