শুক্রবার ১৪ অগাস্ট ২০২০


লাইনম্যানের ভুলে বিদ্যুতায়িত হলেন শরিফ


আমাদের কুমিল্লা .কম :
10.06.2020

স্টাফ রিপোর্টার।।
ট্রান্সফরমারের ফিউজ দিতে গিয়ে বিদ্যুতায়িত হয়ে গুরুতর আহত হয়েছেন বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড কুমিল্লা শাসনগাছা বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের অস্থায়ী গাড়িচালক ও লাইন সহকারি মোঃ শরিফুল ইসলাম। বর্তমানে তিনি রাজধানী ঢাকার শেখ হাসিনা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি হসপিটালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তার শরীরের বিভিন্ন অংশ মারাত্মকভাবে পুড়ে গেছে। ভেঙ্গে গেছে কোমর। মাথা, গাড়, মেরুদন্ডে পেয়েছেন গুরতর আঘাত। কেটে ফেলা হয়েছে বাম হাতটি। তাছাড়া ডান হাতের একটি আঙ্গুলও কাটতে হয়েছে। এখন পর্যন্ত তিনটি অপারেশন হয়েছে। আরো দুটি অপারেশন করতে হবে।
শাসনগাছা বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত মাসের ১৭ তারিখ বিকেলে কুমিল্লা নগরীর কালিওয়াজুরি পিটিআই স্কুল সংলগ্ন এলাকায় ১১ হাজার ভল্টেজের ট্রান্সফরমারের ফিউজ চলে গিয়ে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দেয়।
এলাকাবাসীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে লাইনম্যান মিন্টু মিয়ার নেতৃত্বে গাড়িচালক শরিফুল ইসলামসহ অন্যান্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। লাইনম্যান মিন্টু মিয়া ওই লাইনের নতুন লোক বলে অস্থায়ী গাড়িচালক ও লাইন সহকারি শরিফুল ইসলামকে ফিউজ দেওয়ার জন্য ট্রান্সফরমারের ওঠার নির্দেশ দেন এবং কালিয়াজুরী উপ কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা এমদাদুল হক ভূঁইয়া কে ওরফে এমদাদ সিবিএ কে মোবাইল ফোনে কল করে ওই ফিডারের বিদ্যুৎ লাইন বন্ধ করান। লাইন সরকারি শরীফ লাইনম্যান মিন্টু মিয়ার কথামতে ট্রান্সফরমারে ওঠে ফিউজ দেয়ার কাজ শুরু করেন। কাজ শেষ করার মুহূর্তে মিন্টু মিয়া কালিয়াজুরী উপকেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা এমদাদ সিবিএ কে আবার কল করে লাইন চালু করার নির্দেশ দেন। লাইনম্যান মিন্টু মিয়ার কথা মতে এমদাদুল হক ভূইয়া ওই ফিডারে বিদ্যুৎ চালু করলে সাথে সাথে শরিফুল ইসলাম বিদ্যুতায়িত হয়ে যায়। তার শরীরে আগুন ধরে ট্রান্সফর্মার থেকে শটকে নিচে পড়ে যান। এসময় লাইনমেন মিন্টু মিয়াসহ এলাকাবাসীর সহযোগিতায় শরিফুল ইসলামকে উদ্ধার করে প্রথমে কুমিল্লা জেনারেল হাসপাতাল ও কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রাথমিক চিকিৎসার পর শরিফুল ইসলামকে রাজধানী ঢাকার শেখ হাসিনা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি হসপিটালে প্রেরণ করা হয়। শরিফুল ইসলাম বর্তমানে গুরুতর অসুস্থ বলে পারিবারিক সূত্রে জানা যায়।
শাসনগাছা অফিসের গাড়ি চালক শ্রমিকলীগ নেতা মোঃ জাকির হোসেন বলেন, লাইনম্যান মিন্টু মিয়ার ভুলের কারণে শরিফুল ইসলাম বিদ্যুতায়িত হয়ে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। তার পারিবারিক আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ। তার বাম হাতটি সম্পূর্ণ কেটে ফেলা হয়েছে। শাসনগাছা অফিস থেকে শরীফের চিকিৎসার জন্য যে সহযোগিতা করা হয়েছে তা খুবই সামান্য।
