শুক্রবার ১৪ অগাস্ট ২০২০


কুমিল্লা নগরীর অবস্থা ভয়াবহ-কঠোর লকডাউনের মত বিশেষজ্ঞদের


আমাদের কুমিল্লা .কম :
13.06.2020

শাহাজাদা এমরান।।
মরণব্যাধি করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের দিক থেকে দেশে চতুর্থ স্থানে অবস্থান করা কুমিল্লাা জেলার সিটি করপোরেশনের অবস্থাই চরম ভয়াবহ পর্যায়ে রয়েছে। শুরু থেকেই জেলা স্বাস্থ্য্য বিভাগের সিদ্ধান্তহীনতা দুর্বলতা, জেলা স্বাস্থ্য্য বিভাগ ও সিটি করপোরেশনের সমন্বয়হীনতা ও গেলো ঈদুল ফিতরের সময় ঢাকা ও ঢাকার বাইরের লোকজনকে অবাধে নগরীতে প্রবেশাধিকার দেওয়া,স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাতে প্রশাসনের কঠোর না হওয়া এবং নাগরিকদেরও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে অনীহার কারণে কুমিল্লা নগর এখন চরম ঝুঁকিতে রয়েছে । জেলা স্বাস্থ্যবিভাগ ও সিটি করপোরেশন যদি ইগো সমস্যায় না ভুগে একত্রে বসে করোনার শুরুতেই সিদ্ধান্ত নিতো, তাহলে কুমিল্লা নগরবাসী আজ বিপর্যয়ের মুখে পড়তো না। বিশেষজ্ঞদের কঠিন হুঁশিয়ারি, এখনই যদি কুমিল্লা নগরকে কমপক্ষে আগামী ১৪ দিনের জন্য কঠোরতম লকডাউনে না ফেরানো যায় তাহলে জুলাই মাসে নগরজুড়ে করোনা ভাইরাস চরম মহামারি আকার ধারণ করবে। তাই বিশেষজ্ঞগণ জেলা প্রশাসন,পুলিশ প্রশাসন ও জেলা স্বাস্থ্যবিভাগকে অনতিবিলম্বে কুমিলা নগরকে রেড জোন ঘোষণা দিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
জানা যায়,চীনের উহান শহরে ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে এই করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয়। আর আমাদের দেশে কোভিড ১৯ এর রোগী প্রথম সনাক্ত হয় গত ৮ মার্চ। কুমিল্লা জেলায় প্রথম শনাক্ত হয় ৭ এপ্রিল জেলার তিতাসে আর নগর কুমিল্লায় প্রথম করোনা শনাক্ত হয় ২ মে । আর এই প্রতিবেদনটি তৈরি হচ্ছে ১৩ জুন শনিবার। অর্থাৎ দুই মাস ৬ দিন। এই দুই মাস ৬দিনে(১৩ জুন পর্যন্ত) জেলায় মোট আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৮৪৬ জন। আর কুমিল্লা নগরীতে প্রথম করোনা সনাক্ত হয় ২ মে। সে হিসেবে আজ ১৩ জুন এক মাস ১১ দিন হয়। এই এক মাস ১১ দিনেই আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াল ৩৮৭ । কুমিল্লা নগরের পর জেলার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আক্রান্তের স্থাান হলো দেবিদ্বার উপজেলা। এই উপজেলায় আক্রান্ত হয় ২০৭ জন। আর জেলার মধ্যে সবচেয়ে কম আক্রান্ত হলো লালমাই উপজেলা। এখানে এই পর্যন্ত করোনা পজেটিভ পাওয়া গেছে ১৩ জন।
করোনা সংক্রমণের দিক থেকে জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি কুমিল্লা নগরীতে কেন হলো জানতে চাইলে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মুজিবুর রহমান বলেছেন,অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে,এ ক্ষেত্রে আমাদের আরেকটু সতর্ক হওয়া দরকার ছিল। যখন প্রথম নগরীতে সংক্রমণ হয় তখনি যদি পুরো জেলা থেকে নগরকে পুরাপুরি বিচ্ছিন্ন না করলেও কিছুটা করাকরি আরোপ করা যেত তাহলে হয়তো আজকের এই ভয়াভহতা দেখতে হতো না। তিনি কুমিল্লা শহরের সংক্রমণের খারাপ অবস্থাার জন্য আরো কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে, নাগরিকদের স্বাস্থ্যবিধি না মানা। যেমন,মাস্ক ব্যবহারে অনীহা,সামাজিক দূরত্ব মেনে না চলা এবং ঘনঘন হাত না ধোয়া। মাস্ক ব্যবহারে প্রশাসনেরও যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিলতা ছিল। সাথে যোগ হয়েছে লকডাউনের সময় আমাদের নাগরিকগণ লকডাউন মানার প্রতি উদাসীন ছিল। মানবিক কারণে প্রশাসনও হয়তো কিছুটা এ ক্ষেত্রে শিথিলতা প্রদর্শন করেছিল।
