সোমবার ১৩ জুলাই ২০২০


সরাইল এলজিইডি’র সার্ভেয়ার যখন ঠিকাদার!


আমাদের কুমিল্লা .কম :
23.06.2020

তৌহিদুর রহমান নিটল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ।।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) একটি প্রকল্পের দরপত্রের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়েছে। ঠিকাদারকে উপজেলার জয়ধরকান্দি এলাকায় গণঘাটলা নির্মাণের জন্য কার্যাদেশও দেওয়া হয়েছে। এরপরেও সদ্য সংস্কার কাজ সমাপ্ত হওয়া সরাইল-অরুয়াইল আঞ্চলিক সড়ক কেটে কালভার্ট নির্মাণে সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত উন্নয়নের নামে সরকারের লক্ষাধিক টাকা অপচয় করা হচ্ছে। আর ঠিকাদার হিসেবে এ কাজ করাচ্ছেন সরাইল এলজিইডি’র সার্ভেয়ার শফিকুর রহমান নিজেই। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে অসন্তোষ।
জানা গেছে, বছরের পর বছর সংস্কারের অভাবে বেহাল অবস্থায় ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল-অরুয়াইল সড়কটি। পরবর্তীতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সড়কটি সংস্কারে দরপত্র আহবান করে। প্রায় আট কোটি টাকা ব্যয়ে সড়কটির সংস্কার কাজ সম্পন্ন করতে পুরো সড়কের তিনভাগে তিনজন ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়। নানা জটিলতায় দীর্ঘদিন পর জরাজীর্ণ এ সড়কের সংস্কার কাজ বর্তমানে প্রায় সম্পন্ন হওয়ার পথে।
এরইমধ্যে গত কয়েকদিন আগে সরাইল এলজিইডি’র সার্ভেয়ার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবগত না করিয়েই নিজের একক ক্ষমতা দাপটে সরাইল-অরুয়াইল সড়কের সরাইল উপজেলার পাকশিমুল ইউনিয়ন পরিষদের সামনে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক অর্ধসংস্কার কাজ শেষ করা জনগুরুত্বপূর্ণ সড়ক কেটে সেখানে কালভার্ট নির্মাণ কাজ শুরু করেছেন তিনি। এতে এ সড়কের শেষপ্রান্তে পাকশিমুল ও অরুয়াইল এলাকার মানুষদের চলাচলে দূর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে গত পাঁচদিন যাবত। সড়কটি দিয়ে সেই এলাকায় যান চলাচলও বন্ধ রয়েছে। যদিও সড়ক সংস্কার কাজে সেখানে কালভার্ট নির্মাণের কথা নেই। কালভার্ট নির্মাণের ফলে সড়কের সেই অংশের সংস্কার কাজ গত এক সপ্তাহ যাবত বন্ধ রয়েছে।
এদিকে সরাইল-অরুয়াইল আঞ্চলিক সড়ক কেটে সেখানে কালভার্ট নির্মাণের বিষয়টি জানতেন না ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলজিইডি’র নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সিরাজুল ইসলাম। রোববার (২১) সন্ধ্যার পর এলজিইডি’র এই নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, আমি কয়েকদিন অসুস্থ বিধায় সেই সড়কের সংস্কার কাজ সরেজমিন দেখতে যেতে পারছি না। সড়কটির শেষ অংশে সংস্কার কাজ করছেন শাহ শফিকুল ইসলাম নামে একজন ঠিকাদার। শনিবার সেই ঠিকাদারকে ফোন করে আমি জানতে চেয়েছি, কাজ এখনো শেষ হচ্ছে না কেন? তখন ঠিকাদার আমাকে জানিয়েছে সড়কটির সেই অংশে কালভার্ট নির্মাণ করা হচ্ছে। এরআগে আমি কিছুই জানতাম না।
