বুধবার ৮ জুলাই ২০২০


আমার বাজেট ভাবনা-১


আমাদের কুমিল্লা .কম :
17.06.2020

নাসির উদ্দিন।।

হাস্যকর! বাজেট নিয়ে এই তির্যক মন্তব্যটি পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুরের। সিপিডির ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম বলেছেন ‘অবাস্তব ও কল্পনাপ্রসূত’।

কিন্তু কেন? সাধারণত বাজেটকে আয় ব্যয় ও ঘাটতি এই তিনভাবে মূল্যায়ন করা হয়। এক্ষেত্রে সব কটি ক্ষেত্রকেই এই বিশেষণে আখ্যায়িত করছেন অর্থনীতিবিদগণ।

প্রথম কারণঃ
আমরা জানি, বাজেটের সব হিসাব নিকাশ হয় সাধারণত সংশোধিত বাজেটের ওপর ভিত্তি করে। সংশোধিত বাজেট হচ্ছে পূর্ববর্তী অর্থবছরের আয়-ব্যয়ের সর্বশেষ চিত্র। এই সংশোধিত বাজেটে আমরা দেখেছি, বিদায়ী অর্থবছরের ৮ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) প্রবৃদ্ধিকে কোভিড-১৯ দুর্যোগের কারণে; সংশোধন করে ৫ দশমিক ২ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। এই মহামারী এখনো রয়েছে এবং কবে এ-র থেকে মুক্তি মিলবে তাও অনিশ্চিত।

এমতাবস্থায় আগামী অর্থবছরে আবারও জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ২ শতাংশ। কোথা থেকে কিভাবে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে তা নিশ্চিত করা হয়নি প্রস্তাবিত বাজেটে। অর্থমন্ত্রী দ্যা ইকোনমিস্টের একটি প্রতিবেদনের উপর ভরসা করেছেন। পত্রিকাটি বিশ্বের উদীয়মান সবল অর্থনীতির ৬৬ দেশের তালিকায় রেখেছে বাংলাদেশকে। অথচ বিশ্ব ব্যাংক সেখানে আগামী অর্থবছরে এক শতাংশ মতো প্রবৃদ্ধির কথা বলেছে, সেখানে এই ‘টার্গেট’ কীভাবে সম্ভব? ফলে জিডিপির এই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণকে অতিরঞ্জিত মনে করা হচ্ছে।

বিগত বছরগুলোতে বাজেটের ব্যয় নিয়ে বিভিন্ন স্তরে আলোচনা হতো। এসব আলোচনায়, রাজস্ব ভিত্তি বাড়ানো, সামাজিক খাতে অধিক বরাদ্দ, প্রবৃদ্ধি চাঙ্গাকারী প্রকল্প নির্বাচন ও যথাসময়ে তা বাস্তবায়ন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি, বিতর্কের ঊর্ধ্বে ক্রয় প্রক্রিয়া, বাজেট প্রণয়ন ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পৃক্ততা বাড়ানো এবং বাজেটারি বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় জনপ্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতো। এবছর এ ধরনের আলোচনার সুযোগ ছিল না। ফলে বাজেট তৈরিতে তথ্য উপাত্তের যথেষ্ট ঘাটতি ছিলো। তবে আগামী অর্থবছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোর অন্যতম ছিলো স্বাস্থ্যখাত এবং কর্মসংস্থান। স্বাস্থ্যখাতের বিষয়টি সরকার আমলে নিতে বাধ্য হয়েছে, স্বাস্থ্যবিভাগের অচলাবস্থাকে দেখে। কিন্তু এর কেনাকাটার যে অনিয়ম, লুটপাট ও অব্যবস্থাপনা সে বিষয়ে উন্নতি ঘটানোর কোনো দিক নির্দেশনা এখনও অনুপস্থিত। আগামী বছর দেশে বেকারত্ব যে ভয়াবহ অবস্থায় পৌঁছাবে সেটা এখনই টের পাওয়া যায়। এ বিষয়ে বাজেটে সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা পাওয়া যায়নি।

দ্বিতীয় কারণঃ
আমরা হয়তো জানি, সরকারের এক অর্থবছরের আয়ের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা যেটুকু বেশি হয়, সেটুকুই হচ্ছে বাজেট ঘাটতি। আয় কম হলে উন্নয়নকাজে ব্যয় কম হওয়ার কথা। কিন্তু সরকারের চলমান প্রজেক্টগুলোর উন্নয়নকাজ অব্যাহত রাখতে এবং অন্যান্য নতুন নতুন প্রকল্পে ব্যয় বাড়াতেই করা হয় ঘাটতি বাজেট। ২০১৯-২০ অর্থবছরেও ১ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি রেখে ৫ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ হয়েছিল। সংশোধিত বাজেট ২২ হাজার কোটি টাকা কমে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা। ২২ হাজার কোটি টাকা ব্যয় কম হলেও ঘাটতি কমেনি, বরং ঘাটতি ১ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের ১ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকার ঘাটতির সঙ্গে আরও ১ শতাংশ বা ৩০ হাজার কোটি টাকা বেড়ে ঘাটতি দাঁড়ালো ১ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা। যা ইতিহাসে সবচেয়ে বড়ো ঘাটতির বাজেট।

