শনিবার ১৫ অগাস্ট ২০২০


পাঁচজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে স্মরণ


আমাদের কুমিল্লা .কম :
23.06.2020

আবুল হাসানাত বাবুল।।
মোহাম্মদ নাসিমকে নিয়ে আন্তরিক স্মৃতিচারণ করেছেন সাংবাদিক রেজাউল করিম শামিম। জাতীয় চার নেতার একজন ক্যাপ্টেন মনসুর আলী। যোগ্য পিতার যোগ্য সন্তান মোহাম্মদ নাসিম। তিনি অনেকদিন অসুস্থ ছিলেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি চলে গেলেন। চলে যাওয়া মানে শারীরিকভাবে চলে যাওয়া। জাতীয়ভাবে স্মরণে থাকবেন চিরকাল।
শেখ মোঃ আবদুল্লাহ হৃদরোগে মারা গেলেন। পরে জানা গেল তিনি করোনায় আক্রান্ত ছিলেন। ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মোঃ আবদুল্লাহ রাজনীতিতে গোপালগঞ্জ থেকে উঠে এসেছেন। নিজ মন্ত্রণালয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৯ সালের ঈদুল ফিতরের ঘোষণা দিয়েছিলেন রাত এগারোটায়। বিরক্ত হয়েছিলাম। সম্ভবত জাতির বড় অংশই বিরক্ত হয়েছিল। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ঈদ। সে রাতে তারাবীও আদায় করে ফেলেছিলাম কিন্তু রাত এগারোটায় টেলিভিশনে দেখলাম ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মোঃ আবদুল্লাহ ঘোষণা দিচ্ছেন চাঁদ দেখা গেছে। কাল ঈদ। হঠাৎ করে মধ্যরাতে সারা শহরে সকল বয়সী নারী-পুরুষ নেমে এসেছিল কেনাকাটা করার জন্য। পরে স্বাভাবিক হলে শেখ মোঃ আবদুল্লাহর প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করেছিলাম এজন্য যে তিনি সিদ্ধান্তটা জানাতে পেরেছিলেন। কেননা পবিত্র ঈদে রোজা রাখা হারাম। এবার হজ্বযাত্রীদের সম্পর্কে ঘোষণা দিয়ে গেছেন সীমিতসংখ্যক যাত্রী হজ্ব করতে যেতে পারবেন। শেখ মোঃ আবদুল্লাহর নাম উচ্চারণ করতে গেলে কাশ্মীরের নেতা শেখ আবদুল্লাহর নাম মনে পড়ে। গত শতাব্দীর পঞ্চাশ-ষাট দশকে কাশ্মীরে যিনি নেতৃত্ব দেন তিনি শেখ মোঃ আবদুল্লাহ। কাশ্মীর তখন উন্মাতাল। শেখ আবদুল্লাহ বলিষ্ঠভাবে তার নেতৃত্ব অব্যাহত রাখেন। কাশ্মীর ও শেখ আবদুল্লাহকে নিয়ন্ত্রণ করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু। পন্ডিত নেহেরু ছিলেন কাশ্মীরী ব্রাহ্মণ। ফলে পরিস্থিতি তিনি রাজনৈতিক কৌশলে নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন। জম্মু-কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন শেখ আবদুল্লাহ। শেখ আবদুল্লাহর মৃত্যুর পর তার পুত্র ফারুক আবদুল্লাহ কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। আমাদের ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ মোঃ আবদুল্লাহর নাম জেনে কাশ্মীরের শেখ আবদুল্লাহর নাম মনে পড়লো। যাই হোক নামের খ্যাতির মূল্য আছে।
