শুক্রবার ৭ অগাস্ট ২০২০


বঙ্গবন্ধুর আদর্শে লালিত, রাজপথে লড়াকু সৈনিকের মহাপ্রস্থান


আমাদের কুমিল্লা .কম :
15.06.2020

রেজাউল করিম শামিম।।

শুরুটা হয়েছিলো স্কুল জীবন থেকেই, ছাত্রলীগ রাজনীতির মধ্যদিয়ে। এরপর যুবলীগ আর আওয়ামীলগের নেতা-কর্মী হিসাবে সারাটা জীবন তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। ছিলেন,রাজপথের লড়াকু সৈনিক।তিনি,মোহাম্মদ নাসিম,আমাদের প্রিয় নাসিম ভাই।আওয়ামীলীগের কিছু কিছু নেতা আছেন,যাদের সাথে আমার ঘনিষ্ট সান্নিধ্যের মাধ্য দিয়ে উপলদ্ধি করতে পেরেছি-ওনারা কত বড় মাপের নেতা । তাঁদের মৃত্যকে সহজ মেনে নেয়া খুবই কষ্টকর।নাসিম ভাই, ওনার পিতার যোগ্য উত্তরসুরিই ছিলেন।ওনার পিতা,জাতীয় চার নেতার অন্যতম ক্যপ্টেন মনসুর আলী,যেমনি ভাবে‘৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর মর্মন্তুদ হত্যার পর, খুনিদের সাথে হাত মেলাতে ঘৃণা ভরে অস্বীকার করেছিলেন।যার পরিণতিতে তাঁকে জেলের অভ্যন্তরে নিষ্ঠুর হত্যার শিকারে পরিণত হতে হয়েছিল একই বছর ৩ নভেম্বর।মনসুর আলী, জেলখানায় অপর তিন জাতীয় নেতার সাথে জীবন দিয়ে প্রমান করে গেছেন,তিনি আমৃত্যু বঙ্গবন্ধুর সহচর হিসাবে কখনো নেতার আদর্শচ্যুত হননি। তেমনি ছিলেন মোহাম্মদ নাসিমও।
আওয়ামীলগের প্রেসিডিয়ার সদস্য,১৪দলের সমন্ময়ক ও মুখপাত্র,বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ নাসিম এমপি ১৩জুন সকালে সবকিছু ছেড়ে, সকলকে ছেড়ে চলে গেছেন চিরদিনের জন্যে।মোহাম্মদ নাসিম,করোনার উপস্বর্গ নিয়ে ভর্ত্তি হয়েছিলেন,বাংলাদেশ স্পেশালাইজ্ড হাসপাতালে। ৫ তারিখ পজেটিভ রিপোর্ট আসে। ততক্ষনে ওনার ষ্টোক করে। সেদিনই একটি মেডিক্যর বোর্ড গঠন এবং মস্তিষ্কে অস্ত্রপ্রচার করা হয়।এরপর থেকেই তিনি কমায় চলে যান। ওনাকে সিঙ্গাপুর নেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিলো। কিন্তু শাররীক অবস্থা অনুকুল না হওয়ায সে চেষ্টা বাতিল করা হয়। তবে চিকিৎসকদের সব চেষ্ঠা ব্যর্থ হওয়ার পর ১৩ জুন সকালে তাঁকে মৃতবলে ঘোষনা করা হয়। শেষ রিপোর্টে জনাব নাসিমের শরীরে করোনা নেগেটিভ ছিলো বলে চিকিৎসকিৎগন ঘোষনা দেন।
মোহাম্মদ নাসিম, আওয়ামীলগের ক্ষমতায় থাকাকালনি পর‌্যায়ক্রমে স্বরাষ্ট,ডাক ও টেলিকমিউনিকেশন,গৃহায়ন ও পূর্ত এবং সর্বশেষে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান মন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসনিা মোহাম্মদ নাসেমের মৃত্যুতে শোক বার্তায় বেলেন‘আমি দীর্ঘদিনের একজন বিস্বস্থ সহযোদ্ধা হারালাম। পিতার মতোই মোহাম্মদ নাসিম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শের ধারা বহন করে গেছেন।
