বৃহস্পতিবার ২ জুলাই ২০২০


আমার সংগ্রামী বাবা


আমাদের কুমিল্লা .কম :
21.06.2020

মাছুম মিল্লাত মজুমদার।।

আমার বাবার জন্ম ১৯৪২ সালের পরাধীন বৃটিশ ভারতের স্বশাসিত ত্রিপুরা রাজ্যে। তারপর ১৯৬২ সালে হিন্দু- মুসলিম দাঙ্গায় ভিটে-মাটি ছেড়ে পরিবারের সাথে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে পূর্বপাকিস্তানে চলে আসেন।
৮০ ছুঁই ছুঁই বয়সে বাবা সুস্থ শরীরে বেঁচে আছেন পর্যায়ক্রমে ৩টি রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে।
তাঁর শৈশব-কৈশর কেটেছে মহাআনন্দে। ছোট-খাট জমিদারের বড় নাতি হিসেবে হাতির পিঠে চড়া, ঘোড়া দৌড়ানো, খাজনা আদায়ের অভিজ্ঞতা, বন্ধুদের নিয়ে হৈ-চৈ,আর উত্তম-সুচিত্রার রোমাঞ্চ দেখতে দেখতে সময় বেশ ভালই যাচ্ছিল।
হঠাৎ সিনেমার মতো সবকিছু পাল্টে গেল। জমি-জমা কিছু অদল-বদল করা গেলেও নগদ টাকা কোথায়। ৯ ভাই-বোন, বাবা-মা। আগের অবস্থায় আয় রোজগারের কথা ভাবতেই হয়নি। সংসারের দায়িত্ব কাধে তোলে নিলেন।শুরু করলেন ফ্লাইং বিজনেস।এপারের মাল ওপারে আনা-নেয়া।সীমান্তের মানুষ-জন সাধারনত যা করে থাকে। দাদা আফিমে অভ্যস্ত ছিলেন।দাদার জন্য আফিমের যোগান দিতে গিয়ে পাইকারী দরে আফিম কিনে খুচরা দরে ওপারের উপজাতিদের কাছে বিক্রিও করেছেন।কিন্তু অল্পদিনেই উপলব্ধি করলেন এ কাজ বেশীদিন করা যাবেনা।তারপর টেইলারিং শুরু করলেন,সাথে কাপড় দোকান।ত্রিপুরা থাকতে বিদ্যালয়ে ছিলেন গড়হাজির, পরীক্ষায় অনুপস্থিত।তাই মেট্টিক পাস করা হয়ে উঠেনি।পুনরায় স্কুলে ভর্তি হলেন।২০ বছর বয়সে ক্লাস নাইনে। সহপাঠীদের চেয়ে বড় বলে বেশ সমীহ পেতেন। ছাত্ররাজনীতিতে ও সক্রিয় হলেন।ভাল ফুটবলার হিসেবেও নাম কুঁড়ালেন।
প্রচন্ড প্রাণশক্তির অধিকারী মানুষটি পড়ালেখা, ব্যবসা, সংসার চালানো, রাজনীতি, খেলাধুলা, নাট্যচর্চা সমানতালে চালালেন। ইতমধ্যে মেট্টিক পাস করলেন।
এবার শুরু করলেন ইরিগ্রেশন।গ্রামে তখন বৎসরে ১বার ধান চাষ করা হতো। সমিতি গঠন করে নদীতে মেশিন বসিয়ে তিনিই প্রথম সেচপ্রকল্প চালু করলেন।পাশাপাশি আই.এ পাস করলেন। তারপর সংসারী হলেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের বাড়ীর মাটির কাছাড়ি ঘরে মুক্তিবাহিনীর ঘাটি করা হলো। হামদান কাকা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। বাড়ীর সবাই মুক্তিবাহিনীকে সার্বিক সহযোগিতা করেছেন।
স্বাধীনতার পর বাবা ব্যবসা ছেড়ে পূবালী ব্যাংকে চাকুরী নিলেন।(সহকারী অফিসার)। স্বাধীনচেতা মানুষটি ১৪ বছর পর চাকুরী ছেড়ে আবার ব্যবসায় নামলেন। আমাদের ৩ ভাই-বোনকে এম.এ পাস করালেন।এখন অবসর জীবন কাটাচ্ছেন।কিন্তু থেমে নেই তাঁর কর্মতৎপরতা।পূর্বপুরুষদের স্মৃতিরক্ষায় ফাউন্ডেশন গড়ায় হাত দিয়েছেন। পাশাপাশি সাহিত্য চর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন। ইতমধ্যে লিখেছেন আত্মজীবনীগ্রন্থ। সুযোগ পেলেই ঘুরে আসেন নিজের জন্মস্থান বিলোনিয়া (আগরতলা)। পুরোনো বন্ধুদের ২-৪জন এখনো বেঁচে আছেন। এদের একজন সুশান্ত সিংহ রায় যিনি ভিক্টোরিয়া কলেজের প্রতিষ্ঠাতা রায় বাহাদুর আনন্দ চন্দ্র রায়ের ছোটভাই প্রবোধ সিংহ রায়ের নাতি। ওনার হাত ধরেই রায় পরিবারের সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা। বাবা তাঁর পুরোনো বন্ধুদের সাথে সুখ- স্মৃতি বিনিময় করে আমাদের তা গর্ব করে শোনাতে ভালবাসেন।