এখন কিভাবে কুমিল্লা নগরীতে করোনা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় জানতে চাইলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও কুমেক পরিচালক ডা. মুজিবুর রহমান বলেছেন,কোন কথা নেই,হাতে একদম সময় নেই। অতি দ্রুত পারলে আজ থেকেই কুমিল্লা নগরীকে রেড জোন ঘোষণা করে কঠোর থেকে কঠোরতম লক ডাউনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। কমপক্ষে ১৫ দিন এই কঠোর ব্যবস্থা রাখতে হবে। এই ছাড়া কুমিল্লা নগরীকে করোনার প্রার্দুভাব থেকে নিয়ন্ত্রণ করার আর কোন উপায় আছে বলে আমার কাছে মনে হয় না।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও বাপা কুমিল্লার সভাপতি ডা. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন,কুমিল্লা মহানগরী ঈদের আগ পর্যন্ত মোটামোটি নিয়ন্ত্রণে ছিল। ঈদের সময় সব কিছু খুলে দেওয়ার কারণে ঢাকা, নারায়নগঞ্জ ও গাজিপুর থেকে লোকগুলি নগরীতে প্রবেশের হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। ইতিমধ্যে রোজার ঈদ চৌদ্দ দিন অতিবাহিত হয়ে গেছে। আর কুমিল্লা নগরবাসীও এখর হারে হারে টের পাচ্ছে ঈদের ছুটিতে খুলে দেওয়ার কুফল। সরকার যদি তার পূর্বের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যে যেখানে আছে তাকে সেখানেই ঈদের ছুটিতে ধরে রাখতে পারত তাহলে শুধু কুমিল্লা শহর না দেশও বড় বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতো।তিনি বলেন,করোনা থেকে রক্ষার ৫টি মৌলিক স্বাস্থ্যবিধি হলো, মাস্ক পরা,সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা,ঘন ঘন হাত ধোয়া,ঠান্ডা জাতীয় জিনিস পারত পক্ষে না থাওয়া এবং নাকে,চোখে মুখে হাত না দেওয়া । এই স্বাস্থ্যবিধিগুলো না মানার কুফল আজ আমরা ভোগ করছি। বর্তমানে কুমিল্লা নগরীতে করোনার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে চৌদ্দ দিনের কঠোর লকডাউনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে কুমিল্লার এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, আবার কঠোর লকডাউন দিলেই হবে না। তার আগে তালিকা করে নিশ্চিত করতে হবে ক্ষতিগ্রস্থ মানুষগুলোর তিনবেলা ন্যূনতম খাবারের।
করোনা সংক্রমণে কুমিল্লা নগরীর ভয়াবহ অবস্থা আর এই থেকে পরিত্রাণ কি জানতে চাইলে জেলা করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধ কমিটির সমন্বয়ক ও মনোহরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা.নিসর্গ মেরাজ চৌধুরী বলেন, আসলে সত্যি কথা বলতে কি,কুমিল্লা সিটি করপোরেশন কিন্তু জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের অধীন না। সিটি কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগে তাদের নিজস্ব জনবল রয়েছে। তারপরেও আমাদের সদর উপজেলা থেকে সেখানে লোক দেওয়া হয়েছে। জেলা সদর হওয়াতে জেলার বাইরের লোকগুলো আসাতে এবং প্রয়োজনীয় লোকবলের সংকটের কারণে কুমিল্লা নগরীর অবস্থা খারাপ বলে তিনি জানান। তরুণ এই চিকিৎসক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জেলা স্বাস্থ্যবিভাগ থেকে আমরা এত প্রচেষ্টা করছি কিন্তু তারপরেও জনগণ সচেতন হচ্ছে না। জনগণ সচেতন না হলে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ করা সম্ভব নয় বলে তিনি জানান। ডা.নিসর্গ মেরাজ চৌধুরীও মনে করেন,এই মুহূর্তে কঠোর লকডাউন করা ছাড়া আপাতত কুমিল্লা নগরীর করোনা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব না বলে তিনি জানান।
কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতি ও কুমিল্লা প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাড.সৈয়দ নুরুর রহমান বলেছেন,এই ব্যাপারে আমি কাউকে দোষারোপ না করে বলছি , এটা আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতা যে,আমরা লকডাউনের সময় যথাযথ তা মানিনি বা অপর পক্ষ থেকেও মানতে বাধ্য করার বিষয়ে কিছুটা শিথিলতা ছিল। ঈদ আগত ও ফেরত নাগরিকদের বিষয়ে আমাদের মনিটরিং ছিল না। সর্বক্ষেত্রে আমরা শিথিলতার মধ্যে ছিলাম। যার ফলে কুমিল্লা নগরের মানুষ এখন চরম স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে। এখনো সময় আছে যদি রেড জোন ঘোষণা করে আগামী দুই সপ্তাহের জন্য কুমিল্লা নগরকে সারা জেলা থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় তাহলে হয়তো করোনা থেকে আমরা কিছুটা নিয়ন্ত্রণ হতে পারব । এ ছাড়া আর কোন উপায় দেখছি না।
কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মীর শওকত হোসেন বলেন,কুমিল্লা সিটির কাজ হচ্ছে শুধু স্যাম্পল সংগ্রহ করা। বাকি কাজ জেলা স্বাস্থ্যবিভাগের। আমাদের ৫ জন দক্ষ টেকনিশিয়ান প্রতি দিন ৫০ জনের স্যাম্পল সংগ্রহ করে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজে পাঠায়। আমরা নগর ভবন ও সদর দক্ষিণের অফিসে এই দুই স্থানে কাজ করছি । আমরা ৫০ এর বেশিও স্যাম্পল সংগ্রহ করতে পারি। কিন্তু লাভ কি হবে? কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ দুই শিফটে প্রতিদিন ১৮৮ জনের নমুনা পরীক্ষা করতে পারে। জেলায় উপজেলা রয়েছে ১৭টি। ১৭টি উপজেলা থেকে যদি ১০টি করেও স্যাম্পল আসে তাহলেও ১৭০টি স্যাম্পল হয়। সুতরাং আমরা আজকে জমা দিলে রিপোর্ট পেতে সময় লেগে যায় ২/৩ দিন। বেশিদিন স্যাম্পল থাকলে আবার এর কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যায়। সুতরাং আমরা বেশি স্যাম্পল সংগ্রহ করে কোন লাভ হবে না যদি না পরীক্ষা না বাড়ানো হয়। আবারো বলছি,কুমিল্লা সিটি করপোরেশন শুধু মাত্র স্যাম্পল সংগ্রহ করতে পারে এবং আমরা নিজস্ব জনবল দিয়েই তা ভালোভাবে করছি। বাকি সব কাজ স্বাস্থ্যবিভাগের। এখানে কুসিকের আর কী করার আছে বলুন!
এ প্রসঙ্গে কথা বলার জন্য কুমিল্লা জেলা সিভিল সার্জন ডা.নিয়াতুজজামানকে পর পর ২দিন তার সেল ফোনে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। করোনা ভাইরাসের ঘটনা শুরু হওয়ার পর থেকেই তিনি গণমাধ্যমকে এড়িয়ে চলছেন বলে কুমিল্লায় কর্মরত একাধিক সাংবাদিক এই অভিযোগ করে আসছেন।
কুমিল্লা জেলার ডেপুটি সিভিল সার্জন ও জেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটির সদস্য সচিব ডা.মো. শাহাদাত হোসেন জানিয়েছেন,সত্য অস্বীকার করব না। করোনা ভাইরাস সংক্রমণে কুমিল্লা নগরীর অবস্থা খুবই খারাপ। এর প্রধান কারণ হিসেবে তিনি জানান,ঢাকা এবং চট্টগ্রামের মাঝখানে অবস্থান কুমিল্লার।ফলে ঈদের সময় এই দুই বড় আক্রান্ত স্থান থেকে লোকজন কুমিল্লায় এসেছে। আমরা তাদের আসা যাওয়া ঠেকাতে পারিনি। কুমিল্লা নগরীর ভয়াবহ অবস্থার জন্য মোটেই জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ দায়ী নয়। নগরীর ২৭টি ওয়ার্ড দেখভাল করার দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের। তাদের চিফ মেডিকেল অফিসার নামে একটি বড় পদ রয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠার এতদিন পরেও এই পদে এখনো কেউ নিয়োগ পায়নি। করোনা প্রতিরোধে কুসিক যা করছে তা খুবই সামান্য। আমরা জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনকে ইতিমধ্যে ২জন ডাক্তার,২ জন টেকনিশিয়ান ও ৪ জন ভলানটিয়ার দিয়েছি।
করোনা সংক্রমণের ভয়াভহ অবস্থা থেকে কুমিল্লা নগরীকে রক্ষা করতে চাইলে কী পদক্ষেপ নেয়া দরকার জানতে চাইলে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্বশীল এই কর্মকর্তা বলেন,আমি জেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে মিটিংয়েও বলছি এখনো বলছি,কুমিল্লা নগরীকে রক্ষা করতে হলে কঠোর লকডাউনের কোন বিকল্প নেই। এবং এটি যত তাড়াতাড়ি হবে ততই নগরবাসীর জন্য মঙ্গল বলে তিনি মনে করেন।