নির্বাহী প্রকৌশলী আরও বলেন, সেই সড়ক সংস্কার কাজে সেখানে কালভার্ট ধরা নেই। সেই কালভার্ট যদি এডিবির বরাদ্দের হয় তাহলে উপজেলা পরিষদ ভালো জানে কিভাবে এলজিইডি’র সড়কে এটি নির্মিত হচ্ছে। সার্ভেয়ার শফিকুর রহমান সেখানে কালভার্ট নির্মাণ করতে পারে না। সেই এখতিয়ার তার নেই। তাছাড়া একজন সরকারি কর্মচারী হয়ে ঠিকাদারি কাজ করা নিয়মবহির্ভূত।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রোববার সন্ধ্যার পর মুঠোফোনে সরাইল এলজিইডি সার্ভেয়ার শফিকুর রহমান বলেন, আমি সরাইলে প্রায় ১৬ বছর যাবত চাকুরী করছি। তাছাড়া আমি এই জেলার বাসিন্দা। সেই হিসেবে সরাইলের অনেকে আমার কাছে সহযোগিতা চায়। সেই সুবাদে জনস্বার্থে আমি সরাইল-অরুয়াইল সড়কের পাকশিমুল এলাকায় কালভার্টটি নির্মাণ করে দিচ্ছি। এই কালভার্ট নির্মাণের ব্যয় এডিবির বরাদ্দ থেকে নেওয়া হবে। এ কাজটি ছিল পাকশিমুল ইউপির জয়ধরকান্দি এলাকার। সেখানে বর্ষার পানি আসায় কাজ করানো সম্ভব নই। তাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মতামত নিয়ে রেজুলেশন করিয়ে কাজটি এখানে আনা হয়েছে। এ কাজটির ঠিকাদার ছিল ইসলাম উদ্দিন নামে এক ব্যক্তি। তার সঙ্গে আলোচনা করেই এখানে কাজটি সম্পন্ন করা হচ্ছে।
তবে ব্যাপারে ঠিকাদার ইসলাম উদ্দিন বলেন, আমার বাড়ি পাকশিমুল-অরুয়াইল ভাটি অঞ্চলে। এখানে কখন কোথায় বর্ষার পানি আসে তা আমি জানি। এডিবির এই টাকায় জয়ধরকান্দি এলাকায় গণঘাটলা নির্মাণ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ঘাটলার পরিবর্তে এই বরাদ্দে সেই এলাকায় রাস্তায় ইট বিছানোর কথা। সার্ভেয়ার শফিকুর রহমান রেজুলেশন করিয়ে কাজ পরিবর্তনের দায়িত্ব নিয়ে এই বরাদ্দের টাকায় এখন নিজেই এলজিইডির সড়কে কালভার্ট নির্মাণ করছেন। আমাকে তিনি কিছুই জানাননি, আমিও কিছু বলতে পারছি না। কারণ, আমরা (ঠিকাদার) অনেকেই এলজিইডি’র এই দাপুটে সার্ভেয়ারের কাছে জিম্মি।
অপরদিকে সরাইল-অরুয়াইল সড়কের পাকশিমুল এলাকা অংশের সংস্কার কাজের ঠিকাদার শাহ সফিকুল ইসলাম বলেন, সড়ক সংস্কার কাজের কার্যাদেশে এখানে কালভার্ট ধরা ছিল না। আমাদের এ কাজের তদারকি কর্মকর্তা হলেন সরাইল এলজিইডি’র উপ-সহকারী প্রকৌশলী ইদ্রিছ সাহেব। কিন্তু এখানে এসে সবকিছুতে খবরদারি করেন সার্ভেয়ার শফিকুর রহমান। তিনি মনগড়াভাবে আমাদের সড়কের পীচ ঢালাই কাজ বন্ধ করে দিয়ে, এখানে সড়কের মাঝখানে কালভার্ট নির্মাণ শুরু করেছেন। তিনি আমাদের কাছে এই কালভার্ট নির্মাণ বাবদ লাখ টাকা দাবিও করেছেন, কিন্তু আমরা টাকা দেইনি। সড়ক কেটে এখানে কালভার্ট নির্মাণের কারণে আমাদের কাজ বন্ধ রয়েছে। আমরা চরম ক্ষতির সম্মুখীন।
সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ এস এম মোসা বলেন, এলজিইডি’র শফিকুর রহমান কয়েকদিন আগে এসে বললো জয়ধরকান্দি এলাকায় এডিবির কাজটি করা সম্ভব হবে, এই কাজটি পাকশিমুল ইউনিয়ন পরিষদের সামনে করা জরুরি। এতে উপজেলা চেয়ারম্যান সাহেব মত দিয়েছেন বলে সার্ভেয়ার শফিক আমাকে জানিয়েছে। তাদের সবার মতামতের ভিত্তিতে আমিও এতে মত দিয়েছি। কিন্তু শফিক সরকারি কর্মচারী হয়ে সেই কালভার্ট কিভাবে করবে। সেই কাজ করবে নিয়োগকারী ঠিকাদার।