বৃহস্পতিবার ২ জুলাই ২০২০


সরকার ক্লান্ত এবং বিশ্রাম দরকার


আমাদের কুমিল্লা .কম :
18.06.2020

নাসির উদ্দিন।।
প্রথম পর্বে বলেছিলাম বাজেট হচ্ছে আয় ব্যয় ও ঘাটতির হিসাব। এ তিনটি ছাড়াও উদ্বৃত্ত বলে আরও একটি বিষয় আছে। সরকারের যে বাজেটে আয় বেশী ব্যয় কম হয় সেই বাজেটকে উদ্বৃত্ত বাজেট বলে। ফলে ঘাটতি বাজেটের জায়গায় সরকার যদি উদ্বৃত্ত বাজেট করে তখন হিসেব পাল্টে আয় ব্যয় এবং উদ্বৃত্ত অংকের হিসাব করতে হবে। প্রসঙ্গটি উল্লেখ করলাম, কারণ অনেকে লিখেছেন বাজেট বুঝেন না। কিন্তু আমার লেখাটি তাদের কাছে কিছুটা সহজ মনে হয়েছে। সেই সৎ পাঠকদের জন্যই আমার এ লিখা।
আরেকটি কৈফিয়ত দিয়ে নেই, অনেক বন্ধুই বাজেটের মতো বিষয় লিখায় বিরক্ত হয়েছেন। আপনাদের প্রতি আমার অশ্রদ্ধা নেই। আপনার মতামতের ভিত্তিও নিশ্চয়ই অনেক জোড়ালো। তবে আমি মনে করি দেশের লেখাপড়া করা সকল মানুষেরই উচিত বাজেট সম্পর্কে ধারণা রাখা। উন্নত বিশ্বের মানুষ রাজনীতি নিয়ে সারা বছর ঝগড়াঝাটি করে না, কিন্তু বাজেট নিয়ে সবাই সোচ্চার থাকে। কারণ এতে তাদের স্বার্থ জড়িত। রাজনীতির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয় শুধু নির্বাচনের সময়। আমরা এমনই এক সংস্কৃতি ও সভ্যতা গড়ে তুলেছি যে, নিজের স্বার্থের বিষয়ে ভাবতে শিখিনি। শিখেছি রাজনীতির নামে দুই রাজবংশের দাসত্ব করতে। এবং নিজের পছন্দের বংশের ব্যক্তিকে ক্ষমতায় দেখতে, আর অপছন্দের বংশকে আকন্ঠ নিন্দাবাদ করতে। এই অসভ্যতা যতদিন বন্ধ না হবে ততদিন আমাদের অধপতনের সবচেয়ে বড় দায় আমার মতো অসভ্য মানুষের ওপরই বর্তাবে।
আমি অর্থনীতিবিদ নই। ফলে আমার দৃষ্টি এবং দৃষ্টিভঙ্গি দুই ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। যদিও আমি সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকেই বাজেটের ভেতরের দিকের কিছু বিষয় মূল্যায়ন করতে চাই।
১.
যেহেতু তাৎক্ষণিক মূল্যবৃদ্ধির মতো ঘটনা ঘটেনি, ফলে এবারের বাজেট নিয়ে হৈচৈ নেই। কিন্তু বাজেটের কিছু সুক্ষ্ম বিষয় সর্বস্তরের মানুষকে ক্রমান্বয়ে ভোগান্তিতে ফেলবে। এর অন্যতম হচ্ছে কর। বাজেটে অর্থবিলের মাধ্যমে আয়কর ও ভ্যাট আইন সংশোধন করে ব্যাপক করের জাল বিছানো হয়েছে। এই জালে গরীব, মধ্যবিত্ত ও বিত্তবান সব শ্রেণীর মানুষই আটকা পড়বেন। বাজেটে করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) ধারীদের আয়কর রিটার্ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অধ্যাদেশ অনুযায়ী রিটার্ন জমা না দিলে তিন ধরনের জরিমানা গুণতে হবে। ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকে অগ্রগতির পাশাপাশি মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে। এতে অনেক নাগরিক আয়কর দেয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছেন। আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকায় টিআইএনধারী অর্ধেকেরও বেশী আয়কর রিটার্ন জমা দেন না। ফলে অনেক টিআইএনধারীর করযোগ্য আয় থাকা সত্ত্বেও রিটার্ন দাখিল না করে কর পরিশোধ এড়িয়ে যাচ্ছেন। উল্লেখ্য বর্তমানে দেশে টিআইএনধারী রয়েছে ৪৬ লাখের বেশি। ২০১৯-২০ অর্থবছরে রিটার্ন জমা দিয়েছেন প্রায় ২২ লাখ করদাতা।
