শনিবার ১৫ অগাস্ট ২০২০


সিরাজাম মুনীরা গ্রন্থে প্রজ্ঞা পথিক


আমাদের কুমিল্লা .কম :
06.06.2020

দীপ্র আজাদ কাজল।।

ফররুখ আহমদ (১০ জুন ১৯১৮-১৯ অক্টোবর ১৯৭৪) বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মৌলিক কবি। তিনি মুসলিম রেনেসাঁর কবি হিসেবে সমধিক পরিচিত। প্রাথমিক জীবনে কবিত্ব বিকাশে কবি গোলাম মোস্তফা ব্যাপক উৎসাহ প্রদান করেন। দীর্ঘকালের কাব্য সাধনায় বিভিন্ন আঙ্গিকের নানা ছন্দে এবং স্বাতন্ত্রধর্মী কাব্য ভাষা সৃষ্টিতে শক্তি, স্বাতন্ত্র্য ও মৌলিকতার তিনি স্বাক্ষর রেখেছে। তিনি বাংলা সাহিত্যের সর্বশেষ আধুনিক মহাকবি। ‘হাতেম তা’য়ী’ মহাকাব্য রচনাকারী মহাকবি। ‘সাত সাগরের মাঝি,’ নৌফেল ও হাতেম’, ‘সিরাজমান মুনিরা’ তাঁর শ্রেষ্ট কীর্তি। তাঁর কবিতায় ইসলামি সমাজতন্ত্র মূর্ত হয়ে ওঠে।
জাতীর আগামী স্বপ্নের জাল বুনতে পথ দেখিয়েছেন এই মহান কবি। জীবন সম্বন্ধে গভীর কৌতুহল ও জিজ্ঞাসা তাঁর কাব্যে নোঙর বেঁধেছে। কবি ফররুখ আহমদ দীক্ষা নিয়েছিলেন মুজাদ্দেদিয়া তরিকায়। সেই থেকে পাল্টে যায় তাঁর জীবন দর্শন। ইসলামের অন্তর্গূঢ় সাম্যবাদ আপ্লুত করে তাঁকে। সেই থেকে অভিষ্ট লক্ষ্যে তাঁর পথ চলা। ইতিহাস, ঐতিহ্যের ভিতে মানব ধর্ম ইসলামের অনুসারী এই কবি গোড়া থেকেই ধনতন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ছিলেন। ইসলামী সাম্যের আদর্শে তিনি ছিলেন আশা জাগানিয়া কবি। মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ‘ফররুখের স্বাতন্ত্র ও বিষয় বৈচিত্র’ প্রবন্ধে বলেন, ‘বাংলা সাহিত্যে ইসলামি রেনেসাঁর শ্রেষ্ঠতম রূপকার, বিদ্রোহী ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ইসলামি আদর্শ ও ঐতিহ্য ভিত্তিক কবিতা ও গানে প্রচুর পরিমানে আরবি ও ফারসি শব্দ ব্যবহার করেছেন। নজরুলের পর ফররুখ আহমদ এর মত আর কোন কবি সম্ভবত আরবি ও ফারসি শব্দ এমন দক্ষতার সাথে ব্যবহার করেন নি বা করতে পারেন নি। … ফররুখ আহমদ রচনার কাহিনী নিয়েছেন পুঁথি সাহিত্য থেকে এবং ভাষার ও কাহিনীর নব নির্মাণে পুঁথি সাহিত্যকে অবলম্বন করেছেন। মনে রাখতে হবে ফররুখ পুঁথি রচনা করেন নি কিন্তু তিনি পুঁথির কাহিনী ও ভাষার আধুনিকায়ন এবং পুননির্মাণ করেছেন।’
আমরা ফররুখের আধুনিকতার অন্বেষণে যাই তাঁর সিরাজম মুনীরা গ্রন্থে। সেখানে রয়েছে এক বিরাট আশ্চর্যের ঘোর পথ। যে পথের রয়েছে এক নির্দেশক; তিনি প্রজ্ঞা-পথিকের কাছে ঝান্ডা তুলে দেন। সে সাম্যের ঝান্ডা হাতে কবি ফররুখ আহমদ আমাদের কাছে উপস্থিত হন।
