বুধবার ৮ জুলাই ২০২০


করোনায় করণীয় ও লক্ষণীয়


আমাদের কুমিল্লা .কম :
25.06.2020

অধ্যাপক ডা: মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ।।

আমাদের এক বন্ধু করোনা প্রতিরোধে MEN I WOMEN এ দুটি শব্দের ছন্দময় শাব্দিক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লিখেছেন-

* Don’t touch MEN

M = Mouth

E = Eye

N = Nose

*Follow WOMEN

W = Wash hand frequently

O = Operate from distance

M = Maintain cough etiquette

E = Eat fresh fruits & vegetables

N = No handshake

দিল্লী বেইসড ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিকেল রিসার্চের আলোকে করোনা প্রতিরোধে করণীয় বিভিন্ন দিকগুলি হচ্ছে-
১. বহির্বিশ্বে ভ্রমন অন্তত: দুই বৎসর বন্ধ রাখুন
২. বাহিরের খাবার বন্ধ রাখুন অন্তত: এক বৎসর
৩. বিবাহ বা অনুরূপ অনুষ্ঠানে যাওয়া থেকে বিরত থাকুন
৪. অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ পরিত্যাগ করুন
৫. এক বৎসর জনাকীর্ণ স্থানে গমন বন্ধ রাখুন
৬. সামাজিক বা শারীরিক দূরত্ব রক্ষা করে চলুন
৭. যার কাশি আছে তার কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন
৮. মুখে মাস্ক অবশ্যই রক্ষা করতে হবে
৯. চলতি সময়ে সকলেই সাবধানতা মেনে চলুন
১০. আপনার চতুস্পার্শ্বে বেশি লোকের সমাগম হতে দেবেন না
১১. পুষ্টিযুক্ত খাবার গ্রহণ করুন
১২. সিনেমা হল, শপিংমল, জনাকীর্ণ বাজার, জনাকীর্ণ পার্ক, বিভিন্ন পার্টি থেকে নিজেকে সংযত রাখুন
১৩. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immunity) বৃদ্ধি করুন
১৪. নাপিতের দোকানে, সেলুনে, বিউটি পার্লারে সাবধানতা অবলম্বন করুন
১৫. অপ্রয়োজনীয় সভা থেকে বিরত থাকুন এবং করলেও সামাজিক দুরত্ব অবশ্যই রক্ষা করতে হবে।
১৬. করোনার সঙ্গে কিছুদিন হয়ত: বসবাস করতে হবে
১৭. হাতঘড়ি, আংটি, বেল্ট ব্যবহার করবেন না এবং সময় নিরুপনে মোবাইল ফোনটিই যথেষ্ট
১৮. কোন রুমাল সঙ্গে রাখবেন না। সেনিটাইজার ও টিস্যু পেপার রাখুন
১৯. বাড়ীর বাহিরে ব্যবহার করা জুতা বাড়ীর বাহিরেই রাখুন, ভিতরে আনবেন না।
২০. বাহির থেকে আসার পর হাত, পা ও মুখ ভাল করে ধৌত করুন
২১. কোন সন্দেহজনক কোভিড রোগীর সংস্পর্শে বা কাছাকাছি এসে থাকলে সোজা গোসল করুন।
লক ডাউন থাকুক বা না থাকুক যতদিন করোনা দেশ থেকে বিদায় না নিচ্ছে ততদিন মাস্ক পড়া, সামাজিক দূরত্ব রক্ষা, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, হাতকে নাক, মুখ ও চোখের সংস্পর্শে না আনা ও কোন ঠান্ডা খাবার না খাওয়া পালন করে সবাই যদি চলতে পারি তবে করোনা ছড়ানো বন্ধ হয়ে যেতে বাধ্য।
