শুক্রবার ৪ ডিসেম্বর ২০২০


করোনাকালের মানবিক মহাকাব্য


আমাদের কুমিল্লা .কম :
19.06.2020

সৈয়দ নুরুর রহমান।।

প্রতিদিন পত্রিকা কিংবা টিভি নিউজে করোনা নিয়ে অসংখ্য নেতিবাচক সংবাদে আমরা বিপর্যস্ত প্রায়। আমদের যাপিত জীবনে এতোবেশি অমানবিক সংবাদে আমরা অভ্যস্থ হয়ে গেছি যে, এখন আর ভাবি না এটা কিভাবে সম্ভব। এই করোনাকালে যত্রতত্র সংবাদ আসে করোনা পজেটিভ বাবা মাকে তাদের সন্তানেরা রাস্তায় কিংবা হাসপাতালের বারান্দায় ফেলে রেখে পালিয়েছে। করোনা আক্রান্ত কিশোর সন্তানকে কাথা মুড়িয়ে বাবা মা বাশঝাড়ে ফেলে পালিয়েছে। করোনা আক্রান্ত গৃহকর্তাকে বাড়ির একরুমে মৃত্যু পর্যন্ত তালা দিয়ে রেখেছে স্ত্রী, ছেলে মেয়েরা। গৃহকর্তা মৃত্যুকালে খাবার কিংবা পানিও পায়নি আপনজনদের কাছ থেকে। মৃত্যুর পর স্বজনরা কাছেও যায় না কেউ। লাশ পড়ে থাকে অনাদর অবহেলায়। স্বজন খুঁজে পাওয়া যায় না। প্রতিবেশিরাও হয়ে উঠে চরম বৈরি।

করোনায় আক্রান্ত হয়ে গেলে মনে হয় যেন কোথাও কেউ নেই। আপনজন হয়ে পড়ে অচেনা। জীবন বাঁচাতে প্রিয়জনরা সরে যায় নিরাপদ দুরত্বে, এ যেন এক নিষ্ঠুর নিয়তি। এক অজানা অচেনা কঠিন পৃথিবী। মা, বাবা, ভাই-বোন, স্বামী- স্ত্রী পরম মমতার সম্পর্কগুলোও যেন বিচ্ছিন্নতা, অবিশ্বাসের কালো মেঘে ঢেকে যায়।

এতোটা বৈরি সময়েও কিছু কিছু আশা জাগানিয়া সত্য ঘটনা আমাদের আশার আলো দেখায়। আমাদের মানবিকবোধে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করে। করোনা ভয় উপেক্ষা করে ভালোবাসার মানুষের জন্য জীবনবাজি রেখে তুমুল লড়াই করা কিছু সাহসী মানুষ আমাদের সামনে নিয়ে আসে নতুন আলোর দিশা। তাদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এই করোনাকালে যেন জীবন্ত ভালেবাসার এক একটা মহাকাব্য।

❤️❤️❤️

বলছিলাম অদম্য সাহসী এক তরুণের কথা। মোহাম্মদ ইকরামুল হক। চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জের হার না মানা সাহসী এই তরুণ করোনা আক্রান্ত মা আর বড় ভাইয়ের সেবায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফ্লোরে ফ্লোরে লড়ছে গত ১০/১২দিন যাবত । করোনা আক্রান্ত হয়ে মা আর ভাই দুইজন দুই ফ্লোরে চিকিৎসাধীন । একবার এখানেতো আরেকবার ওখানে। মা আর ভাইকে বাঁচানোর জন্য নিরন্তর লড়াই যেন তার। হাসপাতালের করোনা ইউনিটে মাকে বুকে জড়িয়ে বিনিদ্র রাত কাটায় ইকরাম। মৃত্যু হলে হবে কিন্তু মা আর ভাইকে সুস্থ করার চ্যালেঞ্জ নিয়ে ইকরাম নিজের জীবন তুচ্ছ জ্ঞান করেছে। জয়তু ইকরাম। তোমার মত সন্তানরা আছে বলেই পৃথিবী এতোটা সুন্দর।

❤️❤️❤️

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করোনা পজেটিভ নিয়ে ভর্তি হয়েছেন বাবা হাসান । হাসান একজন সৌভাগ্যবান বাবা। করোনাকালে রক্ত সম্পর্কীয় স্বজনদের দুরে সরে যাওয়ার অসংখ্য মর্মস্পর্শী ঘটনার ভীড়ে ব্যতিক্রম নজির গড়ে হাসানের পাশে থেকে তার সেবা করছেন ছেলে জনি। তার করোনা হয়নি। অথচ জীবনবাজি রেখে করোনা ইউনিটে পিতার সেবায় বিনিদ্র দিনরাত কাটিয়েছে সাহসী পুত্র জনি। সত্যিকারের সম্পর্ক এমনি হওয়া উচিত। ছেলে অপেক্ষায় আছে কবে তার বাবা নেগেটিভ হয়ে বাড়ি ফিরবে।

❤️❤️❤️

শ্বাসকষ্ট নিয়ে সোনারগাঁ থেকে ঢাকায়

এসেছেন এক স্বামী তার অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে। এ্যাম্বুলেন্সে যন্ত্রণা কাতর অসহায় স্ত্রী। ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে ভর্তির জন্য অপেক্ষারত করোনা আক্রান্ত স্ত্রীকে পরম মমতায় জড়িয়ে অভয় দিচ্ছেন স্বামী ‘কিচ্ছু হবে না, সব ঠিক হয়ে যাবে’.. এ যেন এক অনন্য ভালোবাসার জীবন্ত কাব্য।

❤️❤️❤️

করোনা পজেটিভ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন স্বামী। মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে স্বামীর সেবায় স্ত্রীও স্বামীর সাথে হাসপাতালের করোনা ইউনিটে। এ যেন করোনার সাথে বসবাস। রাত গভীর হয়। অসুস্থ স্বামী হাসপাতালের শয্যায় গভীর ঘুমে মগ্ন। স্বামীর সাথে আসা অসহায় স্ত্রী ক্লান্ত হয়ে একসময়

স্বামীর পায়ের নীচে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়ে।

❤️❤️❤️

দেশের বিভিন্ন হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ভালোবাসার এই ছোট ছোট মহাকাব্যগুলো বেঁচে থাকুক। আমৃত্যু অন্তহীন ভালোবাসা যেন ঘিরে থাকে আমাদের যাপিত জীবন। ভালোবাসা বিহীন অন্ধ পৃথিবীতে আমাদের বেঁচে থাকাটাই হবে যেন অর্থহীন।

লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক,কুমিল্লা প্রেস ক্লাব ও জেলা আইনজীবী সমিতি,কুমিল্লা।-০১৭১১-৩২৯৪৮৭।