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান সিলেট ও সিলেটিবান্ধব মানুষ। ২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কালে তিনি কারাবন্দী ছিলেন কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে। সেই সময়কালে বেসরকারি কারা পরিদর্শক ছিলাম আমি আবুল হাসানাত বাবুল, প্রফেসর আমীর আলী চৌধুরী, অধ্যাপক শান্তিরঞ্জন ভৌমিক, অধ্যাপক লোকমান হাকিম। আরো ছিলেন তবে আমরা চারজন টিম করে কারা পরিদর্শন করতাম। মাসিক সভায় যোগ দিতাম। এই কারা পরিদর্শনকালে পেয়েছিলাম বদরউদ্দিন আহমদ কামরানকে। কারাগারের উত্তরে পুরনো দালানের একটি কক্ষে আবাস ছিল বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের। তিনি ভিআইপি বন্দি হিসেবেই ছিলেন। আমরা যখন তার কক্ষে গেলাম তিনি শয্যা ছেড়ে দ্রুত উঠে আমাদের বরণ করলেন। যেন তিনি তার গৃহ থেকেই অতিথি বরণ করছেন। জিজ্ঞেস করলাম, কেমন আছেন? কোন অসুবিধা আছে কিনা, কেননা কারারীতি অনুযায়ী কোন বন্দীর কথা আমরা রিপোর্ট করতে পারি। হাসিমুখে তিনি বললেন, না তিনি ভাল আছেন। স্বজনরা আসেন। দেখা হয়। কারা রীতি অনুযায়ী তিনি সব সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন। দেখলাম তার শয্যা বেশ উন্নত। কক্ষে টেবিল আছে। চেয়ার আছে। বই আছে। তিনি তার জন্য বরাদ্দকৃত লোকটিকে বললেন, মেহমানদের জন্য তাড়াতাড়ি চা করো। রং চা আসলো। চা পান করাকালীন তিনি বললেন তিনি গোসল করবেন। নামাজ আদায় করবেন। সেদিন ছিল শুক্রবার। কারাগারের ভিতরে নামাজের জন্য নির্ধারিত স্থানে তারা জামাত করে নামাজ আদায় করেন। এরপরেও আরো দু’একবার তার কক্ষ পরিদর্শন করেছি। ২০০৮ সালে বদরউদ্দিন আহমদ কামরান যখন কারাগারে তখন সিলেটবাসী তাকে মেয়র পদে নির্বাচিত করে। তিনি পরপারে চলে গেছেন কিন্তু আমার কাছে তার সেদিনের স্মৃতিটুকু রয়ে গেছে।
অধ্যক্ষ আলকাসুর রহমানও চলে গেলেন। বিনয়ী, সজ্জন এই মানুষটি অজিতগুহ কলেজে সারাজীবন শিক্ষকতা করেছেন। শেষের দিকে ছিলেন অধ্যক্ষ। অত্যন্ত গৌরব করে বলতেন তিনি অধ্যক্ষ আবদুর রউফের উত্তরসূরী। তাঁকে নিয়ে আহসানুল কবীর ও সাংবাদিক শাহজাদা এমরান আন্তরিক স্মৃতিচারণ করেছেন। আহসানুল কবীর তার সম্পর্কে যে মন্তব্যটা করেছেন সেটা সঠিক। কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা দুই স্তরে হয়ে থাকে। চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা নিয়ে হয় ময়নামতি অঞ্চলের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। ফেনী, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী নিয়ে হয় সুধারাম অঞ্চলের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। চূড়ান্ত পর্যায় হয় বোর্ডের দায়িত্বে।