শরিফুল ইসলামের শ্যালক মামুন হোসেন বলেন, শরিফুল ইসলামের শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ। এখন পর্যন্ত তিনটি অপারেশন সম্পন্ন হয়েছে। আরও দুটি অপারেশন লাগবে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। তিনি আরো বলেন শরিফুল ইসলামের বাম হাত কেটে ফেলা হয়েছে। ডান হাতের একটি আঙ্গুলও কেটে ফেলা হয়েছে। শরীরের ৩৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। পা এবং পেটের পুড়া অংশটুকু অনেক গভীর। তিনি আরো জানান, শরিফুল ইসলাম বর্তমানে হসপিটালের নবম তলায় ৯০১ নম্বর রুমের ১৪ নম্বর বেডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। পারিবারিকভাবে শরিফুল ইসলাম বিবাহিত এবং তার তিনটি কন্যা সন্তান রয়েছে। চান্দিনা উপজেলার গ্রামের বাড়ির আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ। অস্থায়ী ভিত্তিতে চাকরির সুবাদে পাওয়া বেতন দিয়ে সংসার চালাতেন শরিফুল ইসলাম। শরিফুল ইসলাম এর চিকিৎসায় এখন পর্যন্ত ৯০ হাজার টাকার উপরে খরচ হয়েছে। শাসনগাছা অফিস থেকে প্রায় ৬০ হাজার টাকার সহযোগিতা পেয়েছেন বলেও জানান তিনি। বাকি টাকা জোগাড় করতে তাদের অনেক হিমশিম খেতে হচ্ছে।
লাইনম্যান মিন্টু মিয়া বলেন, গত জানুয়ারি মাসে চট্টগ্রাম থেকে এসে কুমিল্লা শাসনগাছা অফিসে যোগদান করেছি। যার কারণে অনেক এলাকাতেই আমি এখনো নতুন। ঐদিনের দুর্ঘটনাটি ভুল বোঝাবুঝির কারণে হয়েছে। ঐদিন আমার সাথে লাইন সহকারি আব্দুল বাসেত, নাসির আহমেদ ও মোহাম্মদ ইউসুফও ছিলেন। কালিয়াজুরি এলাকার দায়িত্বে থাকা লাইনম্যান এতেকাফে বসার কারণে আমি ওই এলাকায় প্রথম গিয়েছিলাম। আমাদের ভুল বোঝাবুঝির কারণে শরিফুল ইসলাম আজ মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। এমন দুর্ঘটনা আমার বেলায়ও ঘটতে পারে। আমিও গরীব মানুষ তারপরেও আমার পক্ষ থেকে শরীফের চিকিৎসার জন্য এক লাখ টাকা দেয়ার জন্য সিবিএ নেতা ও নির্বাহী প্রকৌশলী স্যারের সামনে বলে এসেছি। তবে শরীফের যে ক্ষতি হয়েছে তা অর্থ দিয়ে কখনো মিটানো সম্ভব না। ওই দুর্ঘটনার পর থেকে ভালো তরে একটি রাতও ঘুমাতে পারিনা।
শরিফুল ইসলামের স্ত্রী খোদেজা আক্তার বিউটি বলেন, তার স্বামী পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। তার এই করুণ অবস্থায় পরিবার নিয়ে এখনই হিমশিম খাচ্ছেন। শরিফের তিনটি অবুঝ মেয়ের ভবিষ্যত নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। স্বামীর সুস্থতার জন্য তিনি সকলের নিকট দোয়া চেয়েছেন।
শাসনগাছা বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, দুর্ঘটনার পর থেকে শরিফুল ইসলামের চিকিৎসার বিষয়ে সর্বোচ্চ সহযোগিতা চালিয়ে যাচ্ছি। যার ভুলের কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে সে বিষয়টিও অফিশিয়ালি দেখছি। তার জন্য যা যা করা দরকার আমরা তা করবো।