সিরাজম মুনীরা গ্রন্থে আমরা দেখতে পাই মুহম্মদ মুস্তফা সাল্লাহু আলাইহি-অ-সাল্লাম এর আগমনের স্বাক্ষর দিয়ে আলোর সূচনা ঘটিয়েছেন নিখিল মানস অন্তরে। আঁধার, স্থবিরতা ভেঙে ঘুমানো প্রাণের দুয়ার দিয়ে দিনের সকল রশ্মি-স্বপ্ন প্রবেশ করবার আকাঙ্খায় কবিকে তাই আমরা বিভোর দেখতে পাই। এই শাশ্বত আলো ‘কে আমি’ এই প্রশ্নর উত্তর দিয়ে যায়। জীবনের অন্তস্থলের শান্তির বাণী রয়েছে তাতে। কদর্যতার ছবির ভিতর অত্যাচারীর নাস্তিক্য, বহুত্ববাদের আদর্শহীন বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যকলাপ যখন ব্যভিচারে ছড়ানো, তখন কেঁদে ফেরে এতিম শিশুরা। এই সদ্যজাত শিশুর কণ্ঠে বিশ্ব ধ্বসের সুরের ভিতর ‘কে আমি’ প্রশ্নে অপার ব্যথা বিভ্রান্ত রজনীর কাছে নিয়ে যায়। কবি জানিয়ে দিয়েছেন, ব্যথার আগুনে পুড়ে যে রঙ তৈরী, তাতে হয়ত দুঃখের তুলি দিয়ে স্বপ্নের চোখ নির্মাণ করা সম্ভব হয় কখনো।
কবি দেখেন স্বপ্নের চোখ নির্মাণকারী কারিগড় ক্লান্ত, তবু সে ব্যাকুল একটি ধ্যানের রাতের জন্য। সেই রাত একাগ্রতা এনে দেয়। সর্বকালের পরম সত্য-আধুনিকতার বয়ান নিয়ে কবির সঙ্গী হতে পেরেছিল প্রজ্ঞা-পথিক। সে দেখিয়েছিল ইশক-এর পথ। এই অধ্যাত্মবাদী কবির সারা তনুমনে সেই ইশকের আগুন জ্বলেছিল। আমরা সেই আগুনের শিখা নিভে গেলে তাঁর দর্শনের-সুরমা, সবুজ-শ্যামল ভূমির ওপর ছড়িয়ে থাকতে দেখেছি। সেই সুরমা ম্লান জোনাকী শিখার কাছে দাঁড়ালে মহাবেদনার হাজার বছর ধরে বয়ে চলা পথের কুয়াশা লাগে। আমাদের মুর্খ জড়তার ওপর প্রলেপ পড়ে। কখনো জমাট, কখনো গলতে থাকে।
প্রজ্ঞা-পথিক তখন হেরার-সূর্য দেখতে পাবার আকুলতা ব্যক্ত করেন। তিনি ব্যস্ত পথিক আর ব্যস্ত পথিকের পথে শঙ্কা। মৃত্যু অবশ্যম্ভাবি পথে নিরুত্তর ছুটে চলে কোন এক অস্থিরতায়। মাটি ঝাড়া, নিজ অনস্তিত্বের মাঝে অপূর্ণতার যাতনা বয়ে বেড়ায়। এ পথে জয় পেয়ে অনেকেই প্রতিশ্রুতি রাখতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে পরে। তখন তাদেরকে আমরা দেখতে পাই এই সমাজে নির্যাতিতের ভাঙা মিছিলে শামিল হয়ে থাকতে। সে পথের বৃত্তে অনেকেই চাষ করে, দিগন্ত থেকে বয়ে নিয়ে আসে আবেহায়াতের ধারায় শতাব্দীর প্রাচীন শবকে। স্ববিরোধের এই দলকে কবি চিনেছিলেন। চিরন্তনের অভিজ্ঞান নিয়ে তাই কবি ব্যক্ত করেন ‘তুলেছ কি ভুলি রংগিন তুলি ঝঞ্ঝা ক্ষুব্ধ প্রণয় নীলে?/ চোখের পলকে সকল ক্ষুব্ধ ভয়াল ঝটিকা থামায়ে দিলে।’
কবি নির্জনতায় যান। সেখানে দেখেন ওয়ায়েস করণির বুকের রঙ। পুরনো রাতের চাঁদ ক্ষয়ে প্রজ্ঞা-পথিকের কুটির দ্বারে খ- শশীর আগমন। এমন রঙে রাঙা প্রজ্ঞা-পথিকের সাথে জেগেছে মানুষ। আজো প্রযুক্তির অভিনব উদ্ভবের দিনে ব্যস্ততার মাঝে আমরা জোয়ার-ভাটার ভিতর চাঁদ দেখতে পাই কিংবা চাঁদ দেখতে যাই। আমরা সুন্দরকে সমর্পণ করি দীনতায়। এখনো তৃষ্ণার্ত হয়ে ছুটে চলি প্রেমের আকুলতায়; বর্ষ শেষের ফসলে আমরা আনন্দিত হই; শুকরিয়া আদায় করি সৃষ্টিকর্তার।
‘আজ এত দিনে হ’ল কি সময় আবার নতুন পথ চলার/ পরম প্রিয়ের ডাক এল নাকি? আকাশ মহলা সাত তলার’।
হাজার বছরের পথ ধরে হেঁটে প্রজ্ঞা-পথিকের প্রেমের নিশান তুলতে দেখেন কবি। এ চলার শেষ নেই, কোন দিন শেষ হয় না। এ আলোর বিভায় মুখ তুলে দেখা মানবতার মহা পটভূমি। কবি সেই অফুরান রাত্রির ভেতর থেকে সত্য জাগানিয়া দিনের আলো, কবিতার ছন্দ রশ্মিতে জাগ্রত করে রেখেছেন।
