বৃহস্পতিবার ৪ জুন ২০২০


পড়তে পড়তে অনেক সময় চোখ ভিজে যায়


আমাদের কুমিল্লা .কম :
16.05.2020

আবুল হাসানাত বাবুল।।
পবিত্র সিয়াম সাধনার মাসে পবিত্র কুরআন শরীফের বঙ্গানুবাদ পাঠ করি। এই পাঠ করার অভ্যাসটা সাম্প্রতিক বছরগুলোতেই বেশি। এবছর করোনা ভাইরাসের প্রেক্ষিতে বিপদমুক্ত থাকার জন্য স্বেচ্ছায় গৃহবাসী হয়ে গেছি। এর ফলে অন্যান্য বছরের তুলনায় পবিত্র কুরআন শরীফের বঙ্গানুবাদ বেশী পাঠ করছি। আমি যে বঙ্গানুবাদ পাঠ করছি, এর পূর্ণ নাম “কোরান শরীফ, সরল বঙ্গানুবাদ”, অনুবাদ করেছেন মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান। যাকে দেশবাসী চেনেন বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান নামে। যিনি ১৯৯৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন। আমরা সবাই জানি বাংলায় পবিত্র কুরআন প্রথম অনুবাদ করেন ভাই ‘গিরিশ চন্দ্র সেন'(১৮৮৬সালে)। শত বছর পরে ভাই গিরিশ চন্দ্র সেনের অনূদিত পবিত্র কুরআন দেখার আমার সুযোগ হয়েছিল। তখন বয়স কম ছিল কিন্তু পড়া হয় নাই। জ্ঞান হবার পর প্রথম আল কুরআনের বঙ্গানুবাদ পাঠ করি মাওলানা আকরম খার। তখন ঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারতাম না। মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান অনূদিত ‘কোরান শরীফ, সরল বঙ্গানুবাদ পাঠ করছি আর উপলব্ধি করছি সত্যিই তা সরল বঙ্গানুবাদ। মাওলা ব্রাদার্স ২০০০ সালে তা প্রথম প্রকাশ করে। দ্বিতীয়বার মুদ্রিত হয় ২০০১ সালে। বাংলা ভাষাভাষী সবাই অনন্তকাল কৃতজ্ঞ থাকবেন ভাই গিরিশ চন্দ্রের কাছে যিনি পবিত্র কুরআন শরীফ প্রথম বাংলায় অনুবাদ করেন। আমি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের কাছে কৃতজ্ঞ যিনি সত্যিকার অর্থে কুরআন শরীফের সরল বঙ্গানুবাদ করেছেন। অনেক সূরায় যে বাক্যটি একাধিকবার এসেছে তা হচ্ছে ” আল¬াহ সীমালঙ্ঘনকারীদের ক্ষমা করেন না”।
এরপর আমার কাছে আরো চারটি গ্রন্থ রয়েছে। ‘মাইকেল হার্ট’ রচিত ‘ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ শত মনীষীর জীবনী’। মূল ইংরেজি বইটির নাম ‘দি হান্ড্রেড’। অনুবাদ করেছেন আহসানুল হক, এম শামাসুদ্দোহা, তপন চক্রবর্তী, শাহজাহান তপন, খোন্দকার আশরাফ হোসেন, আলী আহমেদ, আফতাব আহমেদ, মাসরুর আরেফীন, সম্পাদনায় আব্দুল মমিন চৌধুরী, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। একমাত্র তপন চক্রবর্তী ছাড়া আর সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তপন চক্রবর্তী বাংলা একাডেমির উপপরিচালক। মাইকেল হার্ট তার দৃষ্টিতে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ শতজন মনীষী বাছাই করেন। এই গ্রন্থে সবার ওপরে রয়েছে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর নাম। সংক্ষেপে শত জনের রচিত জীবনী খুবই চমৎকার।
পড়ছি মোহাম্মদ উল¬াহ বিরচিত ‘নিঃস্ব পল¬ী জনপদে আত্মশক্তি জাগরণের পথিকৃৎ আখতার হামিদ খান’। বাংলাদেশ পল¬ী উন্নয়ন একাডেমি যা সংক্ষেপে বার্ড তার সম্পর্কে আমি জানি কিন্তু পরিপূর্ণ জানিনা। মনীষী আখতার হামিদ খান সম্পর্কে জানি কিন্তু পরিপূর্ণ জানিনা। বার্ড প্রবর্তিত কুমিল¬া পদ্ধতি সম্পর্কে জানি কিন্তু পরিপূর্ণ জানিনা। নিরীক্ষণ সম্পাদক মোহাম্মদ উল¬াহ বিরচিত গ্রন্থ ‘আখতার হামিদ খান’ আমার স্বল্প জানাকে পরিপূর্ণ করেছে। গ্রন্থটি প্রকাশে সহযোগিতা করেছেন গোবিন্দপুরের কাজী আবদুল হকের কনিষ্ঠ সন্তান কাজী মনসুর উল হক। উভয়ে অনেক বড় একটি ভাল কাজ করেছেন।
