বুধবার ৮ জুলাই ২০২০


কোন পথে দেশ, চীন না ভারত?


আমাদের কুমিল্লা .কম :
24.06.2020

নাসির উদ্দিন।।

চীনের শুল্কমুক্ত সুবিধার ঘোষণা ভারত যে ভালোভাবে নেবেনা, এ বিষয়টি অনুমিতই ছিলো। সে দেশের মিডিয়া বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই সোচ্চার হয়ে ওঠেছে। এখন দেখার বিষয় ভারত এ প্রেক্ষিতে কি পদক্ষেপ নেয়। গত ২০ জুন টাইমস অফ ইন্ডিয়া এ নিয়ে প্রতিবেদন ছেপেছে।

পত্রিকাটি বলেছে, লাদাখ সীমান্তে সংঘর্ষে ২০ সেনা নিহত হওয়ার ঘটনায় ভারত চীনের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক প্রতিশোধ নেয়ার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের ৫ হাজার ১৬১ টি পণ্য রফতানিতে ৯৭ শতাংশ শুল্ক ছাড়ের বিষয়ে সম্মতি জানিয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে চীনের কাছে শুল্ক ছাড়ের প্রস্তাব দিয়েছিলো বাংলাদেশ। আশ্চর্যজনকভাবে, লাদাখের সংঘর্ষের একদিন পরই বাংলাদেশের এই প্রস্তাবে রাজি হয় চীন।

শুল্ক ছাড় দেয়ায় বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ হবে। যা নয়া দিল্লির জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বাংলাদেশ ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও গত বছর নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) ও নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের ফলে রুষ্ট হয়েছিল ঢাকা।

ভারতের মিডিয়াগুলো বরাবরই দেশটির আভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক স্পর্শকাতর বিষয়ে সে দেশের প্রভাবশালী মহলের পক্ষ থেকে সরকারকে করণীয় সম্পর্কে বার্তা দিয়ে থাকে। টাইমসের প্রতিবেদনেও তেমনই আভাস ফুটে ওঠেছে। অর্থাৎ দেশটি যে এবার বাংলাদেশের দিকে মনোযোগী হবে সেটা নিশ্চিত। দেশটির রাজনীতির মূল নিয়ন্ত্রক হচ্ছে সেদেশের বড় বড় শিল্প বণিক গোষ্ঠীগুলো এবং সুশীল সমাজ।

বাংলাদেশের রাজনীতির ওপর ভারতের অভিভাবকত্বের বিষয়টি একটি বহুল চর্চিত ইস্যু। এ সুবিধা ভারত স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ভোগ করছে। বাংলাদেশের সরকার ও বিরোধী দলগুলো সবাই ক্ষমতাকেন্দ্রে নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা বা ধরে রাখার জন্য উপরে উপরে ভারতমূখী মনোভাব চর্চা করে। চীনের সাথে আমেরিকার বাণিজ্যযুদ্ধ শুরুর পর দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত এখন আমেরিকার ঘনিষ্ট মিত্র। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশটির সমর্থনের জোরে ভারতের বড়ভাই সুলভ প্রভাব এখন আরও পেশীবহুল। এই পেশীর সক্ষমতায় ভারত এদেশের ক্ষমতার উত্থান পতনই শুধু নয়, আভ্যন্তরীণ নাড়ি নক্ষত্রের কলকাঠিও হাতে নিয়ে বসে আছে। এসব বিষয় এদেশের মানুষের অজানা কিছু নয়।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের জন্য মঙ্গল কিসে? উভয়ের সাথে কৌশলগত সম্পর্কের অভিনয় চালিয়ে যাওয়া? ভারত প্রেমে মজে থাকা? না-কি নেপালের মতো কোমড় শক্ত করে চোখে চোখ রেখে নিজেদের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা দেখানো? এ ব্যাপারে গণভোট হলে ৯০ শতাংশ মানুষ তৃতীয় অপশনটি বেছে নেবে। আর এই পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য ভারতই এককভাবে দায়ী। এর প্রধান কারণগুলি হচ্ছে, সীমান্তে অকাতরে বাংলাদেশীদের হত্যা করছে দেশটি। ফারাক্কা ও টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ এবং তিস্তাসহ নদ নদীর পানি বন্ধ করে বাংলাদেশকে সীমাহীন ক্ষতি করেছে ভারত। বাংলাদেশের সম্মতি ও অংশগ্রহণ ছাড়াই ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার উন্নয়ন ও ভারতের আন্ত:নদী–সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে দেশটি। মোদি সরকার যুক্তি দেখিয়েছে, ব্রহ্মপুত্র ও পূর্ব ভারতের গঙ্গা অববাহিকা থেকে পানি স্থানান্তরের লক্ষ্যে যদি বিপুলসংখ্যক বাঁধ, খাল ও জলাধার নির্মাণ করা হয়, তাহলে বছর বছর ভারতে যে খরা দেখা দেয়, তা চিরতরে মেটানো সম্ভব। কিন্তু এর ফলে বাংলাদেশ যে মরুভূমিতে পরিণত হবে সেই উপলব্ধি ভারতের নেই।