এ অবস্থায় আগামী অর্থবছরের জন্য আবারও ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি বাজেট প্রস্তাব করা হলো। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই যে আয় কম অথচ ব্যয় বৃদ্ধির যে পথে হাঁটছে সরকার, এই ব্যবস্থা কি দেশের জন্য স্বাস্থ্যকর? উন্নয়ন কাজ অব্যাহত রাখার স্বার্থে কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ ঘাটতি বাজেটকে সমর্থন করেন। এবছর দেশে অধিক সংখ্যক মানুষ বেকার হয়ে পড়ার আশঙ্কার কারণেও অনেকে ঘাটতি বাজেটকে সমর্থন করছেন। কারণ উন্নয়ন কাজ বাড়লে মানুষের কর্মসংস্থান বাড়বে।

তবে বিপক্ষেও যুক্তি আছে। ঋণের বিপরীতে সরকারকে চড়া সুদ দিতে হয়। বাজেটের উল্লেখযোগ্য অংশই ব্যয় করতে হয় সুদ পরিশোধে। ফলে আর্থিক খাতে ঝুঁকির মাত্রা বেড়ে যায় এবং কমে যায় বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ। অনেক অর্থনীতিবিদ এ জন্য ঘাটতি বাজেটের বিপক্ষে। এই ঋণের সুদের বোঝা একসময় গোটা রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে গিলে ফেলতে পারে। যেমনটি পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার বেলায় দেখা যায়। বাংলাদেশকেও আগামী অর্থবছরে ঋণের সুদ ও কিছু ঋণ পরিশোধ বাবদ ৬৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখতে হয়েছে। যা মোট প্রস্তাবিত বাজেটের প্রায় নয় শতাংশ এবং জিডিপির ২ শতাংশেরও বেশি।

ঘাটতি বাজেট ভালো কি মন্দ, এই প্রশ্নের আগে জরুরী প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারের সামনে এই ঘাটতি পূরণের সুযোগ আছে কি? প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী বলেছেন বিদেশ থেকে ৭৮ হাজার কোটি টাকা এবং দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে ৮৫ হাজার কোটি টাকা ঋন নেবে সরকার।
চলতি অর্থবছরেও বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিলো ৭৫ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা। ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে পুরো অর্থবছরে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিলো ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। যদিও ব্যাংক থেকে প্রথম ৬ মাসেই সরকার ৫৩ হাজার কোটি টাকা নিয়ে ফেলেছে। সঞ্চয়পত্র থেকে ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার কথা ছিলো। এই খাতে জনগনের বিনিয়োগ কম হওয়ায় সরকার নিতে পেরেছে মাত্র ৭ হাজার কোটি টাকা। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ আর বাড়বে বলে কেউ মনে করছেন না। দেশের ভঙ্গুর ব্যাংক ব্যবস্থা থেকেও সরকার আর বেশী ঋণ নিতে পারবে না। নিলে ব্যাংকগুলোর ব্যবসা অর্থাৎ বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ শূন্যে নেমে আসবে।

তৃতীয় কারণঃ
চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিলো ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। রাজস্ব আদায় কম হয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রাও ধার্য্য করা হয়েছে ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। এনবিআর চেয়ারম্যান ইতিমধ্যেই সরকারকে চিঠি দিয়ে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অসম্ভব বলে জানিয়ে দিয়েছে। কারণ আমরা জানি, রাজস্ব ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি রয়েছে। এর মানে সরকার এবার যে লক্ষ্যমাত্রা দিয়েছে, তাতে দেড়গুণ বেশি বা ৫ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে হবে। যা চলতি অর্থবছরে যা আদায় হয়েছে তার দ্বিগুণ। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই হারে রাজস্ব আদায় অসম্ভব বললেও কম বলা হবে। আর দেশের ইতিহাসে এমন উদাহরণ নেই।
লেখক : কুমিল্লা প্রেস ক্লাবের সাবেক সহ সভাপতি ও সমাজ বিশ্লেষক । লেখককে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারেন-০১৭১১-৩২৭৪৮।