শুক্রবার ৭ অগাস্ট ২০২০


আক্রান্তদের সামর্থ্য থাকলেও চিকিৎসার সুযোগ নেই কুমিল্লায়


আমাদের কুমিল্লা .কম :
14.06.2020

তৈয়বুর রহমান সোহেল।।
গত ২ জুন সন্ধ্যায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপক একেএম মিজানুর রহমান। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে নগরীর ফরটিস হাসপাতালের আইসিইউ বেডে স্থানান্তরের সময় পথে মারা যান তিনি। এনিয়ে কুমিল্লার নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যথাযথ চিকিৎসা না পেয়ে কেন একজন রোগী মারা যাবে তা নিয়ে। এদিকে শুক্রবারও এক রোগী আইসিইউ না পেয়ে ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা অবস্থায় মারা গেছে। সচেতন মহলের বক্তব্য,কুমিল্লার প্রভাবশালী বেসরকারী হাসপাতাল গুলো যদি দুর্যোগের এই মুহুর্তে সেবার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসত, তাহলে এক দিকে যেমন আর্থিক ভাবে তারা লাভবান হতো,অন্যদিকে, অর্থ খরচ হলেও বিনা চিকিৎসায় হয়তো মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ত না অনেক সামর্থ্যবান মানুষ।
কুমিল্লা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, কুমিল্লায় সরকারি, বেসরকারি, প্রাইভেট ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ নিবন্ধনকৃত হাসপাতালের সংখ্যা চারশর মতো। অনিবন্ধিত হাসপাতাল আছে শতাধিক। সরকারি নির্দেশনামতে ৫০ বেড ও তার অধিক সকল হাসপাতালে করোনা রোগীদের চিকিৎসা প্রদানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, কুমিল্লার কোন বেসরকারী হাসপাতালই সরকারী এই নির্দেশনা আমলে নিচ্ছে না।
কুমিল্লা শহরের বিভিন্ন প্রান্তে সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, সেবার মনোভাব বাদ দিয়ে শুধুমাত্র মুনাফা লাভের আশায় নগরীর অলিগলিতে গড়ে তোলা হয়েছে অসংখ্য হাসপাতাল। রোগী বেশি পাওয়ার আশায় একেবারে সড়ক লাগোয়া করে স্থাপন করা হয়েছে হাসপাতালগুলো। কোনো ধরনের বৃহৎ পরিকল্পনা ছাড়া সাধাসিধে অবকাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠা করা হয় এসব হাসপাতাল। তাই ব্যাঙের ছাতার মতো গজে ওঠা এসব হাসপাতালগুলো করোনাকালীন সময়ে বৃহৎ জনসংখ্যার কুমিল্লা জেলায় করোনা রোগীদের জন্য কোনো ভূমিকা পালন করতে পারছে না। বরং সামান্য উপসর্গ থাকা, জ্বরে আক্রান্ত রোগীদেরও ঠেলে দেওয়া হচ্ছে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দিকে। শুধুমাত্র বেসরকারি কিংবা প্রাইভেট হাসপাতালগুলো নয়, সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও রয়েছে একই ধরনের সীমাবদ্ধতা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রাইভেট ও সরকারি মিলিয়ে কুমিল্লার মাত্র পাঁচটি হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা চালু আছে। এরমধ্যে দুটি হাসপাতালে করোনা রোগীদের ভর্তি করা হচ্ছে। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০ বেডের আইসিইউ চালু করা হয়েছে ৩ জুন। ফরটিস হাসপাতালে শুরু থেকে আইসিইউ সুবিধা চালু আছে। আর ৫০ বেডের অধিক হাসপাতাল আছে হাতেগোনা কয়েকটি। এদের মধ্যে কুমিল্লার মুন হসপিটাল, সিডিপ্যাথ ও কুমিল্লা মেডিকেল সেন্টারে (টাওয়ার) আইসিইউ চালু আছে। আবার এ তিনটি হাসপাতালে আইসিইউ চালু থাকলেও রোগীদের প্রবেশের জন্য পথ মাত্র একটি। জনবহুল এলাকা, একটি প্রবেশপথ ও হাসপাতালে আরও নানা জটিল রোগী ভর্তি থাকায় সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও এ তিন হাসপাতালে করোনার চিকিৎসা দু:সাধ্য ব্যাপার। কারণ এতে করে অন্য জটিল রোগীরাও আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে ডাক্তার, চিকিৎসাকর্মী ও সাধারণ রোগীদের মধ্যে।বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে শয্যাসংখ্যা পঞ্চাশের অধিক হলেও কোথাও আইসিইউ নেই, নেই অক্সিজেনও। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অক্সিজেন থাকলেও জেনারেল (সদর) হাসপাতালে ব্যবহার করা হচ্ছে সিলিন্ডার অক্সিজেন। কোথাও কোথাও পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ৭ হাজার টাকার অক্সিজেন সিলিন্ডার বিক্রি করা হচ্ছে ২৫ হাজার টাকায়। ফলে অক্সিজেন সরবরাহ করা কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সগুলোতেও নেই অক্সিজেন ব্যবস্থা। ফলে করোনায় আক্রান্ত জটিল রোগীদের চিকিৎসা করাতে হচ্ছে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ ও ফরটিস হাসপাতালেই।
এদিকে করোনার পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার সাথে সাথে এ দুই হাসপাতালের আইসিইউ বেড পূর্ণ হয়ে গেছে। এ প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১০টি আইসিইউ বেডের সবগুলোতেই রোগী ভর্তি আছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে ঘনবসতিপূর্ণ কুমিল্লা জেলায় দিনদিন বাড়ছে করোনার প্রকোপ। শনিবার পর্যন্ত জেলায় করোনা শনাক্ত হয়েছে ১৮৪৬জনের। মারা গেছে ৫০ জন। ইতমিধ্যে জেলার প্রায় অর্ধশত ডাক্তারের করোনা শনাক্ত হয়েছে। পরিস্থিতি জটিল হওয়ার সাথে সাথে বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা।
পর্যাপ্ত বেড ও আইসিইউ থাকা সত্ত্বেও করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা কেন দেওয়া যাচ্ছে জানতে চাইলে কুমিল্লা মেডিকেল (টাওয়ার) সেন্টারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো.নূরু উদ্দিন মজুমদার জানান, এসব বিষয়ে আমাদের আবাসিক মেডিকেল অফিসার কিংবা ওয়ার্ড পরিচালক ভালো বলতে পারবে।
কুমিল্লা সিডিপ্যাথ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মোস্তাক আহমেদ জানান, আইসিইউ বেড পরিচালনা করতে পাঁচজনের মতো ডাক্তার দরকার হয়। ডাক্তাররা ঢাকা থেকে আসেন। এখন মাত্র একজন ডাক্তার দিয়ে সীমিত পরিসরে আইসিইউ পরিচালনা করছি। তাছাড়া প্রবেশপথ মাত্র একটি। একইদিক দিয়ে সব রোগী আসা-যাওয়া করলে অন্য রোগীরাও ঝুঁকিতে পড়বে।
মুন হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিএমএ কুমিল্লার সভাপতি ডা. বাকি আনিস বলেন, শুধুমাত্র আইসিইউ একমাত্র সমাধান না। করোনা রোগীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো অক্সিজেন। হাসপাতালগুলোতে আলাদা প্রবেশপথ থাকতে হবে। কুমিল্লা জেনারেল (সদর) হাসপাতাল ও সদর দক্ষিণের একটি হাসপাতালে আলাদা প্রবেশ পথ থাকা সত্ত্বেও অক্সিজেন না থাকায় সেখানে করোনার চিকিৎসা করানো যাচ্ছে না। এক্ষেত্রে হাসপাতালগুলোকে উপযোগী করে তুলতে হবে।
মুন হাসপাতালের বিষয়ে তিনি বলেন, এখানে আইসিইউ আছে সত্য, কিন্তু অন্য আরও ছয়শ প্রকারের মতো রোগ আছে, যার জন্য আইসিইউ’র দরকার হয়। বিশাল জনসংখ্যার কুমিল্লা জেলায় অন্যান্য রোগে আক্রান্ত বিপুল সংখ্যক রোগী আছে, যাদের আইসিইউ ইউনিট দরকার। করোনার সংক্রমণতো শেষ কথা নয়। আমিও সরকারের একটা পার্ট, তারপারও বলি, এসব বিষয়ে আরও চিন্তভাবনা করে সরকারের সিদ্ধান্ত দেওয়া উচিত ছিল।