আগেই উল্লোখ করেছি,আওয়ামী লীগের কিছু নেতা আছেন তাদের কর্মকান্ডের মাঝেই প্রমান রাখেন যে, তাঁরা কত বড় মাপের নেতা। তাদেরই অন্যতম নাসিম ভাই। নাসিম ভাইয়ের সাথে আমার ঘনিষ্টতা সেই ‘৮৬ সালে।তখন তিনি আওয়ামী লগের প্রচার সম্পাদক সম্পাদক। সেবারই তিনি প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।হন, সংসদের বিরোধীদলীয় হুইপ।চিফ হুইপ ছিলেন আবদুল জলিল।আসাদুজ্জামান ছিলেন বিরোধী দলীয় উপনেতা।কালাম ভাইও তখন (অধ্যক্ষ আবুল কালাম মজুমদার )অভিজ্ঞ পাল্যামেন্টেরিয়ান হিসাবে পরিচিত। বিরোধী দলীয় সদস্য হিসাবে তাঁরা তখন একটি টিমওয়ার্ক হিসাবে সংসদের সব কাজকর্ম করতেন অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ভাবে।এমপি হোষ্টেলে কালাম ভাইয়ের কক্ষে বসতো সভা। সেখান থেকে পূর্ব প্রস্ততি নিয়ে তাঁরা যেতেন সংসদে। সংসদের প্রশ্ন-উত্তর পর্ব থেকে শুরু করে কল এ্যটেনশন নোটশ,মুলতবি প্রস্তাব কিংবা বাজেট বা রাষ্ট্রপতির ভাষনের উপর আলোচনা, সব কিছুই হতো পূর্ব প্রস্তুতি নিয়ে। সেসময় মোস্তফা মোহসিন মন্টু, নুরুল মজিদ হুমায়ুন(বর্তমান বাণিজ্য মন্ত্রী),আর মহিউদ্দিন ভাইও আসতেন প্রশ্ন তৈরী করতে। প্রশ্ন নিয়ে একটা প্রতিযোগিতা চলতো। আগে জমা দিলে, আগে সংসদে উপস্থাপিত হবে-এই নিয়মের কারনে সচিবালয়ে প্রশ্ন জমা দেয়ার বিষয়টি ছিলো খুবই গুরত্বপূর্ণ।সব প্রস্তুতি শেষে পর দিন সকালে ফজরের নামাজের পর থেকেই সচিবালয়ে গিয়ে লাইন দিতে হতো আমাদের। আটটায় অফিস খুলতো। আমার সাথে অনেক সময় টিটু(কুমিল্লার টিটু ভূইয়া) থাকতো। কালাম ভাইয়ের রুম থেকে সংসদ সচিবালয় ছিলো অনেক কাছে ।ফলে আমাদের আগে কেউ সেখানে পেঁছুতে পারতো না।
সেসময়ই নাসিম ভাইয়ের সাথে আমার খুবই ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে উঠে।ওনাকে সবসময় হাসি মুখ নিয়েই আমার সাথে কথা বলতে দেখেছি।তিনি কাজের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত নিষ্ঠাবান।পরবর্তিতে ‘৯১ সালে নানা ষড়যন্ত্রের কারনে কালাম ভাই এমপি নির্বাচিত হতে পারেন নাই। নাসিম ভাই, সেবারও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দেখা হলেই বলতেন, এখন আর আগের মতো সংসদে কাজ করতে উৎসাহ,আনন্দ পাই না। কালাম ভাই নেই। নেই গুছানো, পরিকল্পিত সংসদিয় কাজকর্মও।‘৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে নাসিম ভাইপ্রথবারের মতো মন্ত্রী হন।তখনো ওনার সাথে আমার সম্পর্ক ছিলো আগের মতোই।তখন অবশ্য পেশাগত দায়িত্বেই যেতাম নাসিম ভাইয়ের কাছে।ওনার সাথে তখন দেখা হতো ওনার বাসায়।
নাসিম ভাই,তাঁর পিতা শহীদ মনসুর আলীর মতোই,চিরদিন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে লালিত রাজনীতি করে গেছেন। সামান্য সময়ের জন্যে আদের্শচ্যুত হননি। সবসময় তিনি তাঁর পিতাকে স্নরণ রাখতেন। একবার ‘চিত্রবাংলা‘র ঈদ সংখ্যার জন্যে নাসিম ভাইয়ের একটি ইন্টারভিউ নিয়েছিলাম।হাতের কাছে সেই সংখ্যাটি পেয়ে গেলাম।দেখলাম, সেখানেও তিনি তাঁর পিতাকে স্নরণ করে বক্তব্য রেখেছেন। বলেছেন,শহীদ পিতার বেদনাময়,কিন্তু প্রত্যয়ী মুখটি চির স্নরণীয় হয়ে রয়েছে।