বোর্ডের রীতি অনুযায়ী বোর্ডের পৃষ্ঠপোষকতায় কোন একটি কলেজ অঞ্চলের ক্রীড়া প্রতিযোগিতার দায়িত্ব নেয়।ভিক্টোরিয়া কলেজসহ চাঁদপুর,ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কোন কলেজ এই দায়িত্ব পালন করে আসছিল।সম্ভবত ২০১৫ সালে প্রস্তাব করলাম এবার অজিত গুহ কলেজ এই দায়িত্ব পালন করবে।আমাকে সমর্থন করলেন বদরুল হুদা জেনু।আমরা দুজনই বোর্ড ক্রীড়া কমিটির সদস্য।তখন বোর্ডের সচিব ছিলেন প্রফেসর মোহাম্মদ আবদুস ছালাম।তিনি বর্তমানে চেয়ারম্যান।সভায় সিদ্ধান্ত হলো অজিত গুহ কলেজ দায়িত্ব পালন করবে।অজিত গুহ কলেজের ক্রীড়া বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক হুমায়ুন কবির।মিটিং শেষে হুমায়ুন আমাকে জড়িয়ে ধরলো।কেননা বোর্ডের ইতিহাসে কোন বেসরকারি কলেজ সেবারই প্রথম এই দায়িত্ব পেয়েছিল।হুমায়ুন বললো,বাবুল ভাই আপনি আমার সঙ্গে আমাদের কলেজে যাবেন।আপনার মুখে প্রিন্সিপাল স্যারকে বললে স্যার খুশি হবেন। হুমায়ুনের মোটরসাইকেলে অজিতগুহ কলেজে গেলাম।চেয়ার ছেড়ে ওঠে এসে অধ্যক্ষ আলকাসুর রহমান বললেন,খবর পেয়েছি।বললেন,বাবুল ভাই প্রস্তাব যখন করেছেন তাহলে আপনার এবং বদরুল হুদা জেনুর পূর্ণ সহযোগিতা চাই।আজ স্মরণ করছি অধ্যক্ষ আলকাসুর রহমান বৃহত্তর কুমিল্লা জেলার সব কলেজগুলোকে নিয়ে সেবারের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা সফল করেছিলেন।এখানে অধ্যক্ষ হাসান ইমাম মজুমদার ফটিককেও স্মরণ করবো।ফটিক তখন কলেজের উপাধ্যক্ষ ছিলেন।নিয়মানুসারে কলেজের অধ্যক্ষ থাকেন কমিটির সভাপতি, ক্রীড়া বিভাগীয় প্রধান থাকেন কমিটির সদস্য সচিব।অধ্যক্ষ থাকাকালীন আলকাসুর রহমান অবসর গ্রহণ করেন।সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি এবং আমি বেসরকারি কারা পরিদর্শকের দায়িত্ব পালন করি।দেখেছি তিনি কোন মিটিং বাদ দিতেন না।পরিদর্শন শেষে খাতায় নিজের পরামর্শ দিতেন।বিশেষ করে হাজতি যারা তাদের মামলা যাতে দ্রুত শেষ হয় সেদিকে পরামর্শ দিতেন।হাজতিদের কষ্টটা একটু বেশি।কেননা রায় হয়ে গেলে তার থাকা-খাওয়ার এক ধরনের ব্যবস্থা। না হলে থাকা গাদাগাদি করে।কারারীতি অনুযায়ী তাদের সুযোগসুবিধা কম।জামিন পেলে হাজতিদের একপ্রকারের মুক্তি হয়ে যায়।মামলা চলে।অধ্যক্ষ আলকাসুর রহমান এদিকটায় খুব গুরুত্ব দিতেন।শাহজাদা এমরান,আহসানুল কবির যে কথাগুলো উল্লেখ করেছে তা আর বর্ণনা করলাম না।লেখাটা যখন শেষ করছি তখন চাঁদপুরের প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুসংবাদ পেলাম।লেখক-সংগঠক-সমাজসেবী হিসেবে প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেনকে চিনতাম।জানতাম।কুমিল্লায় একাধিক কর্মশালায় তাকে পেয়েছি।অত্যন্ত খোলামনে তিনি কথা বলতেন।এখানে একটা বিষয়ে পাঁচজনের যে মিল তা হচ্ছে মোহাম্মদ নাসিম,শেখ মোঃ আবদুল্লাহ,বদরউদ্দিন কামরান,অধ্যক্ষ আলকাসুর রহমান,প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।দেশপ্রেমিক বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা।
লেখক : সাপ্তাহিক অভিবাদন সম্পাদক ও কুমিল্লা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি। মোবাইল :০১৭১৪-৯৮৬৭২১