বাংলাদেশ ভারত সম্পর্কে আরেকটি বড় সংকট বাণিজ্য বৈষম্য। মাত্র ৬০০ মিলিয়ন ডলারের বিপরীতে ভারত থেকে আমদানির পরিমাণ ৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক আমদানির ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে রেখেছে ভারত। বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে রপ্তানি করে, এমন অনেক পণ্য ভারত বিশ্ববাজার থেকে আমদানি করে, অথচ বাংলাদেশ থেকে করে না। ভারতের এই আচরণ বন্ধুসূলভ নয়। কথায় কথায় সীমান্ত ও রপ্তানী বন্ধ করে বাংলাদেশকে সংকটে ফেলা, ভারতের রুটিন ওয়ার্কের অংশ। ট্যারিফ কৌশলে বাংলাদেশী পণ্যের রপ্তানি ঠেকিয়ে রাখে ভারত। এনআরসির মতো ঘৃণ্য কর্মসূচি গ্রহণ করার কারণেও ভারতের সাথে বাংলাদেশের মানুষের ভাবগত দুরত্ব প্রকট হয়েছে। আসামের নাগরিক তালিকায় ১৯ লাখ নাগরিককে তালিকা বহির্ভূত রেখে এদেরকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে কিছুদিন পর পর উস্কানিমূলক বক্তব্য দেয় সেদেশের বিজেপি নেতারা। এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করে ভারত অতিমাত্রায় বাংলাদেশ বিরোধী অবস্থানে পৌঁছেছে। অথচ সম্পর্ক বা ক্ষমতা রক্ষার জন্য হলেও বাংলাদেশ ভারতকে না চাইতেই সব উজার করে দিয়েছে। বিনিময়ে বাংলাদেশ প্রতারিত হয়েছে। বাংলাদেশের অনুমতি ছাড়াই ফেনী নদীর পানি তুলে নিচ্ছে বহুদিন যাবৎ। যদিও মুখ রক্ষায় পরবর্তীতে একটি সমঝোতা চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।

এমনিতেই হিন্দু মুসলমান ধর্মীয় বিভাজনের ভিত্তিতে ১৯৪৭ এর দেশভাগ পরবর্তী দুই অংশের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বৈরিতা ও হিংসাত্মক অবস্থা বিরাজ করছে। এ অবস্থায় ভারতের সৎ ও সৌহার্দপূর্ণ আচরণই পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক পর্যায়ে রাখার ক্ষেত্রে সহায়ক হতো। কিন্তু ভারত কখনোই তেমনটি করেনি। ফলে দুই দেশের মানুষের মধ্যে সদ্ভাব সৃষ্টির পরিবর্তে বিদ্বেষ ছড়িয়েছে বেশি।

চীনের শুল্ক ছাড়ের এই সিদ্ধান্তের আগে চলতি মাসের গোড়ার দিকে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সাথে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি দলের একটি ভিডিও কনফারেন্স হয়েছে। এ নিয়েও ভারতের বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। সংবাদে বলা হয়েছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকাসহ দেশের ছয়টি শহরে সিস্টার-সিটি নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে চীন। দক্ষিণ এশিয়াসহ পশ্চিমা কিছু গণমাধ্যমেও এই সংবাদটি গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে চীন-ভারত উত্তেজনার মধ্যে ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের এ ধরনের সম্পর্কের আভাস এ অঞ্চলের কূটনীতির ক্ষেত্রে নতুন মাত্রার ইঙ্গিত বহন করে বলে এসব সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই সিস্টার-সিটি নির্মাণের উদ্দেশ্য হচ্ছে, দুই দেশের ভিন্ন ভিন্ন শহরের মানুষের মধ্যে আন্তঃ নাগরিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে সম্পর্কোন্নয়ন। আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ডেভিড আইজেন হাওয়ার এই সিস্টার-সিটি ধারণার জনক।