ব্যক্তি উদ্যোগে পরিচালিত ব্যবসায় বসানো হয়েছে ন্যূনতম কর। বার্ষিক টার্নওভার তিন কোটি টাকার বেশি এমন সব প্রতিষ্ঠানকে করের আওতাভুক্ত করা হয়েছে। এমনকি লোকসান হলেও টার্নওভারের সীমা অতিক্রম করলেই দশমিক ৫০ শতাংশ হারে আয়কর দিতে হবে। অর্থাৎ তিন কোটি টাকার পণ্য বিক্রি করে লাভ-লোকসান যাই হোক, ন্যূনতম দেড় লাখ টাকা আয়কর দিতে হবে। সব ধরনের ব্যবসায় এ করের আওতায় পড়বে।
এছাড়া চাল, ডাল, আটা, ময়দা, চিনি, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, হলুদ, শুকনা মরিচ, ভুট্টা, লবণ, সব ধরনের ভোজ্যতেল, গোলমরিচ, দারুচিনি, এলাচ, লবঙ্গ, তেজপাতা, মটরশুঁটি, পাট, তুলা, সুতা, আম, লিচু, কাঠালসহ সব ধরণের ফল ক্রয় ও সংগ্রহের ক্ষেত্রে এবং কম্পিউটার ও কম্পিউটারসহ সকল ক্ষেত্রে স্থানীয় এলসির মাধ্যমে লেনদেন করলে উৎসে ২ শতাংশ কর প্রস্তাব করা হয়েছে। আগে স্থানীয় এসব কেনায় উৎসে কর ছিল না। এই করারোপে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য এবং ব্যাংক ব্যবস্থার বাইরে নগদ লেনদেনের প্রবণতা বাড়বে।
মোবাইল ফোন সেবার ওপর সম্পূরক শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে।
নতুন নিয়মে, কোনো গ্রাহক ফোনে ১০০ টাকা রিচার্জ করলেই ২৫ টাকা সরকার ট্যাক্স-ভ্যাট হিসেবে পাবে। যা গত ১১ জুন ২০২০ বৃহস্পতিবার থেকেই কার্যকর হয়েছে।

২.
চলতি অর্থবছরের বাজেটে দেশে মোট বিনিয়োগের লক্ষ্য ছিল জিডিপির ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ। এর মধ্যে সরকারি বিনিয়োগ ৮ দশমিক ৬ এবং বেসরকারি বিনিয়োগ ২৪ দশমিক ২ শতাংশ। কিন্তু করোনার কারণে অর্থবছরের শেষ ৩ মাসে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে যায়। এ কারণে সংশোধিত বাজেটে লক্ষ্য কমিয়ে আনা হয়। সংশোধিত বাজেটে মোট লক্ষ্য ধরা হয় ২০ দশমিক ৮ শতাংশ। এক্ষেত্রে সরকারি বিনিয়োগ ৮ দশমিক ০৮ করা হয়। আর বেসরকারি বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা ৫০ শতাংশ কমিয়ে ১২ দশমিক ৭২ শতাংশ করা হয়। কিন্তু করোনার কারণে সেটিও অর্জন সম্ভব হবে না।
এ অবস্থায় আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারি বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা ৮ দশমিক ১ এবং বেসরকারি বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা দ্বিগুণ বাড়িয়ে ২৫ দশমিক ৩ শতাংশ করা হয়েছে। এই ৩৩ দশমিক ৫ শতাংশ বিনিয়োগ নির্ধারণের পক্ষে যৌক্তিকতা এবং দিকনির্দেশনা বাজেটে নেই। ফলে এই বিনিয়োগ লক্ষ্যমাত্রা যে অন্তঃসারশূন্য, একথা নির্দ্বিধায় বলে দেয়া যায়। কারণ করোনার কারণে দেশের অর্থনীতির অবস্থা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় সেটাই অনিশ্চিত।
৩.