কুমিল্লা নগরীর প্রবীণ এক আইনজীবী নেতা জানান, নগরীর বড় তিনটি বেসরকারী হাসপাতাল মুন,সিডিপ্যাথ ও মেডিকেল সেন্টার এ গুলো হলো বিশাল বাজেটের হাসপাতাল। এই তিনটি হাসপাতালতো সারা জীবন লক্ষ লক্ষ টাকা রোজগার করল। জাতির এই দূর্যোগ মুহুর্তে তারা কি অবদান রাখছে স্বাস্থ্য সেবায় ? তা বিবেচনা করার এখন সময় এসেছে। তারা টাকা রোজগার করতে চায় করুক।প্রয়োজনে এক টাকার চিকিৎসা ১০০ টাকা নিক।তারপরেও তাদের আইসিও কিংবা অক্সিজেন দিয়ে হলেও বিকল্প ব্যবস্থা করে সীমিত সংখ্যক করোনা রোগীদের চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে হবে। আমরা সবাই জানি, বেসরকারী হাসপাতালে খরচ বেশী। যাদের সামর্থ্য আছে তারাই সেখানে চিকিৎসা নিবে।তারপরেও তো সামর্থ্যবান রোগীরা বলতে পারবে,টাকা গেলেও চিকিৎসা পেয়েছি।
বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি কুমিল্লা জেলার সাধারণ সম্পাদক শাহাজাদা এমরান বলেন, কুমিল্লার মুন,সিডিপ্যাথ ও মেডিকেল সেন্টারসহ আরো কয়েকটি বড় হাসপাতালের আর্থিক সক্ষমতা আছে, তারা বায়োসেপ্টি লেভেল ৩ পরীক্ষাগার স্থাপন করে সরকারের অনুমোদন নিয়ে কিট কিনে এনে করোনার নমুনা পরীক্ষা করার। এতে প্রথমেই তাদের বড় ধরনের বিনিয়োগ হলেও আমি বিশ্বাস করি, খুব কম সময়ের মধ্যেই তাদের বিনিয়োগের টাকা উঠে আসবে। নগরীর এমন অনেক লোক আছে যারা কুমেকে সিরিয়াল নিয়ে নমুনা দিয়ে আবার রিপোর্টের জন্য ২/১ দিন অপেক্ষা করার চেয়ে ৫/৬ হাজার টাকা বা তারচেয়ে বেশী খরচ হলেও হয়রানী না হয়ে বেসরকারী ভাবে করোনা পরীক্ষা করাতে চায়।এ সকল হাসপাতাল গুলোর ক্ষমতা আছে পরীক্ষাগার স্থাপন করে কিট কিনে এনে এসব সামর্থ্যবানদের চিকিৎসা করার।তারা যদি কিটের ক্রয় মূল্য থেকে বেশীও রাখতে চায় রাখুক। তারপরেও তো যাদের টাকা আছে তারা হয়রানী হলো না, দ্রুত সেবাটা পেল। আমরা কি অর্থের বিনিময়ে হলেও এই তিনটি হাসপাতাল থেকে এই সেবাটা আশা করতে পারি না।
এসব বিষয়ে কথা হলে বিএমএ কুমিল্লার সাধারণ সম্পাদক ডা. আতাউর রহমান জসীম জানান, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের ১০টি আইসিইউ বেডের সবগুলোই পূর্ণ। এ মুহূর্তে যদি আমার বা আপনার আইসিইউ দরকার হয়, তা দেওয়া যাবে না। হাসপাতালে বেড সংখ্যার অধিক রোগী ভর্তি করে রাখা যায়। কিন্তু যাদের আইসিইউ দরকার, তাদের আইসিইউতেই রাখতে হয়।
চিকিৎসক এই নেতা আরো বলেন, আইসিইউ সুবিধাসম্বলিত প্রাইভেট হাসপাতালগুলো অনেকটা শহরের বাড়ির আদলে তৈরি। প্রবেশপথও একটা, তাই করোনা রোগীদের সেখানে ভর্তি করাটা ঝুঁকিপূর্ণ। বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সগুলোতে অক্সিজেন নেই। এ অবস্থায় পুরো ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে না পারলে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হবে। যদি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, মন্ত্রী, সাংসদরা স্ব-স্ব এলাকায় চিকিৎসা নিতো, তাহলে এমন দুরবস্থার সৃষ্টি হতো না। আমার ভাবতে অবাক লাগে, কুমিল্লার মতো এমন অগ্রসর জেলায় প্রতিষ্ঠার প্রায় ৩০ বছর পরে জেলার সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ বেড স্থাপন করা হয়েছে।

কুমিল্লার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. শাহাদাত হোসেন জানান, প্রাইভেট ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে করোনা রোগীদের চিকিৎসা করানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর ব্যত্যয় ঘটলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মুজিবুর রহমান বলেন, ৫০ কিংবা তারও বেশি বেড আছে এমন হাসপাতালগুলোতে করোনা রোগীদের চিকিৎসা করানোর নির্দেশনা আছে। অনেক হাসপাতাল আছে, আমি নাম বলতে চাই না, তারা করোনা ছাড়াও সাধারণ উপসর্গ থাকা রোগীদের কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমি চাইব, স্বাস্থ্যসেবা থেকে যারা রোগীদের বঞ্চিত করবে, তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।