সর্দি, কাশি, সাধারণ ঠান্ডার ভাব নিয়ে করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯ প্রাথমিকভাবে জ্বরসহ বা জ্বর ছাড়া দেখা দেয়। করোনা ভাইরাস পরবর্তীতে যখন নিউমোনিয়ায় রূপান্তরিত হয় তখন সর্দি থাকে না কিন্তু শুকনা কাশি থাকে। এই ভাইরাসটি ২৬/২৭ ডিগ্রী সেলসিয়াসে মারা যায়। যদি ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তি হাঁচি দেয় তবে তাহা দশ ফিট পর্যন্ত যায় মাটিতে পরার পূর্ব পর্যন্ত কিন্তু ইহা বায়ূবাহিত রোগ নয় একমাত্র স্পর্শ বা হাঁিচ-কাশির মাধ্যমে ছড়ায়। ইহা যদি ধাতব বস্তুর উপর বা ফার্নিচারের উপর পরে তবে ১২ ঘন্টা পর্যন্ত সেথায় সক্রিয় থাকে। তাই ধাতব বা ফার্নিচারের উপরে স্পর্শ করিলে সঙ্গে সঙ্গে সাবান দিয়ে হাত ধৌত করতে হবে ২০ সেকেন্ড সময় নিয়ে। কাপড়ের উপর সে ৬-১২ ঘন্টা সক্রিয় থাকে এবং সাধারন সাবান দিয়ে ধৌত করিলেই সে মরে যায়। গরম পানি পান করা সকল ভাইরাসের জন্যই উপকারী। কখনোই বরফ মিশ্রিত পানি বা ঠান্ডা পানি পান করা যাবে না। বার বার হাত ধৌত করার কথা সকল বিজ্ঞানীরাই বলছেন। কেননা হাত ধোয়ার পূর্বে চক্ষু কচলাইতে পারেন, নাক চুলকাইতে পারেন ঠোটে হাত দিতে পারেন। গরম লবনের পানি দিয়ে গরগরা করাও প্রতিরোধমূলক কাজ করে। প্রচুর পানি পান করার কথাও বলা আছে।
প্রথম রোগের লক্ষণটিই হচ্ছে গলা ব্যাথা বা গলা চুলকানো যা ৩/৪দিন স্থায়ী হয়। প্রথম গলাকে আক্রান্ত করে এবং অনেকক্ষেত্রে দেখা যায় ধূমপায়ীদেরই বেশী। তারপরই ভাইরাসটি নাকের সর্দিতে প্রবাহিত হয় যাহা ক্রমান্বয়ে ট্রাকিয়া ও ফুসফুসে প্রবেশ করে এবং পরবর্তীতে নিউমোনিয়ার সৃষ্টি করে যাহা তৎপরবর্তী ৫/৬ দিনে দেখা দেয়। নিউমোনিয়ার সময় প্রচন্ড জ্বর ও শ্বাসকষ্ট আরম্ভ হয়। নাক বন্ধ হয়ে (congestion) আসবে। মনে হবে রোগী মারাত্মক অসুস্থ হচ্ছে এবং সকলের মনযোগ আকর্ষন করে। নতুন করোনা ভাইরাস বেশ কয়েকদিন অনেক সময় কোন লক্ষণই প্রদর্শন করে না। তখন কিভাবে রোগী বুঝিবে যে সে ভাইরাসে আক্রান্ত? ঐসময় সে জ্বর এবং কাশি অনুভব করিবে। এই সকল ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট আরম্ভ না হওয়া পর্যন্ত রোগী হাসপাতালে যায় না কিন্তু সেই অবস্থায় তার ফুসফুস ৫০% ভাগ ফাইব্রসিস (Fibrosis) হয়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা একটি সাধারন পরীক্ষার মাধ্যমে রোগী নিজে প্রতি সকালে ফাইব্রসিস অনুমান করতে পারে-“জোরে শ্বাস টান দিয়ে দশ সেকেন্ড ধরে রাখুন যদি এই দশ সেকেন্ড সফলভাবে কাশি ছাড়া শ্বাস বীনা কষ্টে ধরে রাখতে পাারেন এবং বুকে কোন প্রকারের টাইটনেস লাগে না তবেই বুঝতে হবে রোগীর শ্বাসযন্ত্র আক্রান্ত হয় নাই।” তাই এই ক্রান্তিকালে প্রতি সকালে নীজে নীজের শ্বাস যন্ত্রের এই পরীক্ষাটি বিশুদ্ধ বাতাসে করে নেয়া অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। প্রত্যেকেই খেয়াল রাখা উচিত তার মুখ এবং গলা যেন ভিজা থাকে কখনোই যেন শুষ্ক না