শুক্রবার ৪ ডিসেম্বর ২০২০


অবসরে রং-বেরঙের ঘুড়ি উড়ানো


আমাদের কুমিল্লা .কম :
27.06.2020

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি।।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জেলা শহরসহ বিভিন্ন উপজেলায় চলছে ঘুড়ি উড়ানোর হিড়িক। করোনাকালে এখানকার অনেকে অবসর সময় কাটাতে ঘুড়ি উড়ানোকেই অন্যতম বিনোদন হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
জেলা শহর থেকে গ্রাম সর্বত্রই বর্তমানে চোখে পড়ে ঘুড়ি উড়ানোর দৃশ্য। মূলত দুপুরের পর থেকেই শুরু হয় ঘুড়ি উড়ানো, চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত। বিকেল বেলা শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সী ছেলেরাই অংশ নেয় ঘুড়ি উড়ানোর উৎসবে।
শুধু ছেলেরাই নয়, নারী ও বৃদ্ধদেরকেও দেখা যায় ঘড়ি উড়ানোর উৎসবে। খোলা মাঠসহ নিজ বাড়ির ছাদে বসেও ঘুড়ি উড়ান অনেকে। স্থানীয়রা ঘুড়ি উৎসবকে বলেন ঘুড্ডি প্রতিযোগিতা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর শহরের টি.এ.রোডের দক্ষিণ মৌড়াইল রেলওয়ে ওভারপাসে ঘুড়ির মাজা দেয়া সুতোয় বেশ কয়েকজন যুবক গলা ও মুখ কেটে আহত হওয়ার পর এবং শহরের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার বাসার ছাদে ঘুড়ি উড়ানো প্রতিযোগিতা শুরু হলে দুর্ঘটনা এড়াতে মাস দেড়েক আগে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ঘুড়ি উড়ানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেলার সব থেকে বেশি ঘুড়ি উড়ানো হয় নাসিরনগরে। সেখানে হরেক রকমের ঘুড়ি উড়ানো হয়। স্থানীয়ভাবে এসব ঘুড়ির নাম পতাকা ঘুড়ি, মাছ ঘুড়ি, বিল্ডিং ঘুড়ি, জামাই ঘুড়ি, চোঙ্গা ঘুড়ি, দুল ঘুড়ি, সাপ ঘুড়ি, দরজা ঘুড়ি, ফেচ্ছা ঘুড়ি, চড়কি ঘুড়ি, ঢাউস ঘুড়ি, বিমান ঘুড়ি, হেলিকপ্টার ঘুড়ি, সাইকেল ঘুড়ি, ছাতা ঘুড়ি, ঈগল ঘুড়ি, স্টার ঘুড়ি, স্টার ডোল ঘুড়ি ইত্যাদি।
আবার রাতের বেলা কোনো কোনো ঘুড়ির সঙ্গে ব্যাটারি দিয়ে লাইট জ্বালিয়ে দেয়া হয়। বিশেষ করে রাতের বেলায় এসব ঘুড়ি উড়োনো হয় নাসিরনগরের আকাশে।
স্থানীয়রা জানান, ১০-২০ টাকার সাধারণ ঘুড়ি থেকে দুই হাজার টাকা দামের ঘুড়ি উড়ানো হয় নাসিরনগরে।
নাসিরনগর উপজেলা সদর থেকে ২০কিলোমিটার দূরে ধরমন্ডল গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বিশেষ ধরনের ঘুড়ি।
স্থানীয়রা জানান, এর নাম বাক্স ঘুড়ি। কাগজ দিয়ে বেশ কয়েকটি বাক্সের মতো করে ঘুড়িটি বানানো। ঘুড়িটির দাম ৫০০ টাকা।
ধরমন্ডল গ্রামের মুফতি মো. ফখরুল ইসলাম জানান, শুধু ধরমন্ডল গ্রামেই প্রতিদিন বিকেলে শ’তিনেক ঘুড়ি উড়ানো হয়। এর মধ্যে জনপ্রিয় হচ্ছে স্থানীয় বাক-প্রতিবন্ধীর তৈরি করা সাইকেল ঘুড়ি। আকাশে উড়ার পর ঘুড়িটি দেখলে মনে হয় কেউ সাইকেল চালাচ্ছেন। এছাড়া লাইট লাগিয়ে যেসব ঘুড়ি উড়ানো হয় সেগুলোও দেখার মতো।