চায়না ডেইলি বলেছে, সিস্টার-সিটি নির্মাণের প্রকল্পগুলো তাদের ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প ‘বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (ইজও)’ এর অন্তর্ভুক্ত। বিআরআই প্রকল্পের মাধ্যমে চীন বিশ্বের প্রায় ৭শ শহরকে যুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। বিশ্বের নতুন বাণিজ্যপথ সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই এই প্রকল্পের পেছনে প্রচুর অর্থ ব্যয় করছে চীন। বাংলাদেশ ২০১৬ সালেই এই ইনিশিয়েটিভে স্বাক্ষর করেছে। এ প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশে চীন ২৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাবও দিয়েছে। এর অধিকাংশই ঋণ প্রকল্প। তবে চীনের এই ঋণের বিষয়টি নিয়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে শঙ্কা রয়েছে। কারণ পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমারে চীনের বিনিয়োগ সুখকর নয়।

একদিকে ভারতের সাথে চীনের দীর্ঘদিনের বৈরিতা রয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে শুরু হয়েছে চীনের বাণিজ্যযুদ্ধ। এই সময়ে পুরনো শত্রু ভারত আমেরিকার ঘনিষ্ট হয়ে পড়ায় চীনের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে। কারণ চীনকে ডিস্টার্ব করার জন্যই আমেরিকা ভারতকে হাতে নিয়েছে। এই অবস্থায় বাংলাদেশকে বন্ধুরাষ্ট্রে পরিণত করতে পারলে ভারতকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা যাবে। এছাড়া ভারতের সাথে বাংলাদেশের সীমান্ত (৪ হাজার ১৫৬ কিমি) চীন পাকিস্তানের চেয়ে বেশী। এই দীর্ঘ সীমান্ত চীনের পক্ষে থাকলে অনেক সুবিধা। আর ভারতের জন্যও এই দীর্ঘ সীমান্ত নতুন করে মাথাব্যথার কারণ হয়ে ওঠেছে। বাংলাদেশের সামনে এখন সুযোগ এবং সংকট দুটোই। কোন পথে হাঁটবে বাংলাদেশ দেখার বিষয় সেটাই। তবে বাংলাদেশের জন্য উত্তম হবে, জটিল এই পরিস্থিতিতে দলমত নির্বিশেষে একাট্টা হয়ে দেশের স্বার্থে সিদ্ধান্ত গ্রহণ। কিন্তু বাংলাদেশের ভঙ্গুর ও অপরাজনীতি সেই পথে হাঁটতে দেবে এমন বাস্তবতা অনুপস্থিত।

প্রসঙ্গতঃ চীনের বাজারে জিরো ট্যারিফ স্কিমের আওতায় বাণিজ্য সুবিধা নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়ে গত বছরের এপ্রিলে চিঠি দিয়েছিল বাংলাদেশ। সেই চিঠির ৯ মাসের মাথায় গত ৩১ জানুয়ারী চীন এ বিষয়ে বাংলাদেশকে চিঠি দিয়ে শূন্য শুল্কে পণ্য রপ্তানির সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি জানায়। এই চিঠিতেই চুক্তির দিনক্ষণ চূড়ান্ত করতে চীনের পক্ষ থেকে তাগিদ দেওয়া হয়। চিঠিতে কোন কোন পণ্যে শুল্ক সুবিধা পাওয়া যাবে তার তালিকা ও রুলস অব অরিজিনের শর্তও সংযুক্ত করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই
বাংলাদেশের ৫ হাজার ১৬১ পণ্যে শুল্কমুক্ত রফতানির সুবিধা দিয়েছে চীন। যা ১ জুলাই ২০২০ থেকে কার্যকর হবার কথা। এর আগে চীন আরও ৩ হাজার ৯৮ টি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়েছে বাংলাদেশ। অপরদিকে ভারত গত কংগ্রেস আমলে বাংলাদেশকে ৬১ টি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়েছিলো। কিন্তু বাস্তবে তা কার্যকর করেনি। অথচ এ নিয়ে বাংলাদেশ বহুবার ভারতের কাছে আবেদন করেছে বৈঠকে আলোচনা করেছে।
লেখক : কুমিল্লা প্রেস ক্লাবের সাবেক সহ সভাপতি ও সমাজ বিশ্লেষক ।মোবাইল :০১৭১১-৩২৭৪৯৮