শুক্রবার ৭ অগাস্ট ২০২০
  • প্রচ্ছদ » sub lead 2 » ভালো নেই জাফরাবাদ গুচ্ছ গ্রামের ১৫০টি পরিবার


ভালো নেই জাফরাবাদ গুচ্ছ গ্রামের ১৫০টি পরিবার


আমাদের কুমিল্লা .কম :
16.06.2020

সৈয়দ খলিলুর রহমান বাবুল, দেবিদ্বার।।
কুমিল্লার দেবিদ্বারে একটি গুচ্ছ গ্রামের ৫০টি পরিবার বেড়ে হয়েছে ১৫০ টি পরিবার। পুরাতন ঝরাজীর্ণ ঘরে থাকতে হয় গাদা-গাদি করে। নেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার উপায়। দারিদ্র্য আর ক্ষুধার কাছে হার মানছে করোনা ঝুঁকি। উপজেলার ১৫ নং বরকামতা ইউনিয়নের জাফরাবাদ গ্রামের আবাসন প্রকল্প (গুচ্ছ গ্রাম) সরেজমিনে ঘুরে এবং এর বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ২০০৫ সালে তৎকালীন সরকার দরিদ্র সীমার নিচে বসবাস করা ভূমিহীন পরিবার গুলোর প্রত্যেক পরিবারকে বসত বাড়ির জন্য ৩.৮৬ শতাংশ এবং পুকুর ১.৬৪ শতাংশসহ সর্বমোট ৫.৫০ শতাংশ খাস জায়গা দলিলমূলে প্রদান করে। সেই সাথে সেখানে সকলের বসবাসের জন্য ৫০টি পরিবারকে ৫টি লম্বা টিনশেড ঘর নির্মাণ করে দেয়া হয়। যার প্রতিটিতে দশটি পরিবার থাকার সুবিধা আছে। কিন্তু কালক্রমে পরিবার গুলোতে সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে সেই একই জায়গায় বর্তমানে পরিবারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫০-এ। পুরাতন ঝরাজীর্ণ ঘর গুলোতে একটু বৃষ্টি এলেই পানি গড়িয়ে পড়ে। বর্ষায় স্যাঁতস্যাঁতে অস্বাস্থ্যকর ঘরেই থাকতে হচ্ছে সকলকে।
গত ১৫বছরে পরিবারের সদস্য সংখ্যার বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবারের সংখ্যাও বেড়েছে প্রায় ৩গুণ। কিন্তু জমির পরিমাণ কিংবা আবাসন বাড়েনি। বিয়ের বয়সী মেয়েদের বিয়ে দেয়া হচ্ছে, তাদের আত্মীয় স্বজন বাড়ছে, আতিথেয়তার জন্য কিংবা মেয়ের জামাইর জন্য আলাদা কক্ষ বাড়েনি। উপযুক্ত ছেলেদের বিয়ে করানো হচ্ছে। কিন্তু স্ত্রীকে নিয়ে থাকার আলাদা ঘর জুটেনি। তার পরও সন্তান সন্তুতির বৃদ্ধিটাও থেমে থাকেনি। একটি পরিবারের জন্য একটি কক্ষ মাঝখানে একটি পার্টিশন। এ দু’টি কক্ষেই তাদের মানবেতর জীবন। দেখার যেন কেউ নেই। উপজেলা প্রশাসন থেকে জেলা প্রশাসন পর্যন্ত ধরণা দিয়েও কোন প্রতিকার পাননি।
সীমিত সুযোগ সুবিধার মধ্যে ধারণ ক্ষমতার তিনগুণ অধিবাসীর বসবাসের কারণে গুচ্ছ গ্রামের নারী-শিশুসহ সকলেরই সীমাহীন কষ্ট হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অনেকে। করোনা ঝুঁকি থেকে বাঁচতে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা এখানে কল্পনারও বাইরে। বাসিন্দারা সকলেই দরিদ্র শ্রমজীবী। করোনার কারণে কর্মহীন হয়ে পড়েছে অনেকে। অপ্রতুল সরকারি সহায়তায় অনেকেরই দিন কাটছে মানবেতরভাবে। যারা পেটের দায়ে দূর-দূরান্তে কাজে যাচ্ছেন, স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাবে কাজ শেষে ফিরে আসছেন গুচ্ছ গ্রামে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে।