করোনায় দেশে ইতিমধ্যেই সৃষ্টি হয়েছে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট। এই সংকটে নতুন করে অসংখ্য পরিবার দুর্ভিক্ষাবস্থায় পড়েছে। দেশে করোনার পূর্বে দারিদ্র্যের হার ছিলো ২১ দশমিক ৮ শতাংশ এবং অতি দারিদ্র্যের হার ছিলো ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। বিভিন্ন সংস্থার মতে ইতিমধ্যেই দেশের ৪০ শতাংশ মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে চলে গিয়েছে এবং অতি দারিদ্র বেড়ে ২১ শতাংশে পৌঁছেছে। বাজেটে এই অবস্থা ঠেকানোর লক্ষ্যে নিরাপত্তাবেষ্টনীর ঘোষণা অপর্যাপ্ত। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে সংশােধিত বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ ছিলো ৮১ হাজার ৮৬৫ কোটি টাকা। আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরে এই খাতে মাত্র ১৪ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে মােট ৯৫ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
৪.
করোনার কারণে দেশের স্বাস্থ্যসেবাখাতের যে দুরবস্থা ফুটে উঠেছে তাকে ভয়াবহ বললেও ভদ্রতা করা হবে। দেশ পরিচালনায় আমাদের অদূরদর্শীতার গভীরতা যে কতো প্রকট, সংকটে এসে এই মন্ত্রণালয় থেকেই আমরা একটা জাতীয় শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি। তদুপরি এবারের বাজেটে এই সংকট থেকে উত্তরণের কোনো ঘোষণা আসেনি। শুধুমাত্র করোনা পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য ১০ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আর মূল বাজেটে চলতি অর্থবছরের সাথে মাত্র ৩ হাজার কোটি টাকা বেশী বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। অথচ করোনাভাইরাস মহামারির কারণে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে স্বাস্থ্য খাতে কতটা সংস্কার দরকার। দেশের পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থাই ভঙ্গুর। সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা এবং সেবা কোনোটাই নেই দীর্ঘদিন। আর বেসরকারি হাসপাতালগুলো যে সংকটে তালাবদ্ধ হয়ে যায়, এ নিয়ে রাষ্ট্রের কোনো দায় আছে বলে মনে হয়নি। স্বাস্থ্য বিষয়ক সরকারি কর্মকর্তাদের অর্থ ব্যবহার করার সক্ষমতার চেয়ে অপব্যবহার ও লুটপাটের দক্ষতা নিয়ে অসংখ্য অভিযোগ। অথচ ভবিষ্যতে এই অনিয়ম দুর্নীতি ঠেকাতে দক্ষ, পেশাদার ও বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করা হবে কি-না এ বিষয়ে কোনো ঘোষণা নেই। অর্থাৎ স্বাস্থ্যখাতের সংস্কারের বিষয়ে মানুষের যে আকাংখা তার প্রতিফলন নেই।
এর বাইরে কৃষি ও কর্মসংস্থানের বিষয়টি এবার অগ্রাধিকারের প্রয়োজন ছিল। যা প্রতিফলিত হয়নি। যেটুকু হয়েছে তাতে আস্বস্ত হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ বিনিয়োগ লক্ষ্যমাত্রা যে অর্জিত হবে না, সেটা স্পষ্ট। আর বিনিয়োগের অর্থসংস্থানও অনিশ্চিত।
আমাদের দেশের সবচেয়ে বড়ো সমস্যার নাম বাজেট বাস্তবায়নে অক্ষমতা। যেহেতু অদূরদর্শী রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং তারচেয়েও অযোগ্য ও অদক্ষ আমলার কাঁধে ভর করে দেশ চলছে, সেহেতু এরা কেবল চুরিই বুঝে, পরিকল্পিত কাজ বুঝে না।
অথচ সরকারের বিবেচনা হওয়া উচিত ছিলো সর্বক্ষেত্রে পরিকল্পনা, সংস্কার এবং একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্রকাঠামোর পরিস্থিতি তৈরী করা। সামষ্টিক অর্থব্যবস্থার অগ্রগতিকে প্রাধান্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়া। যেহেতু দীর্ঘ মেয়াদে একই সরকার রয়েছে তাদের সামনে সেই সুযোগও ছিলো। কিন্তু এই সরকার মানুষের কথা বিবেচনা না করে শুধুমাত্র মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির প্রতি যে মোহ, সেখানেই লক্ষ্য স্থির করেছে। যে কোনো সংকটের সময় সুশাসনের অভাব ও সংস্কারের দুর্বলতাগুলো প্রকট হয়ে উঠে। এবারও তাই হয়েছে, বরং আমার কাছে মনে হয়েছে সরকার ক্লান্ত এবং বিশ্রাম দরকার।
লেখক : কুমিল্লা প্রেস ক্লাবের সাবেক সহ সভাপতি ও সমাজ বিশ্লেষক,০১৭১১-৩২৭৪৯৮।