বুধবার ৮ জুলাই ২০২০
  • প্রচ্ছদ » » ‘এক জোড়া জুতো কেনা ছিল আমার কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ’


‘এক জোড়া জুতো কেনা ছিল আমার কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ’


আমাদের কুমিল্লা .কম :
24.05.2020

মুহাম্মাদ মামুনুল হক।।

ঠিক কত বছর যাবৎ হবে স্মরণ করতে পারছি না, তবে বহু বছর ধরে ঈদুল ফিতর উপলক্ষে এক জোড়া জুতো কেনা ছিল আমার কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ৷ এমনিতে বেশ কয়েক বছর যাবত আমরা পারিবারিক আলোচনার ভিত্তিতে ঈদের কেনাকাটা সব রোজার আগেই সারার চেষ্টা করি ৷ খুঁটিনাটি দু একটি জিনিস কেনা ছাড়া রমাযানে মার্কেটে যাই না ৷ শেষ সময় পর্যন্ত যেই কেনাকাটাগুলোর জন্য মার্কেটে যাওয়া হতো, তার অন্যতম ছিলো এক জোড়া জুতো ৷ এই জুতো জোড়া পছন্দসই মিল করতে আমাকে সবচেয়ে বেশি গলদঘর্ম হতে হতো ৷ কারণ, সেই জুতোর মধ্যে অনেকগুলো বৈশিষ্ট্য থাকতে হতো ৷ যেমন,
জুতো জোড়া হতে হবে একেবারেই ফ্লাট ৷ সোল সম্পূর্ণ সমতল ৷
জুতো জোড়া হতে হবে আরামদায়ক
হতে হবে মজবুত
আবার হতে হবে অনেক সুন্দর ও দামী ৷
এই সবগুলো বৈশিষ্ট্যের এক জোড়া জুতো মিল করতে অনেক সময় আমাকে এক মার্কেট থেকে আরেক মার্কেটে ঘুরতে হত ৷ অনেক সময় এক জোড়া জুতা কেনার পর মনের তৃপ্তি হতো না ৷ তখন আরো যুৎসই এক জোড়া জুতোর জন্য আরো ঘুরতাম এবং প্রথমটার চেয়ে আরো পছন্দসই জুতো কিনতাম ৷ এই এক জোড়া জুতো নিয়ে কেন আমার এত উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা উচ্ছাস-আগ্রহ ছিল? কারণ, জুতো জোড়া শুধু আমার কাছে এক জোড়া জুতোই ছিল না, বরং সেটি ছিল আমার কাছে জান্নাতে যাওয়ার বাহন ৷ জুতো জোড়া সে পায়ে পরিধানের জন্য হতো, যে পায়ের নিচে আমার বেহেশত, আমার জান্নাত ৷ আল্লাহর রাসূলের ভাষায়-
عن معاوية بن جاهمة: أنه جَاءَ النَّبِيَّ صلَّى الله عليه وآله وسلم فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللهِ أَرَدْتُ أَنْ أَغْزُوَ، وَقَدْ جِئْتُ أَسْتَشِيرُكَ، فَقَالَ: هَلْ لَكَ مِنْ أُمٍّ؟ قَالَ: نَعَمْ، قَالَ: فَالْزَمْهَا فَإِنَّ الْجَنَّةَ تَحْتَ رِجْلِها
حديثٌ صحيح؛ رواه الإمام أحمد في مسنده والنسائي -واللفظ له
নবীজীর কাছে পরামর্শ চাইতে এলে নবীজী সাহাবী মুয়াবিয়া বিন জাহিমাহকে বলেছিলেন, তোমার মা থাকলে তার সেবা কর, কেননা জান্নাত মায়ের পায়ের তলে ৷ আহমাদ, নাসায়ী ৷ সহীহ সনদের হাদীস ৷

জুতো জোড়া কিনতাম আমার সেই মায়ের জন্য ৷ আর তাই এটি ছিল আমার কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় ৷ আমি জানি, হাদিসের উদ্দেশ্য আক্ষরিক অর্থ নয়, বরং মর্ম হচ্ছে মায়ের সেবা ও মায়ের সন্তুষ্টির মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত হাসিল হয় ৷ কিন্তু কেন জানি আমার অনুভবে এমন একটি অনুভূতি কাজ করতো, আল্লাহর রাসূল স, তো আক্ষরিকভাবে হলেও জান্নাত মায়ের পায়ের নিচেই বলেছেন ৷ তাই মায়ের পায়ের তলাটাকে বরাবরই আমি দখল করে রাখতাম ৷ বহু বছর ধরে এভাবেই চলছিল ৷ গত বছর ঈদুল ফিতরের আগেও আম্মার জন্য দু জোড়া জুতো কিনেছিলাম ৷ প্রথমে একজোড়া কেনার পর নিজের মন পরিতৃপ্ত হচ্ছিল না ৷ আরো সুন্দর ও আরামদায়ক দেখে আরও একজোড়া কিনেছিলাম ৷ আজ সে কথাগুলো বারবার মনে পড়ছে ৷ স্মৃতিপটে ভেসে উঠছে মাকে নিয়ে মধুময় সেই সব স্মৃতির কথা ৷ আবারও ঈদ এল ৷ কিন্তু এবার আর সেই এক জোড়া জুতোর জন্য আমাকে হন্যে হয়ে ঘুরতে হয়নি ৷ যেতে হয়নি মার্কেট থেকে মার্কেটে ৷ কার জন্য আর ছুটব এভাবে? আমার মা যে চলে গেছেন আমায় ছেড়ে ৷ যে পায়ের নিচে খুঁজে বেড়াতাম আমার জান্নাত, সে পায়ের পদধ্বনি আর শুনতে পাইনা ৷ যে মায়ের পদতলে নিজেকে সঁপে দিয়ে হতে পারতাম ধন্য, আমার সে মা চলে গেছেন দূরে বহু দূরে ৷
গত ডিসেম্বরের ২১ তারিখ ইন্তেকাল করেছেন আম্মা ৷ অনেকদিন হয়ে গেল, কিন্তু হৃদয়ের শূন্যতা পূরণ হয়নি আজও ৷ কোনদিন হবে বলেও মনে হয়না ৷ থেকে থেকেই হৃদয়টা হাহাকার করে ওঠে মায়ের জন্য ৷ রবের দরবারে যখনই হাত তুলি মা বাবার জন্য দোয়া না করে হাত নামাই না ৷ কথাগুলো যখন লিখছি, চোখের কোণ ভিজে উঠছে অশ্রুতে ৷
রাব্বিরহামহুমা কামা রাব্বায়ানী সাগীরা…

যাদের বাবা-মা বেঁচে আছেন, সত্যিই তারা অনেক সুখী ৷ মা-বাবার কদর করুন ৷

লেখক: শায়খুল হাদিস

লেখাটি তাঁর ফেসবুক পেজ থেকে নেয়া।