তৃতীয় গ্রন্থটি মিজানুর রহমান চৌধুরী রচিত ‘রাজনীতির তিন কাল’। মিজানুর রহমান চৌধুরী ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু সরকারের তথ্য ও বেতার মন্ত্রী ছিলেন। ১৯৭৩ সালে হন ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী। ১৯৮৬ সালে এরশাদ সরকারের জাতীয় পার্টি থেকে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। বৃহত্তর কুমিল¬ার তিনিই ছিলেন প্রথম প্রধানমন্ত্রী। ‘রাজনীতির তিন কাল’ মিজানুর রহমান চৌধুরীর আত্মজীবনী নয়। রাজনীতির পঞ্চাশ বছরের অভিজ্ঞতা তিনি এই গ্রন্থে প্রকাশ করেছেন। রাজনীতির তিন কাল বলতে বৃটিশ আমলের শেষ দশক, পাকিস্তান আমলের চব্বিশ বছর এবং বাংলাদেশে তার জীবদ্দশার সময়কাল বুঝিয়েছেন। বইটি পড়লেই বোঝা যায় তিনি বলে গেছেন আর কেউ লিপিবদ্ধ করে গেছেন। মিজানুর রহমান চৌধুরী একটা ভাল কাজ করেছেন। আবুল মনসুর আহমেদ, আতাউর রহমান খান, এর আগে এধরনের গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। এর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, যা বহু আগেই পাঠ করেছি। কাজী জাফর আহমেদও এধরনের একটি প্রয়াস সংক্ষেপে করেছেন। আমার কাছে মিজানুর রহমান চৌধুরীর ‘রাজনীতির তিন কাল’ গ্রন্থটিকে খুবই মূল্যবান মনে হচ্ছে।
আর চতুর্থ গ্রন্থটি হচ্ছে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় রচিত উপন্যাস ‘সেই সময়’। এই উপন্যাস ১৯৮৩ সালে ‘বঙ্কিম পুরস্কার’ ও ১৯৮৫ সালে ‘আকাদেমি পুরস্কার’ লাভ করে। উপন্যাসিক লিখেছেন কাহিনীর পটভূমি ১৮৪০ থেকে ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দ। ইতিহাসের ঐতিহাসিক চরিত্রগুলো এবং কলকাতার সেই সময়কাল চমৎকারভাবে বর্ণনা করা হয়েছে ‘সেই সময়’ উপন্যাসে। আমি ইতিহাস জানতে পছন্দ করি। তার একটি বিরাট দিক আমার বিশদভাবে জানা হয়ে গেল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সেই সময়’ উপন্যাস পড়ে। ঐতিহাসিক চরিত্র রাজা রামমোহন রায়, প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রাণী রাসমণি, সৈয়দ আমির আলী, প্যারিচাঁদ মিত্র উপন্যাসের অন্যতম পাত্রপাত্রী। সতীদাহপ্রথা এবং বিধবাবিবাহ আইন সেইসময়ে পাশ হয়। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ কলকাতার ব্যারাকপুর থেকে সূচিত হয়। মঙ্গল পান্ডে বিদ্রোহের সূচনা করেন। সেখান থেকে সেই বিদ্রোহ সারা ভারতে ছড়িয়ে যায়। সাফল্যের আশা জেগে উঠেছিল দিল¬ীতে। বিদ্রোহীদের নেতৃত্ব দিতে কেউ এগিয়ে আসে নাই। মোঘল সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর বিদ্রোহীদের অভয় দিলেও তিনি ছিলেন তখন তিরাশি বছরের বয়োবৃদ্ধ। মোঘলদের তখন নিজস্ব সৈন্যবাহিনী নাই। তবুও বিদ্রোহীরা ভারতের স্বাধীনতার জন্য তাকে প্রতীক ধরে এগিয়ে যায়। হিন্দু-মুসলমান বিদ্রোহী সৈনিকরা ঐক্যবদ্ধ। কিন্তু দেশীয় মহারাজা, রাজা, বাদশাহ, নবাব, জমিদারদের বহুজন কলকাতার আবাসে ভোগবিলাসে কাটায়। তারা ইংরেজদের পাশে। বিদ্রোহীদের তারা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। ফলে সিপাহী বিদ্রোহ ব্যর্থতায় পরিণত হয়। ইংরেজরা দিল¬ী দখল করে নেয়। সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে নির্বাসনে পাঠায়। মঙ্গল পান্ডের ফাঁসি হয়। অন্যান্যদের জেল হয়। সাধারণ জীবনসহ অসংখ্য চরিত্র, ঘটনা-রটনা ‘সেই সময়’ উপন্যাসে তুলে আনেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। একদিকে ভোগ। অন্যদিকে অসহায়ত্ব। ধর্মাচার-অনাচার সবই আছে এই উপন্যাসে। পড়তে পড়তে অনেক সময় চোখ ভিজে যায়। তারপরেও পড়ি।
লেখক : সাবেক সভাপতি,কুমিল্লা প্রেস ক্লাব ও সম্পাদক,সাপ্তাহিক অভিবাদন