আশ্রায়ন প্রকল্পের অধিবাসী কারিমা বেগম (৬৫) জানান, ১৫বছর আগে সরকার আমাদের এ বসতি দিয়ে আর খোঁজ রাখেনি। দুই মেয়ের একজন বিয়ে দিয়েছি। এক মেয়ে উপযুক্ত। ঘরের অভাবে কেউ আত্মীয়তা করতে আসছেনা।
আলাউদ্দিন (৩৫) জানান, সরকারি অনুদানের ২৫০০টাকার জন্য ৩৮জন আবেদন করে ১৫জনের বরাদ্ধ পেলেও মাত্র দুইজন টাকা পেয়েছে। করোনাকালীন সহযোগিতায় আমরা এ আশ্রায়ন প্রকল্পে একবার ১০০ কেজি চাউল, আরেকবার ১০০ কেজি চাউল এবং সর্বশেষ ৫ কেজি চাউল পেয়েছি। এছাড়া গত ১৫বছরে সরকারের কোন ধরনের সহযোগিতা না পেলেও ১০টাকা কেজি চাউলের বরাদ্ধ থেকে আমরা ১১জন কার্ডধারী এ পর্যন্ত ৪বছরে ১৭বার চাউল পেয়েছে। যদিও সবাই পাওয়ার উপযুক্ত।
জরিনা বেগম জানন, আমার ছেলে বিয়ে করিয়ে জায়গার অভাবে এখন ঘরে থাকাকাই দায় হয়ে পড়েছে। ৪ মেয়ের মধ্যে ২ মেয়ে বিয়ে দিয়েছি। আশ্রায়ন প্রকল্পের অধিবাসী হওয়ায় সামাজিকভাবে ও বিয়ে- সাদীর ক্ষেত্রে আমরা ভিক্ষুকের চেয়েও মানবেতর জীবন যাপন করছি। আমাদের এ প্রকল্পের অধিবাসীরা আগে একজন বয়স্ক ভাতা পেত এখন ৩জন, ১ জন প্রতিবন্ধী ভাতার তালিকায় নতুন করে হয়েছে।
জাফরাবাদ গ্রামের নজরুল ইসলাম বলেন, আমরা অস্বচ্ছল পরিবার বিধায় প্রত্যেক মৌসুমেই আমাদের নানা সমস্যার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। আমাদের পরিবারগুলো বড় হচ্ছে। প্রশাসন ছাড়া এই সমস্যা থেকে মুক্তির উপায় নেই। তিনি বলেন, কুমিল্লা ডিসি অফিসে গিয়ে আমাদের সমস্যার কথা জানিয়েছি। দেবিদ্বার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং এসিল্যান্ড-এর বরাবর দরখাস্তসহ সরাসরি কথা বলেছি। তারা আমাদের সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিলেও এখনো কোন কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়নি। আমাদের গুচ্ছগ্রামবাসীর একটাই চাওয়া, সরকারি কোনো উর্ধ্বতন কর্মকর্তা সরজমিনে এসে আমাদের সমস্যা গুলো দেখুক। তা ছাড়া বিদ্যমান পরিস্থিতিতে প্রত্যেক পরিবারের বরাদ্দকৃত জমির সীমানা নির্ধারণ করে দেয়া এবং প্রতিটি ঘর পুনঃনির্মাণ করে দেয়া জরুরী।
এব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাকিব হাসান’র সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বিষয়টা সম্পর্কে আমরা অবগত আছি। করোনাকালীন সময়ে আশ্রয়ন প্রকল্পগুলো সংস্কার বা নতুন করে আবাসন প্রকল্প বৃদ্ধি করার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের। বরাদ্ধ পেলে সংস্কার কিংবা অন্য জায়গায় আবাসন বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা হবে। তবে এ সময়ে তাদের খাদ্য নিরাপত্তাসহ নানাভাবে সহযোগিতা করা হচ্ছে।