এ ব্যাপারে নাসিরনগর সদর ইউপির বাসিন্দা শিবু দেব জানান, তিনি বিকেল বেলা সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে বাসার ছাদে ঘুড়ি উড়ান।
উপজেলা সদরের ব্যবসায়ী মো. ছাদেক মিয়া জানান, এখন ঘুড়ি উড়ানোর মৌসুম। বর্তমানে ঘুড়ি তৈরির কাগজ, পলিথিন ও সুতা বিক্রি অনেক বেড়েছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ হাজার টাকার সুতা বিক্রি করেন।
এ ব্যাপারে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদরের পৌরশহরের নিউ সিনেমা হল রোডের বাসিন্দা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অর্পিতা দে বলেন, লকডাউনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। তাই বিকেল বেলা শখের বশে পরিবারের অন্যান্যদের সঙ্গে ছাদে ঘুড়ি উড়াই।
পৌর শহরের মেড্ডা এলাকার বাসিন্দা ও নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী অয়ন বিশ্বাস বলেন, করোনাভাইরাসের জন্য স্কুল বন্ধ। মা-বাবা বাসা থেকে বের হতে দেয় না, তাই সারাদিন বাসায় থাকতে হয়। আগে বিকেলে মাঠে গিয়ে ক্রিকেট খেলতাম। এখন বিকেলে ছাদে ঘুড়ি উড়াই।
পৌরশহরের স্বর্ণ ব্যবসায়ি পৃর্ব-পাইকপাড়া এলাকার বাসিন্দা রিপন দেবনাথ বলেন, করোনা ভাইরাসের কারণে বিকেল ৪টার পর দোকান বন্ধ থাকে। সে সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিকেলে ঘুড়ি উড়েই। ছোট বেলা থেকেই ঘুড়ি উড়ানো আমার শখ। আমি নিজেই সূতায় মাজা দেই ও বিভিন্ন রকমের ঘুড়ি নিজেই তৈরি করি।
পৌরএলাকার পৃর্ব মেড্ডার দোকানি লিটন শীল জানান, তার মুদি মালের দোকান। করোনার কারণে ব্যবসা তেমন ভালো না। তাই দোকানে এখন নিজেই ঘুড়ি বানিয়ে বিক্রি করি। প্রতিদিন ভালোই ঘুড়ি বিক্রি হয়।
এ ব্যাপারে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আহ্বায়ক আবদুন নূর বলেন, ঘুড়ি আমাদের বাঙালির একটি লোকজ ঐতিহ্য। এটি বিনোদনেরও মাধ্যম। খোলা মাঠে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ঘুড়ি উড়ানো হলে তাতে দোষের কিছু নেই। তবে কোনো অবস্থাতেই বাসার ছাদে, গাছের ডালে বসে ঘুড়ি উড়ানো যাবে না। যেহেতু ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘুড়ি উড়ানো নিষেধ করা হয়েছে, আমাদের সবারই আইন মানা উচিত।
এ ব্যাপারে জেলা সাহিত্য একাডেমির সভাপতি কবি জয়দুল হোসেন বলেন, ঘুড়ি উড়ানো একটি শখের উৎসব হলেও যেহেতু সরকারি নিষেধাজ্ঞা আছে সেহেতু ঘুড়ি উড়ানো উচিত নয়। কোনো অবস্থাতেই ঘরের চালে, বাসার ছাদে ও গাছের ডালে বসে ঘুড়ি উড়ানো যাবে না।