থাকে। ১৫ মিনিট অন্তর অন্তর কয়েক চুমুক পানি পান করা উচিত। কেননা যদি ভাইরাসটি আপনার মুখে প্রবেশ করে তবে পানীয় জলের সঙ্গে তাহা গলধকরনের কারণে পাকস্থলীতে প্রবেশ করবে এবং পাকস্থলীর এসিড তাহা মেরে ফেলবে। যদি আপনি যথেষ্ট পানি বা পানীয় কিছু না পান করেন তবে ভাইরাস আপনার শ্বাসনালীতে প্রবেশ করে ফুসফুসে চলে যাবে যাহা আপনার জন্য মারাত্মক, তাই এতটুকু জেনে রেখে আপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন পৃথিবীব্যাপী এই মহামারীতে।
রোগের লক্ষণসমূহ উপরের দুই প্যারাতে দেয়া হলেও ছয়টি হেডিং এ বর্ণনা করা যায়-
১. গলা চুলকানো / গলা ব্যাথা
২. শুকনো গলা
৩. শুষ্ক কাশি
৪. উচ্চ তাপমাত্রা
৫. ছোট্ট ছোট্ট শ্বাস
৬. স্বাদ ও গন্ধ টের না পাওয়া
যে কোন একটি লক্ষণে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসা চালাতে হবে।
লক ডাউন চিকিৎসা ও প্রতিরোধ দুই কাজই করে। এমন লক ডাউন করা উচিত যাতে সমগ্র দেশ ও জাতি উপকৃত হয়। তাই সকল সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা, ইউনিয়ন দুই ভাগে বিভক্ত করে এক ভাগে ১৪ দিন এবং অন্যভাগে পরবর্তী ১৪ দিন করে জনগণকে ও সকল সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানকে সংযুক্ত করে সচেতন করে জননেতাদের অংশগ্রহণে সফল লক ডাউন সম্পন্ন করে গোটা দেশকে রক্ষা করতে হবে। এক সপ্তাহের একটি সময় নিয়ে সকল কর্মকর্তা / কর্মচারী, সকল পর্যায়ের এনজিও, সকল পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি একটি সিটির অর্ধেকের জন্য একটি ওয়ার্ড / এলাকায় একজন চিকিৎসককে সঙ্গে নিয়ে কমিটি তৈরি করে রোগী চিহ্নিতসহ যাবতীয় ব্যবস্থাদি সম্পন্ন করে এবং ১৪ দিনের নিম্নবিত্ত পরিবারের খাবারের নিশ্চয়তা করে লক ডাউন প্রকৃত অর্থে শেষ করলে অচিরেই বাংলাদেশ করোনামুক্ত হবে বলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগণের বিশ্বাস। নির্বাচনের সময় সেনাবাহিনী যেভাবে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করে একই কায়দায় সমগ্রদেশে লক ডাউন পালনে সহযোগীতা করবে। দেশের মাননীয় সরকার প্রধান গরীব মানুষের খাবার যোগাড় করতে অনেক পূর্বেই নির্দেশনা দিয়ে রেখেছেন শুধুমাত্র সমন্বিতভাবে কর্মসূচী গ্রহণ করলেই লক ডাউন প্রকৃত অর্থে বাস্তবায়িত হবে। করোনার জন্য তৈরী জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির দায়িত্ব হবে একটি ট্রিটমেন্ট প্রটোকল তৈরি করে ১ সপ্তাহের মধ্যে কমিটির সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসকদের হাতে পৌছে দেয়া ও লক ডাউন বাস্তবায়নে সক্রিয় সহায়তা করা।

লেখক:সাবেক অধ্যক্ষ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ। সভাপতি, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন, কুমিল্লা।