এই মৌসুমে আকাশে আবার রঙের আভাষ বুঝে ও প্রাচীন প্রাচীর বন্ধ হয়ে থাকা নতুন পাতার বনে কৃষ্ণা রাতের বিস্মরণ দেখে প্রজ্ঞা-পথিক নতুন দিনের আকাঙ্খায় জেগে থাকেন। কবি ইশারায় প্রাচীন প্রাচীর ঘেরা বন্ধ দুয়ারের সকল খিল খুলে হারানো সাথীরে খুঁজে নেবার আশা জাগিয়েছেন। প্রজ্ঞা-পথিক চির সাথির সমবেদনায় নিজস্বতাকে সঙ্গি করে নিয়ে আবার পথ চলে থাকেন।
‘জানু পেতে তুমি ধূলি তলে লীন, ললাট লুটায় বালুর পরে/ সমর্পনের সুন্দর তম তসবির জাগে ও অন্তরে।’
এই নিঃস্বতার ভিতর রয়েছে নীড়ে ফিরবার আশা। দুর্দিনে, দুর্যোগে দুঃসাহস তার সত্য-সন্ধানী অন্তরে জেগে ওঠে। প্রভাতী বর্ণ হতে নীড় বাঁধবার ভাষা চির চেনা, চির অচেনার দোলাচলে দরদী প্রজ্ঞা-পথিক ধ্যানে মগ্ন; তার অভ্যুদয় জনতার কাতারে দাঁড়িয়ে দূর দিগন্ত সীমা হতে মৃত প্রান্তরকে শঙ্কাহীন করবার জন্য।
প্রজ্ঞা-পথিক প্রভেদের সীমা রেখা টেনে বিপুল প্রতাপে অতন্দ্র প্রহরী। সাম্যের মাঠে দেওয়া এই সীমা রেখার মধ্যে অনাবাদি মাঠে ফসল ফলাবার সেই সর্বহারাদের সন্ধান করে।
‘মিশে গেছে সংখ্যাহীন মানুষের মৃত্তিকা মিছিল,/ মিশে গেছে আকাশের বর্ণ বিভা-সফেদ, জরদ, লাল নীল।’
মোজাদ্দেদিয়া তরিকায় দশটা লতিফা আছে; তার প্রথম পাঁচটি লতিফার রঙ হলদে, লাল, সাদা, চমকদার কালো, সবুজ। এই সীমারেখার ভিতর যারা ছিল রুহানি মানুষ, কবি বলেন প্রজ্ঞা-পথিকের সঙ্গের সাথী হয় সে সকল মুসাফির।
‘অতল গভীর হতে ভেসে ওঠে গূঢ় শান্তির স্বর/ সেতারা জ্বালানো দীপশিখা নিয়ে হেসে ওঠে অন্বর।’
প্রজ্ঞা পথিক অসংযমের উপরে মানবতার জন্য চির সংযমের সাধনা করেন। মাটির পাঁজর ভাঙা গতিবেগে নিত্য নতুন জোয়ার এনে আমাদের চমকে দেয়। পলি পল্লবিত প্রান্তর পূর্বাশার তীরে নবীন ফসলের ঘ্রাণ ছড়ানো হাওয়ায় বসে কবি আমাদের আহ্বান করেন প্রজ্ঞা-পথিকের পথের সঙ্গি হবার। হে সম্ভাবনার বহ্নি-পথিক দেখ-‘আকাশে উধাও ডানা, ছেড়ে যায় পুরাতন লুণ্ঠিত মিনার/ ছেড়ে যায় আকাশের বর্ণ বিভা, দিগন্ত কিনার;/ বন্দীর স্বপ্নের মত বাঁধ মুক্ত মন-মোর মন।’
প্রজ্ঞা-প্রথিক প্রেম পন্থী, প্রয়োজনের কাঁটার আঘাত সয়ে, কাঁধে বোঝা বয়ে সৃষ্টির প্রথম কণা শুধু প্রেম শুধু ভালবাসা এনে তিমির-পন্থীর দেশে অবশেষে প্রজ্ঞার তরঙ্গ জাগিয়ে তোলে।
ফররুখ আহমদ এর জীবন ও কাব্য কর্মের প্রকৃত প্রণোদন ছিল ইসলাম। ভারতীয় উপমহাদেশে কেবল ইকবাল ও নজরুল এই দর্শনকে আত্মস্থ করে উপস্থাপন করতে পেরেছিলেন। ফররুখের প্রিয় কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত, যিনি বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক আধুনিক মহাকবি। আর ফররুখ বাংলা সাহিত্যের সর্বশেষ সার্থক আধুনিক মহাকবি। মানবিক জীবন যাপনে স্বপ্নের চিত্রপটে ফররুখ বিশ্বময় এক অনিবার্য কবিসত্তা।