ভারত- পাকিস্তান- বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে বাবা অনেক চড়াই- উৎরাই পাড়ি দিয়েছেন। সন্ঞয় করেছেন নানা অভিজ্ঞতা।তাঁর বৈচিত্রময় জীবনের একটি ঘটনা উল্লেখ করছি।
একবার বাবাকে ফেনী জজকোর্টৈ সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাড়াতে হয়েছিল।ঘটনাটি ১৯৬৪ সালের জাহাঙ্গীর খন্ডলী নামে এক বিপ্লবী নেতা বাবার দোকানে এসে বললেন, আপনার কাছে একটি জিনিস চাই দিবেনতো? রাত তখন ৮টার কিছু বেশি।বাবা দোকান বন্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।জাহাঙ্গীর খন্ডলীর কথা শুনে ভাবলেন বিপ্লবী নেতা কি আর চাইতে পারে বড় জোর ১ টাকা চাঁদা। বাবা বললেন দেবো। সে খুশি হয়ে বললো, আপনার দোকানের আইয়ুব খানের ফটোটা আমাকে দিয়ে দেন, আমি আমার ঘরে টাঙ্গিয়ে রাখবো।বাবা ছবিটা তাঁকে দিয়ে দিলেন।পরদিন সকালে দোকানে গিয়েই শুনতে পেলেন জাহাঙ্গীর আইয়ুব খানের ৬/৭টি ছবি বাজার থেকে সংগ্রহ করে সবকটি পুড়িয়ে ফেলেছে। পুলিশ তাঁকে রাতেই গ্রেপ্তার করে পরদিন সকালে কোর্টে চালান করে দিয়েছে।আরও শুনতে পেলেন যারা তাঁকে ছবি দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধেও রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা হবে।সবাইকে থানায় নেয়া হলো।থানার ওসি বললেন আপনারা যদি বাঁচতে চান তাহলে সবাই কোর্টে গিয়ে বলবেন জাহাঙ্গীর জোর করে ছবিগুলো নিয়ে গেছে। সবাই ওসির কথায় রাজী হলেন তারপরের ঘটনা বাবার লেখা থেকেই বর্ণনা করা যাক—
“” মামলা চলছে। আমাদের ভাগ্য ভালোই বলতেহয়, রাষ্ট্রদ্রোহিতার আসামী হতে গিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হয়ে গেলাম।কিন্তু মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেল, শুরু হলো বিবেকের সাথে দ্বন্দ্ব। মা-বাবাকে ঘটনা খুলে বললাম।বাবা বিষয়টি তেমন আমলে নেননি। মা শান্ত অথচ দৃঢ় কন্ঠে বললেন, তুমি সত্য কথাই বলবে।
সপ্তাহ খানেক পরে সরকার পক্ষে সাক্ষী দেয়ার জন্য চিঠি আসলো। মনের ভেতরে অজানা শংকা নিয়ে খুব ভোরে বাড়ী থেকে রওয়ানা হলাম।আমার জেঠা আবুল বশর মজুমদারকে (মাষ্টারপাড়া, ফেনী) আগেই জানিয়েছিলাম।ফেনীতে ওনার নাম-ডাক আছে। একবার এমপি ইলেকশন করে (বিলোনিয়ায়)অল্প ভোটে হেরে যান। কোর্টের সীমানায় ঢুকেই দেখতে পেলাম তিনি এবং ফেনীর তৎকালীন এমপি জনাব খাজু মিয়া কোর্টের বারান্দ্য় পায়চারী করছেন।খাজু মিয়া সাহেব আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন,জাহাঙ্গীরকেতো বাঁচাতে হবে। মায়ের কথা মনে পড়লো।মনে মনে বললাম মায়ের জন্যই সত্যকথা বলবো।