নাসিম ভাইয়ের অনুস্মৃত নীতিআদর্শের কারণে বহুবার নির‌্যাতিত হতে হয়েছে ,তাঁকে সহ্য করতে হয়েছে অত্যাচার। বার বার কারাবরণও করতে হয়েছে।‘৭৫ পরবর্তী তাঁর পিতাসহ চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করার পরও খুনি চক্র নাসিম ভাইকেও সহ্য করতে পারে নাই। ফলে ওনাকেও জেলে পাঠানো হয়।একইভাবে এরশাদের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন, বিএনপি-জামায়েত আমল, এমনাক সেনা সমর্থীত সরকারের আমলেও নাসিম ভাইকে চরম ভাবে নির‌্যাতন ও কারা ভোগ করতে হয়।সেসময় সংস্কারের নামে অনেক নেতা আদর্শচ্যুত হলেও,শত নির‌্যাতন নাসিম ভাইকে সামান্যটুকু আদর্শবিচ্রুত করতে পারেনি।
তবে নাসিম ভাইকে চরম ভাবে নির‌্যাতনের শিকার হতে হয়,‘৯৬ সালে বিএনপি-জামায়েতের একতরফা নির্বাচনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে। সেসময় নাসিম ভাই ও মতিয়া চৌধুরকে রাস্তার উপর ফেলে নির‌্যাতন করা হয়েছিলো। সেই অন্দোলনে শেষ পর‌্যন্ত বিএনপি-জামায়েত জোটকে চুড়ান্ত ভাবে পরজিত হয়ে সেনাসমর্থিত সরকারের হাতে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হতে হয়।এমনি একজন আদর্শবান নেতার সততা নিয়েও অনেকেই প্রশ্ন তুলেন। আসলে আমি নাসিম ভাইকে যতটা চিনেছি,তাতে দেখেছি উনি ছিলেন খুবই উদার প্রকৃতির লোক এবং সহজেই সকলকে বিশ্বস করেন। এর পরিনতিতেই ওনার পিএসসহ পারিবারীর ঘনিষ্ঠজন অনেক কেলেঙ্কারি ও দূর্নীতির সাথে জড়িয়ে পড়লেও তিনি তাদের নিয়ন্ত্রন করতে পারেননি। ওনার এই উদারতার কারেনে দলের সভানেত্রী,বঙ্গবন্ধু কন্যা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা,নাসিম ভাইকে খুবই বিশ্বাস এবং নির্ভর করতেন। আর করতেন বলেই বার বার বিভিন্ন গুরত্বপূর্ন মন্ত্রনালয় ও দলীয় দায়িত্ব অর্পন করেছেন তাঁর উপর।
নাসিম ভোইয়ের মতো এমনি বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ও কর্মময় জীবনের অবসান মানতে মন চায়না। তারপরও প্রকৃতির নিয়মেই তিনি চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে।দুঃখজনক হলো দলের ত্যগী,আদর্শবান ও অভিজ্ঞ নেতা কমে যাচ্ছে। আল্লাহ, নাসিম ভাইকে বেহস্থ দান করুন।