কোর্টে সাক্ষী ডাকা শুরু হয়ে গেল। ৪ নম্বর সাক্ষী আমি। আমার ডাক পড়তেই ধুঁরু ধুঁরু বুকে কাঠগড়ায় গিয়ে দাড়ালাম।শপথ নিলাম ” “যাহা বলিব সত্য বলিব, সত্য বৈ মিথ্যা বলিবনা।”” জেরা শুরু হলো। আসামী জাহাঙ্গীর আপনার দোকান থেকে প্রেসিডেন্টের বাঁধাই করা ছবি নিয়ে গেছে? আমার উত্তর “”জ্বী হ্যা””। বাধা দেননি? আমার উত্তর “”না””। কেন? আমি বললাম, জাহাঙ্গীর আমাকে বলেছেন যে, “”আমাকে একটা জিনিস দিবেন”” তখন আমি ভাবলাম হয়তো একটাকা চাঁদা চাইবেন।আমি দেব বলাতে ওনি আমাকে বললেন, “”” আপনার দোকানে টাঙ্গানো আইয়ুব খানের ছবিটা আমার কাছে খুবই সুন্দর লাগছে, ওটা আমাকে দেন আমি আমার ঘরে টাঙ্গিয়ে রাখবো।আমি সরল বিশ্বাসে তাকে দিয়ে দিলাম। সে যে এমনটা করবে তাতো বুঝতে পারিনি।

জজ সাহেব বললেন, “”You may go””.
অন্যসব সাক্ষীরা একই কথা বলে গেল যে, জাহাঙ্গীর জোর করে ছবি নিয়ে গেছে। দুপক্ষের যুক্তিতর্কশেষে মাননীয় বিচারক ১ দিনের জন্য আদালত মূলতবী ঘোষণা করলেন। পরদিন জজসাহেব নিম্নরূপ রায় দিলেন,”” আসামী জাহাঙ্গীর একা এতগুলো ফটো দোকান থেকে জোর করে কিংবা ছিনতাই করে নিয়ে যায়নি। সাক্ষী-সাবুদের বক্তব্য বিচার-বিশ্লেষণে তারই ইঙ্গিত পাওয়া যায়।তবে মহামান্য প্রেসিডেন্টের ছবি পোড়ানো দন্ডনীয় অপরাধ।আসামীর এরূপ অপরাধের জন্য আদালত আসামীকে ১০দিনের কারাদন্ড দেয়া হলো। সেইসাথে মুক্তির পূর্বে কারা কর্তৃপক্ষ আসামীর নিকট থেকে ১০০/ টাকার স্ট্যাম্পে সই করার মাধ্যমে মুছলেখা নিবে যাতে করে সে ভবিষ্যতে এমনতর অপরাধ না করে।আদালত এখনকার মতো শেষ হলো””।
বাবার সত্য সাক্ষী একদিকে বিপ্লবী জাহাঙ্গীরকে কঠিন শাস্তি থেকে রক্ষা করেছে অন্যদিকে মায়ের নির্দেশ বাবাকে সত্য আকঁড়ে ধরার শিক্ষা দিয়েছে।
এমন বাবার জন্য সত্যিই আমি অহঙ্কারবোধ করি। বাবাদিবসে আমার অসীম সাহসী, সংগ্রামী বাবাকে স্যালুট জানাই।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগ , ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ কুমিল্লা।